একটি বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণের প্রতি মনোযোগী। যত দ্রুত সম্ভব সে রাজার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করল। রাজাকে আপন করে নেয়ার জন্যে সে নারীত্বের যতটুকু কারিশমা তার মধ্যে ছিল সবটুকুই সে প্রয়োগ করল। কথায় কথায় নিজের রূপ-লাবণ্য রাজার সামনে তুলে ধরার জন্য নিজে থেকেই সে রাজার কাছাকাছি বসল এবং বার বার বিভিন্ন ছুতোয় শাড়ির আঁচল খুলে শরীর ঢাকার ভান করে নিজের দেহকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছিল।
রাজা ছিল নারী লোভী। নবাগত রাজিয়ার গায়ে পড়া অঙ্গভঙ্গি তার মধ্যে প্রচণ্ড কামনা সৃষ্টি করল এবং সে রাজিয়াকে একান্তে পাওয়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে পড়লো। যেহেতু রাজিয়া নিজেই বিশেষ এক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে রাজাকে একান্তে পাওয়ার পাঁয়তারা করছিল, ফলে তাদের শরীরী কথাবার্তায় পৌঁছাতে বেশী সময়ের দরকার হলো না। রাজিয়াকে একান্তে পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল বুড়ো রাজ্যপাল।
রাজিয়াও কালবিলম্ব না করে রাজার একান্ত সান্নিধ্য পাওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে বললো- মহারাজ! অনুমতি দিলে আজ রাতেই আমি আপনার কাছে একান্তে মিলিত হতে আগ্রহী। তবে আমি চাই আমার এই আসা সবার অগোচরে থাকুক এবং কারো দৃষ্টিতে না পড়ুক।
রাজাও তাতে সায় দিলেন। তিনি এও বললেন, আমাদের একান্ত গোপন অভিসারের কথা তোমার স্বামী কমান্ডার যুলকারনাইন জানতে পারলে আমাদের উভয়কেই খুন করে ফেলবে। তিনি রাজিয়াকে রাতের বেলায় আসার জন্যে একটি গোপন পথ দেখিয়ে দিলেন এবং একটি গোপন কক্ষ দেখিয়ে বললেন, আমি রাতের বেলায় এই কক্ষে একাকি থাকবো।
সেই রাতেই রাজিয়া সুরক্ষিত পথে রাজ্যপালের গোপন কক্ষে এসে হাজির হলো। রাজ্যপাল রাজিয়াকে দেখে উফুল্ল হয়ে বললো- তুমি তো শরাব পান করবে না, কারণ হঠাৎ পান করলে এর রেশ অনেক্ষণ থাকবে। তোমাকে যেহেতু তোমার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে হবে এজন্য শরাব পান না করাই ভালো হবে।
রাজিয়া তাকে বললো, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আপনি নিজে নিজেই শুরাহীতে ঢেলে পান করুন। আমি শরাবের গন্ধও সহ্য করতে পারি না। আমার মাথা চক্কর দেবে।
রাজ্যপাল ছিলেন দাঁড়ানো অবস্থায়। দাঁড়ানো থেকে নীচের দিকে ঝুঁকে তিনি শাহীতে মদ ঢালতে লাগলেন। এদিকে রাজিয়া তখনো তুলা ভেজানো পানীয়ের উত্তেজনায় উত্তেজিত। রাজাকে মদের গ্লাসের প্রতি মগ্ন থাকতে দেখে সে শাড়ীর ভাঁজ থেকে খঞ্জরটি বের করে দু’হাত উপরে তোলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে রাজ্যপালের পিঠে খঞ্জর ঢুকিয়ে দিল।
খঞ্জরের আঘাতে রাজ্যপাল যেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো অমনি রাজিয়া খঞ্জর টেনে বের করে সোজা রাজার বুকে আমূল খঞ্জরটি বিদ্ধ করল। রাজার মুখে আর কোন ধরনের শব্দ উচ্চারিত হলো না। ধপাস করে রাজ্যপাল মরা বকরির মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
