রাজিয়া ছিল একেবারে নিঃস্ব ও নিরূপায়। বাবা মা ভাইকে হারিয়ে আশ্রয় পাওয়ার মতো তার কেউ ছিল না। তার সামনে একমাত্র পথ ছিল মন্দিরে আশ্রয় নেয়া। কিন্তু মেয়েটিকে মন্দিরের অন্ধকার জীবনে ঠেলে দিতে চাচ্ছিল না যুলকারনাইন। কারণ রত্মার রূপ সৌন্দর্য ও তার অসহায়ত্বের দিকটি যুলকারনাইনকে অনেকটা বাধ্য করে তুলেছিল মেয়েটির দায় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে এবং অন্ধকার জীবন থেকে মেয়েটিকে আলোর পথে নিয়ে আসতে। মেয়েটির অসহায়ত্ব এবং যুলকারনাইনের প্রতি আত্মনিবেদন সেনাবাহিনীর ইমাম ও সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকীকেও মেয়েটির প্রতি দয়াপরবশ করে তুলেছিল। ফলে তারা কেউ যুলকারনাইনের সাথে রাজিয়া ওরফে রত্নার বিয়েতে বাধা দেননি।
সময়ের ব্যবধানে রাজিয়ার বিয়ের সংবাদ সুলতান মাহমুদের কানেও পৌঁছাল কিন্তু যুলকারনাইনের কর্তব্য নিষ্ঠা এবং রাজিয়ার অসহায়ত্ব ও যুলকারনাইরে কাছে তার স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের কথা শুনে এ ব্যাপারে সুলতানও কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি।
একটা নিয়ম মতো রুটিন মাফিক হিন্দুস্তান থেকে বিভিন্ন সংবাদ নিয়ে গযনীতে দূত পাঠানো হতো। হিন্দুস্তানের বিভিন্ন জায়গায় গযনী সুলতানের যেসব গোয়েন্দা অবস্থান করছিল তাদের সরবরাহকৃত খবরও সমন্বয় করে গযনী সুলতানের কাছে পাঠানো হতো।
গোয়েন্দাদের পাঠানো তথ্যমতে লাহোরের মহারাজা তরলোচনপাল তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে রাজধানী থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সে গঙ্গা যমুনার মধ্যবর্তী কোথাও অবস্থান না করে আরো উত্তরের দিকে কোন পাহাড়ী এলাকায় আত্মগোপন করেছিল। কেন সে রাজধানী থেকে সৈন্য সামন্ত নিয়ে আত্মগোপন করেছিল, তার উদ্দেশ্য ও অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দারা সঠিক কোন তথ্য উদ্ধার করতে পারেনি।
রাজা তরলোচনপালের ইচ্ছা যাই থাকুক, তার কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা পূরণের আয়োজন চলছিল কালাঞ্জরে। কালাঞ্জরের রাজা গোবিন্দের রাজ মহলে গোয়ালিয়রের রাজা অৰ্জুন এবং লাহোরের রাজা তরলোচনপাল মিলিত হলো। তাদের সাথে গোবিন্দ নামের এক অভিজাত হিন্দু এবং কালাঞ্জরের প্রধান পুরোহিতও উপস্থিত ছিল। তাদের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল, মহারাজা রাজ্যপাল তাদেরকে ধোকা দিয়েছে এবং মৈত্রী চুক্তির আড়ালে সে সুলতান মাহমূদের বশ্যতা স্বীকার করে তার গোলামী করছে। তারা আলোচনা করছিল কিভাবে রাজ্যপালকে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া যায়।
