একের পর এক ফন্দি এঁটে গোবিন্দ মহারাজা রাজ্যপালের রাজমহলে যাতায়াতের অনুমতি পেয়ে গিয়েছিল। এবার সে রাজ্যপালকে কিভাবে হত্যা করা যায় এ ফন্দি আঁটতে লাগল। হিন্দু হওয়ার সুবাদে হিন্দুদের সাথে সে মেলামেশা বাড়িয়ে দিল। স্থানীয় গোঁড়া হিন্দুদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার জন্যে গোবিন্দ মন্দিরে যাতায়াত বাড়িয়ে দিল। মন্দিরের পুরোহিতদের সাথেও সে গড়ে তুললো গভীর সম্পর্ক। মন্দিরের গোপণ প্রকোষ্ঠে বসে সে পুরোহিতদের সাথে রাজা রাজ্যপাল ও সুলতান মাহমূদ সম্পর্কেও খোলামেলা আলাপ আলোচনা করতো । মন্দিরে গিয়ে গোবিন্দ নিজেকে একজন নিষ্ঠাবান ধার্মিক হিন্দু হিসেবে জাহির করতো।
একদিন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত গোবিন্দকে জানাল, এ হিন্দু মেয়ে মুসলমান হয়ে কমান্ডার যুলকারনাইনকে বিয়ে করেছে। হিন্দু মেয়েরা আমাকে জানিয়েছে, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যুলকারনাইনের স্ত্রী মুসলমান হয়েছে বটে, কিন্তু তার হৃদয়ে হিন্দুত্ববাদ বহাল রয়েছে। স্বামীকে সে এতোই শ্রদ্ধা করে যে, স্বামীর ধর্মকেই সে নিজের ধর্ম মনে করে। কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে সরে গিয়ে আশপাশের চতুর্দিকে তাকালে তার কাছে হিন্দুত্ববাদই আকর্ষণীয় মনে হয়। সে হিন্দু মহিলাদের জানিয়েছে, তার স্বামী তাকে বলেছে, সে যেন হিন্দু মেয়েদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম প্রচার করে। এই সুবাদে সে হিন্দু মেয়েদের সাথে মেলামেশা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইসলামের কোন কথাই সে মুখ থেকে বের করে না।
অসহায় এই মেয়েটিকে এই ডাকাতের হাত থেকে মুক্ত করা দরকার। মেয়েটি শৈশব থেকেই ধর্মনিষ্ঠ পরিবারে বেড়ে উঠেছে। ধার্মিক পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে হিন্দুত্ববাদ তার রক্তের শিরায় শিরায় মিশে আছে। কিন্তু কমান্ডার যুলকারনাইন মেয়েটির প্রতি এমন সহানুভূতি দেখিয়েছে যে, মেয়েটি যুলকারনাইনের উপকার ভুলতে পারছে না।
একথা শোনে গোবিন্দের মাথায় দারুণ বুদ্ধি এলো। সে বুঝে নিল এই মেয়েটিকে কাজে লাগানো যেতে পারে। গোবিন্দ ছিল ধূর্ত। চাতুর্যপূর্ণ বুদ্ধিমত্তায় তার কোন জুড়ি ছিল না। সে ভাবনায় পড়ে গেল, এই মেয়েটিকে কি রাজ্যপালের হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা যায়?
চিন্তা ভাবনা করে সে একটা পথ আবিষ্কার করে ফেলল। পণ্ডিতকে গোবিন্দ বললো, আপনি আমাকে সেই সব হিন্দু মেয়েদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন যেসব মেয়েদের সাথে এই মেয়েটি মেলামেশা করে।
পণ্ডিত গোবিন্দকে জানালো, মেয়েটি হিন্দু মেয়েদের সাথে শুধু গল্পগুজবই করে না, সে তাদের সাথে স্নান করতে নদীতেও যায়। তার স্বামী এসবকে কিছু মনে করে না। স্বামী মেয়েটিকে খুবই বিশ্বাস করে এবং তার উপর গভীর আস্থা রাখে।
এই আলোচনার কয়েক দিন পর এক দিন দুপুরে রাজিয়া আরো কয়েকজন হিন্দু মেয়ের সাথে নদীতে গোসল করতে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে ছিল বড় বড় অশ্বথ বৃক্ষ ও ঝোঁপ ঝাড়।
একটি বড় অশ্বথ গাছের নীচে একজন সন্যাসীরূপী বয়স্ক লোক মাথা নীচের দিকে করে বসেছিল। লোকটির ছিল লম্বা দাড়ি এবং মাথার চুল কাধ পর্যন্ত দীর্ঘ। চেহারা ছবি অনেকটা মুসলমানদের মতো। কিন্তু তার পোষাক পরিচ্ছদ হিন্দু সন্ন্যাসী ঋষিদের মতো। রাজিয়া ও তার সঙ্গীনী মেয়েরা যখন লোকটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন মাথা সোজা করে আঙুল উঁচিয়ে মেয়েদের থামতে ইঙ্গিত করল । মেয়েরা তার ইঙ্গিতে দাঁড়ালো। সাধুরূপী লোকটি তাদেরকে পাশে বসিয়ে রাজিয়ার চোখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
রাজিয়ার দৃষ্টিও লোকটির চেহারার মধ্যে নিবদ্ধ ছিল। সন্ন্যাসী রাজিয়ার চোখে চোখ রেখে তার দুটি হাত রাজিয়ার মাথায় রাখল এবং ধীরে ধীরে তার কপালে হাত বুলাতে লাগল। সঙ্গিনী মেয়েরা দেখল, রাজিয়া পলকহীন দৃষ্টিতে সন্ন্যাসীকে দেখছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে মেয়েটি যেন সম্বিত হারিয়ে ফেলেছে, সে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে সন্ন্যাসীর চেহারার দিকে।
তোমার আত্মা পথ হারিয়ে দিগ্বিদিক ঘুরছে- দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ আওয়াজে কানে কানে বলার মতো করে রাজিয়ার উদ্দেশ্যে বললো সন্ন্যাসী। সে আরো বললো, তোমার অন্তর এক জায়গায়, আর দেহ আরেক জায়গায়। অন্তর পবিত্র, কিন্তু দেহ অপবিত্র। এক চোখে আলো অপর চোখে ঘোরতর অন্ধকার। পর জনমের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। পর জনমে শিয়ালের রূপ ধারণ করবে। মানুষ ধূর্ত শিয়াল বলে ঘৃণা করবে।
হঠাৎ সন্ন্যাসী মাথা ঝাকুনী দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠার মতো করে বললো- যাও! চলে যাও। ছিঃ! জগতে এমন পাপিষ্ঠ অন্তরও থাকে?
নওমুসলিম অনভিজ্ঞ রাজিয়ার অন্তরে সন্ন্যাসীরূপী এই লোকের সংশয়পূর্ণ কথায় মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হলো। রাজিয়ারূপী রত্মার অন্তরে শুরু হলো দ্বান্দ্বিক তোলপাড়।
সন্ন্যাসী স্বগতোক্তির মতো করে বলতে লাগল- এক চোখে ঘোরতর অন্ধকার। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা, তুমিও কিছুই দেখবে না। তুমি তা বরদাশত করতেও পারবে না। যাও, চলে যাও। মসজিদ ও মন্দিরের মাঝামাঝি ঘোরতর অন্ধকার। তুমি এই অন্ধকারে হাতড়ে মরবে। নিজের পরিণতির কথা জিজ্ঞেস করো না। যদি জিজ্ঞেস করো, তাহলে মরে যাবে। যদি মরতে না পারো তাহলে পাগল হয়ে যাবে।
