মনে রাখতে হবে, রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণপালও তার বাবার ঘোরতর শত্রু। তাকেও রাজার কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে এবং লক্ষণের উপর কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে।
গোবিন্দ ছিল স্বার্থপর । শিক্ষিত চতুর। অর্থলোভী গোবিন্দের কাছে জাতি ধর্মের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থটাই ছিল বড়। এ জন্য তার কাছে জাতিধর্ম সবই ছিল সমান। শাসক হিন্দু না মুসলমান এটা তার কাছে মুখ্য ব্যাপার ছিল না। সে ছলচাতুরী করে যে কোন শাসককেই পক্ষে নিয়ে আসতে পারতো। কনৌজ গযনী বাহিনী দখল করে নেয়ার পর কোন হিন্দুর পক্ষে ওখানকার গভর্ণরের কাছাকাছি যাওয়ার সাহস হয়নি। কিন্তু নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষ ও শাসকদের জন্যে হিতাকাংখী সেজে মুসলিম গভর্নর আব্দুল কাদের সেলজুকীর কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গোবিন্দের কোনই বেগ পেতে হয়নি।
তিন রাজ্যের মহারাজাদের বৈঠকে গোয়ালিয়রের মহারাজা যখন গোবিন্দের প্রশংসা করে বললেন, গোবিন্দ! তোমার পক্ষেই কেবল বাড়ীতে গিয়ে রাজা রাজ্যপালকে খুন করানো সম্ভব। তুমিই পারবে সাফল্যের সাথে এ কাজ করতে। যদি তা করতে পারো, তবে আমার রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় জায়গীরের অধিকারী হবে তুমি। বাকী জীবন রাজার হালতে কাটিয়ে দেবে। সেই সাথে দেশের সেরা সুন্দরী মেয়েটিকে তোমার রক্ষিতা বানিয়ে দেয়া হবে।
বিশাল এই ভূসম্পত্তির প্রতিশ্রুতি ছিল গোবিন্দের জন্য লোভনীয়। ছোট ৰাটো একটি এলাকার অধিকারী হওয়া কম কথা নয়। মোটামুটি রাজা না হলেও পরগনার শাসক। লোকেরা এমন জায়গীরদারকেও রাজার মতোই সম্মান করে। কর দেয়, খাজনা দেয়। জায়গীরদারের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী থাকে। যখন যাকে ইচ্ছা তাকে ভোগ করতে পারে।
গোবিন্দ একজন অর্থ পিশাচ ও চতুর লোক। এই অঞ্চলের সব রাজ্য শাসকই তার ভক্ত। সবাই গোবিন্দের বুদ্ধি ও মেধার প্রশংসা করে। কিন্তু তাই বলে কেউ তো আর তাকে রাজার মতো কুর্ণিশ করে না। অথচ এসব রাজা মহারাজা কেউ তার মতো এতো প্রখর মেধার অধিকারী নয়। গোবিন্দের মতো লোকেরই রাজা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভারতের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের ধারা অনুযায়ি এটা অসম্ভব। সাধারণ মানুষ মনে করে রাজ্য শাসন সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ভগবানের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে কোন বংশের লোকেরা রাজ্য শাসন করবে।
জায়গীর পাওয়ার লোভ সামলাতে পারলো না গোবিন্দ। সে সুযোগ খুঁজতে লাগলো কি ভাবে রাজ্যপালকে খুন করবে। গভর্ণর সেলজুকীর কাছ থেকে সে অনুমতি আদায় করে নিল। গোবিন্দ রাজার সাথে সাক্ষাত করতে না পারলেও রাজমহলের আশেপাশের এলাকায় বিনা বাধায় ঘোরাফেরা করতে পারবে।
