এ ব্যাপারে আলোচনা পর্যালোচনার পর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো, লক্ষণপালকে হিন্দুদের পক্ষে কাজ করার সুযোগ দেয়ার জন্য রাজা রাজ্যপালকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু কোন রাজা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারলো না, কে রাজ্যপালকে হত্যা করবে এবং কিভাবে করবে?
গোবিন্দ জানালো, রাজ্যপাল কার্যত মুসলমানদের হাতে বন্দি। তার নিরাপত্তা বাহিনীতে সব সময় তিন চারজন গযনী সেনা অবস্থান করে। কাজেই রাজ্যপালকে প্রকাশ্যে হত্যা করে ফিরে আসা সহজ ব্যাপার নয়।
একজন বললো, রাজ্যপালের কোন নর্তকীকে হাত করে তার মাধ্যমে খাবারে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করতে হবে। আরেকজন এটা প্রত্যাখ্যান করে বললো, এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। কোন পেশাদার নর্তকী একাজ করতে মোটেও রাজি হবে না।
এ ব্যাপারে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে- বললো পুরোহিত। আমাকে কালাঞ্জর রাজ্যের দূত হিসেবে মহারাজা রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হোক। আমার সাথে আরো কিছু লোক দেবেন। আমি রাড়ীর বাইরে তাঁবু ফেলে রাজ্যপালকে খবর দিবো যে, কালাঞ্জরের পক্ষ থেকে মহারাজার কাছে দূত এসেছে। দূত তার তাঁবুতেই মহারাজার সাথে মিলিত হতে চান। আমার তাঁবুতে যদি রাজ্যপাল আসে, তাহলে আমি কোন পানীয় বা খাবারে মিশিয়ে তাকে এমন বিষ খাইয়ে দেবো, যা খুব ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, কেউ কিছুই টের পাবে না।
কয়েক দিন পরই রাজা দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে যাবে। দশ/পনেরো দিনের মধ্যে পেটের পীড়ায় ভুগে সে মারা যাবে। কোন ডাক্তার বদ্যি কাজে আসবে না। বিষ প্রয়োগের বিষয়টি কেউ মাথায়ও আনবে না।
তবে বিষ প্রয়োগের আগে আমি তাকে সম্মত করাতে চেষ্টা করবো, দৃশ্যত তিনি যেন গযনী বাহিনীর মিত্র হয়েই থাকেন এবং সময় সুযোগ মতো বিদ্রোহ করেন। আমি তার মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করবো, আসলে সে আমাদের ধোকা দেবে না, গযনী সরকারকে ধোঁকা দেবে। পরিস্থিতি বুঝে আমি সিদ্ধান্ত নেবো, তার বেঁচে থাকা দরকার না মৃত্যু দরকার।
আপনার এই পরিকল্পনায় কোন কাজ হবে না। কারণ, গযনীর কমান্ডাররা তাকে রাড়ীর সীমানার বাইরে যেতে দেবে না- বললো গোবিন্দ। আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। কিন্তু আমি যতটুকু জানি, আমি গভর্ণর আব্দুল কাঁদেরের ব্যক্তিগত বন্ধু ও অতি আস্থাভাজন লোক। আমাকেও রাজার সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দেয়া হয় না।
অবশ্য আমার কাছে একটা ফর্মুলা আছে। মহারাজা রাজ্যপাল খুবই নারী পাগল। তার সবসময় নতুন নুতন সুন্দরী মেয়ে না হলে চলে না। আপনি যদি দুতিনটি সুন্দরী মেয়েকে সাথে নিয়ে যেতে পারেন। আর কোনভাবে রাজার কানে খবরটি পৌঁছে দিতে পারেন যে, রাজার জন্য অতি সুন্দরী মেয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। তাহলে সে গযনীর শাসকদের অনুরোধ করে, বলে কয়ে আপনার কাছে চলে আসতে পারে।
তোমরা এ ব্যাপারে যে পদ্ধতিই অবলম্বন করোনা কেন, যে কেউ হোক কাজটি যে করে দিতে পারবে এবং প্রমাণ করতে পারবে যে, সে রাজ্যপালকে হত্যা করেছে, আমি তাকে জায়গীর ও সোনাদানা দিয়ে ভরে দেবো। তাকে এমন সুন্দরী মেয়ে জীবনের জন্যে দিয়ে দেবো, যা কোন দিন সে কল্পনাও করতে পারবে না- বললো গোয়ালিয়রের রাজা অর্জুন।
রাজা অর্জুন গোবিন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন, গোবিন্দ! তুমি ইচ্ছা করলে এ কাজটি করতে পারো। যেহেতু তুমি ওখানে সবার কাছে বিশ্বস্ত, তাই রাজাকে খুন করার কোন না কোন একটি পন্থা তুমি বের করে নিতে পারবে।
পণ্ডিত মশাইও যেতে পারেন। সবাইকে জানিয়েই বলছি, দু’জনের মধ্যে যেই সফল হবে, সেই হবে আমার রাজ্যের সবচেয়ে বড় জায়গীরের মালিক। ভারতের সবচেয়ে সুন্দরী রক্ষিতা থাকবে তার ঘরে। রাজ্যপালের মৃত্যুর পর আমরা আবার সবাই বসে সিদ্ধান্ত নেবো, আমাদেরকে কি করতে হবে। আপাদত এই কাজটিই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হোক।
গোবিন্দের এই ফর্মুলা সবার পছন্দ হলো এবং সবাই এক বাক্যে গোবিন্দকেই রাজ্যপালকে খুন করার দায়িত্ব দিল । সেই সাথে রাজা অর্জুনের মতো অন্যেরাও একাজে সফল হলে তাকে মোটা অংকের পুরস্কার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিল।
তিন মহারাজার এই চক্রান্তমূলক বৈঠকের কয়েক দিন পর দ্বিমুখী গোবিন্দ কন্নৌজে গভর্নর আব্দুল কাদের সেলজুকীর সামনে বসা ছিল। গোবিন্দ গভর্ণর সেলজুকীকে বলছিল, তিন রাজার বৈঠকে কি কি সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই সাথে বললো, মহারাজা রাজ্যপালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো সুসংহত করা দরকার।
লাহোরের মহারাজা তরলোচনপালের সৈন্যরা কোথায় অবস্থান করছে? গোবিন্দের কাছে জানতে চাইলেন গভর্ণর সেলজুকী। যতটুকু মনে হয় এখান থেকে খুব দূরে নয়, তবে ঠিক কোথায় তারা অবস্থান করছে তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, বললো গোবিন্দ। এমনও হতে পারে তরলোচনপালের সৈন্যরা এখান থেকে লাহোর ফিরে গেছে। অবশ্য এখন তরলোচনপালই সব চেয়ে বেশি ভয়ংকর লোক।
এরপরও আমি আপনাকে বলতে চাই, সব রাজা মহারাজা এখন রাজ্যপালের প্রাণের শত্রু। তারা সবাই রাজ্যপালকে হত্যার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে। যে কোন দিন রাজ্যপাল কোন আততায়ীর হাতে নিহত হতে পারেন। কারণ, আপনাদের কোন লোকই তার সব নিরাপত্তারক্ষী, দরবারী আমলা এবং রাজমহলের বাসিন্দাদের চেনে না। কিন্তু আমি সবাইকে চিনি। কাজেই আমাকে রাজমহলের ধারে কাছে কোথাও থাকতে দিন; যাতে আমি ওখানকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে পারি।
