কালাঞ্জরের এই বৈঠকে পুরোহিত যখন রানী শকুন্তলাকে পর্দার ওপাশে সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেখতে পেল তখন সে রাগে ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো এবং রাজাদের উদ্দেশ্যে বললো- আপনারা বলছেন, রানী এখান থেকে যাচ্ছে না কেন? আমি বলি রাণী এই অবস্থাতেই আমাদের সামনে আসছে না কেন? যাতে আমরা ভালো ভাবে বুঝতে পারি, বিবস্ত্র অর্ধার্মিক আত্মমর্যাদাহীন একটি জাতি কেমন হতে পারে?
সুলতান মাহমূদ ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য দখল করে নিয়েছে দু’বছর হয়ে গেলো। এই দু’বছর, তোমরা আসর বসিয়ে গল্প মারা ছাড়া আর কি করেছো? তাই তোমাদের অস্ত্র সন্ত্র তরবারী এই দেশের নারী ও পুরোহিতদের হাতে দিয়ে তোমরা চুড়ি পড়ে রাজপ্রাসাদে থাকো। নারী আর পুরোহিতরা গিয়ে লড়াই করুক। এখনো তোমাদের নর্তকী আর শরাব নিয়ে রাজমহলে আনন্দ ফুর্তিতে ভাটা পড়েনি। দেবতাদের নামে তোমরা বার বার কসম করেছো, এসব প্রতীজ্ঞা আর কসমও তোমরা রক্ষা করো নি।
এক পর্যায়ে রাণীকে ইঙ্গিত করে পুরোহিত বললো? চলে যাও রাণী! আমি মহারাজাদের কপালে ঘামের ফোঁটা দেখতে পাচ্ছি। আশা করি, লজ্জার এই ঘাম তাদের রক্তকে গরম করবে।
রাণী চলে গেল বটে, কিন্তু দরবার মহলে নেমে এলো নীরবতা। এই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নিলো গযনী বাহিনীর বিরুদ্ধে মারাত্মক এক তুফান। অবস্থা এমন হলো যে, উপস্থিত তিন মহারাজার কেউ কারো প্রতি লজ্জা ও অপমানে তাকাতে পারছিল না।
কনৌজ দুর্গে গযনীর সৈন্য সংখ্যা এক হাজারও হবে না- বললো পুরোহিত। তোমরা হামলা করলে লড়াই ছাড়াই তাদেরকে পরাস্ত করতে পারো। তোমাদের বিপুল জনশক্তি দেখে ওরা লড়াই না করেই হাতিয়ার ফেলে দিতে বাধ্য হবে। কারণ, তাদের সাহায্য করার কেউ এখানে নেই। কে আসবে তাদের সাহায্য করতে?
তাদের এই এক হাজার সৈন্যকে হত্যা করলেও কিছু হবে না; গযনী থেকে মাহমূদ ঝড়ের বেগে চলে আসবে- বললো গোয়ালিয়রের রাজা অৰ্জুন। আর তখন মাহমূদ এসে এমন প্রতিশোধ নেবে যা হিন্দুস্তানের মানুষ কখনো ভুলতে পারবে না। লড়াই করা এবং লড়াই করানো আপনার সাধ্যের ব্যাপার নয় পণ্ডিত মহারাজ! বললো মহারাজা গোবিন্দ। এ ব্যাপারে আপনার চিন্তার চেয়ে আমাদের চিন্তা আরো গভীর। আমাদের সাময়িক কোন বিজয়ের ব্যবস্থা করলেই চলবে না, চিরদিনের জন্যে মাহমূদের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে হবে।
আমাদেরকে ভাবতে হবে সবাই মিলে কিভাবে গয়নী দখল করা যায়। আমাদের এই প্লাবনের উৎস বন্ধ করতে হবে নয়তো কিছুদিন তা থেমে থাকার পর আবার এই প্লাবন আমাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