এদিকে গভর্নর আব্দুল কাদের সেলজুকীর জন্যে গোবিন্দের দেয়া তথ্যগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গোবিন্দকে বহু মূল্যের পুরস্কার দিয়ে বললেন, তুমি রাড়ী চলে যাও এবং রাজমহলের আশেপাশে থেকে সন্দেহজনক লোকদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখো। সেই সাথে কমান্ডার যুলকারনাইনের কাছে গভর্নর সেলজুকী বার্তা পাঠালেন, কোন ভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধি যদি রাজার সাথে সাক্ষাত করতে আসে তবে তাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেবে না।
এর কয়েকদিন পর কালাঞ্জরের পুরোহিত কালাঞ্জরের রাজা গোবিন্দের প্রতিনিধি হয়ে রাজ্যপালের সাথে সাক্ষাতের জন্যে রাড়ীতে পৌঁছাল। রাড়ীর শহরতলীতে তাঁবু ফেলে কালাঞ্জর রাজার প্রতিনিধি রাজ্যপালের কাছে খবর পাঠালো, মহারাজা গোবিন্দের প্রতিনিধি আপনার সাথে রাজমহলের বাইরে তাঁবুতেই সাক্ষাত প্রত্যাশা করে।
কমান্ডার যুলকারনাইন সংবাদবাহী পুরোহিতকে রাজার কাছে পৌঁছতেই দিল না। পুরোহিত যখন হতাশ হয়ে ফিরে যেতে প্রস্তুত হলো, তখন গোবিন্দ তার কাছে পৌঁছাল। গোবিন্দ পুরোহিতকে জানাল, বাস্তবে রাজা রাজ্যপাল এখন মুসলমানদের হাতে বন্দি। বর্তমানে তার উপর বিধি নিষেধের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে। হতাশ হয়ে পুরোহিত গোবিন্দকে অনুরোধ করলো, আমি তো ব্যর্থ হলাম। আপনি রাজ্যপালকে হত্যার সমুদয় ব্যবস্থা করুন।
গোবিন্দ মহারাজাদের থেকেও সুবিধা নিতো। গোবিন্দ তার প্রতি রাজাদের আস্থার মাত্রা আরো বাড়ানোর জন্য পুরোহিতকে বললো, আপনি রাজ্যপালের ছেলে লক্ষণপালকে আপনার সাথে নিয়ে যান। নয়তো রাজা নিহত হলে গযনী বাহিনী লক্ষণপালকে কয়েদ করতে পারে। গোবিন্দ পুরোহিকে জানালো, লক্ষণ একটি যুবক ছেলে। যৌবনের উষ্ণতায় সম্প্রতি সে এমন কিছু কাজ করেছে যে, গযনী বাহিনী তার প্রতি সন্দেহ পোষণ করছে। গযনীর শাসকরা ভাবছে, তারা লক্ষণের চলাফেরার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করবে, অথবা লক্ষণকে নজরবন্দি করে রাখবে।
পুরোহিতকে একথা বলে গোবিন্দ সোজা লক্ষণ পালের কাছে চলে গেল। লক্ষণকেও সে একই কথা শোনাল যা পুরোহিতকে বলেছিল। একথা শুনে গোপনে লক্ষণপাল পুরোহিতের সাথে চলে গেল এবং যাবার সময় গোবিন্দকে বলে গেল, সে যেন তার বাবাকে হত্যার ব্যবস্থা করে। লক্ষণ নিজেও গোবিন্দকে লোভনীয় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিল। লক্ষণের মুখে পুরস্কারের ঘোষণা শুনে গোবিন্দ রাজ্যপালকে হত্যার জন্যে উন্মুখ হয়ে উঠলো।
গোবিন্দ গভর্ণর আব্দুল কাদের সেলজুকীকে যে তথ্য দিয়েছিল এসব তথ্য লিখে তিনি দ্রুত একজন সংবাদবাহককে গযনী সুলতানের কাছে প্রেরণ করলেন। সেলজুকী পয়গামে লিখলেন, এখানকার মহারাজাদের উপর আস্থা রাখা যায় না। কাজেই এখানকার কোন উদ্ভূত পরিস্থিতি কিংবা হামলা বা অবরোধ ঠেকাতে একটি অশ্বরোহী ইউনিটকে জলদি পাঠিয়ে দিন। বড় কোন আঘাত হলে যাতে আপনাদের আসা পর্যন্ত শত্রুদের ঠেকিয়ে রাখা যায়।