নানামুখী আলোচনা পর্যালোচনা যখন তুঙ্গে ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের কক্ষের বাইরে চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ শোনা গেল। চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ শুনে সবাই উপরের দিকে তাকালেন। তারা ভাবলেন উপর তলায় হয়তো কোন নর্তকী কিংবা মহিলা নাচের ঘুঙুর পরে উঁকি দিয়েছে। কিন্তু চতুর্দিকে দৃষ্টি ঘুরে কক্ষের মধ্যে ঝুলন্ত রেশমী কাপড়ের পর্দায় তাদের দৃষ্টি আটকে গেল। ওই পাতলা পর্দার আড়ালে সাধারণত রাণী বা রাজকুমারীদের কেউ এসে বসতো। সবাই লক্ষ করলো অতি পাতলা পর্দার আড়ালে সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক নারী দাঁড়িয়ে। বিবস্ত্র নারীর অস্তিত্ব দেখে সবার দৃষ্টি অবনমিত হয়ে গেল।
এই নাও, গল্পে গল্পে আর মদের গ্লাসে আসর না মাতিয়ে তোমরা এই চুড়িগুলো পরে নাও! পর্দার ওপাশ থেকে তীর্যক শ্লেষাত্মক বাক্য উচ্চারিত হলো।
কী ব্যাপার? দৃষ্টি নীচের দিকে ফিরিয়ে নিয়েছে কেন? আমার দিকে তাকাও। আমি তোমাদের সম্ভ্রম, আমি ভারত মাতা, আমি ইন্দ্রাদেবী। দেখে নাও আমাকে, আমি সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। তোমরা আমাকে এমন বিবস্ত্র করেছে। তোমরা নির্লজ্জ। এখন সব লজ্জার ভান করে দৃষ্টি নীচের দিকে নামিয়ে নিয়েছে কেন?
এই ইন্দ্রাদেবী ছিল মহারাজা গোবিন্দের স্ত্রী, বড় রাণী। রানীর এই অবস্থা দেখে মহারাজা গোবিন্দ রাগে ক্ষোভে অপমানে জ্বলে উঠলো। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে গর্জন করে বললো- ভালো চাও তো এখান থেকে চলে যাও শকুন্তলা! শোনে রাখো, শিবাজী এবং হরেকৃষ্ণের অমর্যাদার প্রতিশোধ নিয়েই আমি তোমার কাছে আসবো। যে পর্যন্ত ভারত মাতার বুকে গযনীর একটি সৈন্যও অবশিষ্ট থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমি তোমার চেহারাও দেখবো না, তোমাকে স্পর্শও করবো না। ইন্দ্রাদেবীকে রাজা শকুন্তলা নামে ডাকতো।
রাখো তোমার এই শপথ! তাচ্ছিল্য মাখা কণ্ঠে বললো রাণী শকুন্তলা। রাজপুতদের রক্ত আর তোমাদের দেহে প্রবাহিত নেই। শরাবের নেশা রাজপুত রক্তকে পানি করে ফেলেছে। তোমরা যদি সত্যিকার আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হতে, তাহলে সলাপরামর্শের নামে রাজমহলে বসে শরাবের নেশা করতে পারতে না। তোমরা কেন সেই ময়দানে যাচ্ছে না, যেখানে ভারত মাতার হাজারো সন্তান জীবন দিয়েছে? তোমরা সেই সব মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের নীচে পড়ে কেন মৃত্যুবরণ করলে না মুসলমানরা যেসব মন্দির ধ্বংস করেছে?
রাণী! এখনো তুমি এখান থেকে যাচ্ছো না? আমাকে কি কোন ব্যবস্থা নিতে হবে? ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো রাজা গোবিন্দ।
রাজার একথা শুনে কালাঞ্জরের প্রধান পুরোহিত দাঁড়িয়ে গেল। সেই যুগে হিন্দু রাজা মহারাজারা রাজ্য শাসন করতো আর রাজাদের শাসন করতো পুরোহিতেরা। কোন কোন এলাকায় সরাসরি পুরোহিতদের শাসন চলতো। গোটা হিন্দুস্তান জুড়ে ছিল পুরোহিতদের দাপট। রাজা মহারাজাদের যতো দাপটই থাক না কেন কোন না কোন ভাবে তারা পুরোহিতদের দ্বারা প্রভাবিত হতো। পুরোহিতদের অদৃশ্য শাসন চলতো সবখানে।