আপনাদের পক্ষে গযনী দখল করা সম্ভব নয় মহারাজ! বললো পুরোহিত। লাহোরের মহারাজা তরলোচনপাল এখানে আছেন, তারা দাদা মহারাজা জয়পাল গযনীর উপর কতোবার আক্রমণ করেছেন, কিন্তু তার পরিণতি কি হয়েছে আপনারা সবাই জানেন। এই প্রেক্ষিতে আমি তরলোচনপালকে জিজ্ঞেস করতে চাই, গযনী বাহিনী মথুরাকে এভাবে লন্ডভন্ড করে জনমানবহীন করে ফেলল, বুলন্দশহর মুনাজকে ধ্বংস করে দিল, এখন কনৌজকেও ধ্বংস করে দিয়েছে, লাহোরের মহারাজা এ ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? তিনি কোথায় জানি তার সৈন্যদেরকে লুকিয়ে রাখলেন আর অন্যদেরকে লড়াই করতে উস্কানি দিয়ে গেলেন।
এ ক্ষেত্রে আমি ভিন্ন কোন চাল দিতে চাচ্ছিলাম, সেটি করার সুযোগ আমার হয়নি- বললো মহারাজা তরলোচনপাল। আমি গয়নী বাহিনীর উপর পেছন থেকে আক্রমণ করতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু কোন জায়গাতেই দীর্ঘ সময় মোকাবেলা করতে পারেনি আমাদের কোন সহযোগী বাহিনী। মাহমূদ বলতে গেলে প্রতিদিনই আমাদের একেকটি দুর্গ জয় করে নিয়েছে। কনৌজে তো কোন মোকাবেলাই হয়নি। রাজা রাজ্যপাল আগেই রাজধানী ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমিতো শত্রুবাহিনীর পিঠ দেখারই সুযোগ পাইনি।
তরলোচনপাল! বললো মহারাজা গোবিন্দ। আপনার এই চাল আমার মোটেও পছন্দ হয়নি। আপনি যদি আপনার সৈন্যদের গযনী বাহিনীর আগমন পথে নিয়ে আসতেন, তাহলে আর এরা এতো সহজে অগ্রসর হতে পারতো না। তখন পরিস্থিতি ভিন্নতর হতো।
মহারাজা তরলোচনপালের চাল আমি বুঝতে পেরেছি- বললো পুরোহিত। তিনি তার বাহিনীকে লাহোর থেকে এজন্য বাইরে নিয়ে গিছেন, যাতে তার যোদ্ধারা লাহোরের বাইরে থাকে, আর তিনি অন্যদেরকে যুদ্ধে নামাতে পারেন।
পুরোহিতের কথা শুনে তরলোচনপাল ক্ষোভে অপমানে চিৎকার করে বললো- এসব কথা বলে আমাকে অপমান করা হচ্ছে; এমন অপমান বরদাশত করা হবে না ।
তরলোচনপালের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে পুরোহিত বললো, ঠিক আছে মহারাজ! আমি শুধু বিষয়টির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার জন্যে কথাটি বলেছিলাম। আপনাকে অপমান করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। এতে যদি লাহোরের মহারাজা অপমানবোধ করে থাকেন তবে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
কিন্তু লাহোরের সেনাবাহিনীকে আপনি খুব শীঘ্রই সম্মুখ সমরে নিয়ে আসবেন এবং শত্রুর মুখোমুখি সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে ঘোষণা করবেন, আপনি গযনীর বশ্যতা স্বীকার করেন না এবং গযনীর সাথে আপনার পূর্ব পুরুষের কৃত মৈত্রীচুক্তি আপনি প্রত্যাখ্যান করবেন।
প্রথমে তিন মহারাজার এই সম্মিলন ছিল একটি ঘরোয়া বৈঠকের মতো। বৈঠকী মেজাজেই কথাবার্তা হচ্ছিল। কিন্তু রাণী শকুন্তলার বিবস্ত্র হয়ে মহারাজাদের উত্তেজিত ও অপমানিত করার পর মহারাজাদের এই বৈঠক হট্টগোলের রূপ ধারণ করে। আর পুরোহিতের উস্কানির পর সবাই এক সাথে উত্তেজিত কথা বলার কারণে রীতিমতো হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। বৈঠকের শুরু থেকেই সেখানে উপস্থিত গোবিন্দ নামের এক বুদ্ধিজীবী সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললো–
