সন্ন্যাসীর কথা, তার দৃষ্টি ও ভবিষ্যতবাণী বলার মধ্যে এমন যাদুময়তা ছিল যে, অনভিজ্ঞ রাজিয়া তাৎক্ষণিক বদলে গেলো। কারণ, রক্তমাংসে রাজিয়া ছিল হিন্দু। তাছাড়া বিগত বছরখানেক ধরে রাড়িতে এসে সে হিন্দু মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে থাকে। যার ফলে হিন্দু কৃষ্টি কালচার মনের অজান্তেই তার অন্তরে পুনর্বার বাসা বাধে।
জাতিগতভাবে হিন্দুরা প্রকৃতি পূজারী এবং মানুষের পুনর্জনমে বিশ্বাসী। হিন্দুরা মনে করে মানুষ একবার মরে গিয়ে কৃতকর্মের ভিত্তিতে পুনর্বার পৃথিবীতে পুনর্জন্ম লাভ করে। ধর্মকর্ম পালন করলে মরে গিয়ে মানুষ আবার বিভিন্ন হিংস্র জন্তু জানোয়ারের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসে।
সন্ন্যাসীর এই যাদুকরী বাক্য ও ভবিষ্যতবাণী শুনে রাজিয়া এতোটাই তন্ময় হয়ে পড়ল যে, সে সন্ন্যাসীর সামনে থেকে উঠতেই চাচ্ছিল না। সন্ন্যাসীর কথায় সে বুঝতে পারল, ইসলাম গ্রহণ করে সে মারাত্মক অপরাধ করেছে, যে অপরাধের কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই। এই অপরাধের জন্যে পুনর্জন্মে রাজিয়া শিয়ালের রূপধারণ করে দুনিয়াতে আসবে এবং ইতর জানোয়ারের জীবন যাপন করবে।
সঙ্গী মেয়েরা সন্ন্যাসীকে অনুরোধ করতে লাগলো। তারা সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বললো- বাবাজী! এই মেয়ে বুঝে শুনে ধর্ম ত্যাগ করেনি। আপনি তার প্রতি একটু সদয় হোন। কিন্তু সন্ন্যাসী আর কোন কথা বলল না। অনেক্ষণ পর যদিও মুখ খুলল, কিন্তু বজন গাইতে লাগল। অনেক অনুরোধের পর বললো
এই মেয়েটিকে আর নদীতে নিয়ে যেয়ো না- গম্ভীর কণ্ঠে বললো সন্ন্যাসী। মথুরার জলহস্তি ওকে আস্ত গিলে ফেলার জন্যে এসে গেছে। শুধু শুধু আমি মেয়েটিকে দেখিনি। বাতাসে একটি গন্ধ ভেসে এসেছে, যা দুনিয়ার কোন মানুষ টের পায় না। এই গন্ধ হলো সেই সব পাপিষ্ঠ আত্মার গন্ধ, যে সব আত্মারা পাপের মধ্যে ডুবে থাকে এবং ভেতরে ভেতরে নরকের আগুনে জ্বলতে থাকে।
তোমরা আমার কাছাকাছি এলে এই মেয়েটির দেহ থেকে আমার নাকে এমন গন্ধ লেগেছিল। এজন্য আমার ধ্যান ভেঙ্গে যায়। আমি মেয়েটির প্রতি তাকিয়ে থাকি। আহা! মরার পর যার আত্মা পাপিষ্ঠ হবে, জীবন্ত অবস্থায়ই তা নরকে জ্বলতে শুরু করেছে!
হঠাৎ রাজিয়া রূপী রত্না বলতে লাগল- হ্যাঁ, ঋষি বাবা! আমি সত্যিকার অর্থেই পাপি। আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করেছি। এক লোক আমার অন্তরকে জয় করে নিয়েছিল। ভালোবাসার টানে আমি ধর্মান্তরিত হয়ে তাকে বিয়ে করি। কিন্তু আমার ধর্মকে আমি ভুলতে পারিনি। আমি আসলে কিছুই জানি না সাধু বাবা! আমি একটা মূর্খ। আমাকে এই নরক থেকে বাঁচার পথ দেখান।
কিন্তু যে পাপ তুমি করে ফেলেছো, এর শাস্তি থেকে তুমি কিভাবে মুক্তি পাবে?