বুকে বিদ্ধ খঞ্জরটি টেনে বের করে রাজার দিকে তাকাল রাজিয়া। খঞ্জর বিদ্ধ রাজার দেহটি কয়েক বার খেচুনী দিয়ে অসাড় ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ল।
রাজিয়ার অনুভবই হচ্ছিল না, সে কতো বড় একজন ব্যক্তিকে অবলীলায় খুন করে ফেলেছে। রাজ্যপাল তখন শুধু একজন হিন্দু রাজা নন, তিনি গযনী সুলতানের বিশ্বস্ত বন্ধু। সুলতান মাহমুদের সাথে চুক্তি করার ফলে মূলতঃ রাজ্যপাল মুসলমানদের সহযোগী হয়েছে। তাই রাজ্যপালকে হত্যা করার পরিণতি কি ভয়াবহ হতে পারে এর বিন্দু বিসর্গও কোন চিন্তা ভাবনা রাজিয়ার মনে ছিল না। বরং রাজিয়া রাজ্যপালের নিথর দেহ দেখে পরম স্বস্তি বোধ করলো।
হত্যা করার পর খুব ধীর স্থির ভাবে যে শুরাহীতে রাজ্যপাল শরাব পান করতে শরাব ঢেলে ছিল, রাজিয়া আস্তে করে শরাবের গ্লাসটি তার ঠোঁটে ছোঁয়াল এবং এক নিঃশ্বাসে সবটুকু শরাব গলাধঃকরণ করলো । অতঃপর খুব শান্তভাবেই রাজার কক্ষটির দরজায় ছিটকিনি এঁটে দিয়ে কক্ষ ছেড়ে পথে নামলো এবং লোক চক্ষুর অন্তরালেই নিজের ঘরে পৌঁছে গেল ।
রাজিয়ার ঘরে কোন পরিবর্তন ছিল না। যথারীতি নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছিল যুলকারনাইন। রাজিয়ার হাতে রক্ত মাখা খঞ্জর। এবার তার স্বামী যুলকারনাইনকে হত্যার পালা।
গভীর ঘুমে যুলকারনাইন। খোলা জানালা দিয়ে চতুর্দশী চাঁদের আলো এসে যুলকারনাইনের ঘুমন্ত চেহারা ও খোলা বুকের উপর পড়ছে। সোজা চিৎ হয়ে ঘুমিয়ে আছে যুলকারনাইন। নিঃশ্চিন্তে। এখন বুকের উপর একবার খঞ্জর বিদ্ধ করলেই নির্ঘাত মৃত্যু।
প্রচণ্ড উত্তেজনায় ধীরে ধীরে স্বামীর দিকে এগিয়ে গেল রাজিয়া। রক্তমাখা খঞ্জর তার হাতে। কাছে গিয়ে দু’হাত উপরে তুলে গভীরভাবে ওর ঘুম পরখ করতে লাগল রাজিয়া। নিয়মিত নিঃশ্বাস ফেলায় উঠানামা করছে বুক। এক পলক যুলকারনাইনের চেহারার দিকে তাকাল রাজিয়া।
হঠাৎ যুলকারনাইনের ঠোঁটে দেখা দিল মুচকি হাসি। হয়তো ঘুমের মধ্যে কোন স্বপ্ন দেখে হাসছে সে। অসম্ভব মায়াবী চেহারা। মনকাড়া ওর হাসি। রাজিয়ার দেখা এই জগতের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্পাপ যুবক। হিন্দু মুসলিম সকলের কাছে প্রিয় যুলকারনাইন। উঁচু নীচু ধনী গরীব সবার কাছে পরম শ্রদ্বেয় কমান্ডার যুলকারনাইন। এই দূরদেশের চরম শত্রুদের কাছেও যুলকারনাইন একটি পরিচিত মুখ আদরনীয় নাম।
যুলকারনাইনের স্বপ্নময় মিষ্টি হাসি রাজিয়ার মধ্যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে দিল। নেশার ঘোর কেটে গেল তার। আসলে শরাব পানের কারণে সন্ন্যাসীর দেয়া ঔষধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকতা ফিরে এসে ছিলো রাজিয়ার মধ্যে। একটু আগে যে রাজিয়া অবলীলায় মহারাজা রাজ্যপালকে খুন করে এলো, স্বামীকে খুন করতে উদ্যত সেই খুনী রাজিয়ার দেহ হঠাৎ কেঁপে উঠলো- উত্তোলিত হাত থেকে রক্তমাখা খঞ্জরটি পড়ে গেল যুলকারনাইনের পেটের উপরে । আর রাজিয়া হাউমাউ করে কেঁদে লুটিয়ে পড়ল যুলকারনাইনের বুকের উপরে।