কিভাবে এই পাপ থেকে বাঁচতে পারবো, সে কথা আপনি বলে দিন ঋষি বাবা! আপনি অবশ্যই সেই পথের খবর রাখেন। আত্মাকে পাপের শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্যে আমি জীবন্ত চিতায় শুতেও রাজি আছি। পরজনমের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্যে আমি নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও রাজি।
কি বলবো, বলতেও ভয় করে! তোমার যদি সাহস থাকে তবে শোন। পানি থেকে সব সময় দূরে থাকবে। তোমাকে একটি জীবনের বলিদান করতে হবে!
দু’চোখ বন্ধ করে খুব ক্ষীণ আওয়াজে কথা বলছিল সন্ন্যাসী। হ্যাঁ, তোমার পাপ মোচনের জন্যে তোমাকে অনেক বড় মানুষের বলিদান করতে হবে। তোমাকে বড় মানুষ খুন করতে হবে। হ্যাঁ, বলা মুশকিল মহারাজাকে বলিদান…।
হ্যাঁ, যেকোন পাপীকে হত্যা করে পাপের স্খলন ঘটাতে হবে। মহারাজাও পাপী, যে মহারাজা তার বাপদাদার ভগবানদেরকে মুসলমানের হাতে ধ্বংস করিয়ে এখন তাদের বন্দী জীবন নিয়ে পরম তৃপ্তিতে আছে।
হ্যাঁ, সে পাপী, বড় পাপীষ্ঠ, মহাপাপী রাজা।
শোন মেয়ে! যদি তোমার পাপের স্থলন চাও, তাহলে এই পাপি রাজাকে খুন করে ফেলো। প্রথমে মহারাজার রক্তের টিপ নিজের কপালে লাগাও, পরে এই টিপের উপরে তোমার পাপিষ্ট স্বামীর রক্তের টিপ লাগাও। এর পর সোজা মন্দিরে চলে যাবে। সেখানে গেলে আলো দেখতে পাবে। এই আলো হবে তোমার মুক্তির ইঙ্গিত।
হত্যা? স্বগতোক্তি করলো রাজিয়া। কেঁপে উঠলো তার সর্বাঙ্গ। না, না! আমি তা পারবো না!
হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। রাজপুতের মেয়ে একটা পাপিষ্টকে হত্যা করতে ভয় পায় বললো সন্ন্যাসী। ঠিক আছে, যদি ভয় পাও তবে নদীতে চলে যাও। নদীতে নেমে জলহস্তির পেটে চলে যাও, আর পরজনমে শিয়াল হয়ে ফিলে এসো।
আজ যাকে ছেড়ে দিচ্ছো, সেই মহারাজার পালিত কুকুরেরা তোমাকে ছিঁড়ে খাবে। এই মহারাজার তীরের আঘাতে তুমি আহত হবে। তীরবিদ্ধ অবস্থায় জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মরবে। তোমার জখমে ঘা হবে। ঘায়ে পোকা হবে। আর পোকার কামড়ে তুমি চিৎকার করে জঙ্গলে দৌড়াবে। যাও! তাই হবে, তাই হবে।
রাজিয়ার সঙ্গীনী এক মেয়ে সন্ন্যাসীর উদ্দেশ্যে বললো- সাধু মহারাজ! দেবতাদের অভিশাপ ঠেকানো যায় না। আপনি রাজাকে খুন করার কোন সহজ পন্থা তাকে বলে দিন। যাতে একাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়। তার প্রতি দয়া করুন। মহারাজ! ভগবানের কৃপা থেকে তাকে দূরে ঠেলে দেবেন না। রাজিয়া ও সঙ্গীনী মেয়েদের উপর্যপরী অনুরোধে সন্ন্যাসী মহারাজা রাজ্যপালকে হত্যার যে পদ্ধতি বললো, তা ছিল এমন–
