মুসলিম মিল্লাত তখন তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে হারিয়ে ফেলবে, তাদের মান মর্যাদা ধ্বংস হয়ে যাবে। শতধা বিচ্ছিন্ন মুসলিম শাসক গোষ্ঠী মুসলিম জনতাকে প্রজা ভাবতে শুরু করবে। তখনকার শাসক শ্রেণী নাগরিকদের মুখ বন্ধ করে দেবে। ইহুদী ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাধারণ মুসলমানরা কিছুই বলার সুযোগ পাবে না। কারণ তখনকার শাসক গোষ্ঠী ইহুদী ও হিন্দুদের মনোরঞ্জন করে ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করবে। সেই যুগ হবে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার যুগ। তখন আল্লাহর যমীন মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হতে থাকবে।
সুলতান মাহমূদ খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে তার শায়খের কথা শুনতেন। এ সব কথা শোনার সময় তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেতো। তাকে দেখে মনে হতো তিনি সেই সময়ের কথা ভেবে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। দুঃখ যন্ত্রণায় তার অন্তর কেঁপে উঠতো। একদিন আবুল হাসান কিরখানী বললেন, এমন একদিন আসবে, যখন তোমার এই রাজ্যে বিধর্মী শক্তি তাদের ইচ্ছামতো শাসন কাজ চালাবে। তোমার রাজ্যে মুনাফিকদের দৌরাত্ম চলবে। গযনী, কান্দাহার, গারদিজ তখন বিধর্মীদের পদপিষ্ট হবে। যাদের কোন দীন ধর্ম থাকবে না, তাদেরকেই একদল মুসলিম দীনের প্রহরী ভাবতে শুরু করবে।
সম্মানিত মুর্শিদ! কম্পিত কণ্ঠে একথা শুনে বললেন সুলতান, সে সময়ের অনাগত সেই জাতির দুর্ভাগ্য আজ আমি কি ভাবে রোধ করতে পারবো? আমাকে এজন্য কি ভূমিকা পালন করতে হবে?
আরে সুলতান! তুমি তো তখন হবে কবরের অধিবাসী। তোমার কবর তাদের কিছুই করতে পারবে না। তোমার আমার কবরের চার পাশেই ভবিষ্যতে রক্তের হুলি খেলার আয়োজন হবে। তখন আর আমাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হবে না। অতএব যা করার এখনই করতে হবে। অবশ্য তুমি তোমার কর্তব্য যথার্থই পালন করছে।
এই প্রেক্ষিতে আজ আমি তোমাকে কি কাজ করা ঠিক হবে না সে ব্যাপারটি বলতে চাচ্ছি। তুমি বার বার মোহময় মায়াবী হিন্দুস্তানে যাচ্ছো। হিন্দুস্তানে রয়েছে সোনা-দানা ও সহায়-সম্পদের চমক এবং হিন্দুস্তানের মেয়েরাও মারাত্মক চমক। এরা কোন প্রকার পর্দা করে না। শুধু মেয়ে নয়, হিন্দুস্তানের প্রাকৃতিক পরিবেশও মোহময়। তুমি, তোমার সেনাপতি ও কমান্ডাররা যদি এসব মোহ-মায়া থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে পারো, তাহলে তোমাদের পক্ষে সেই দুর্গ তৈরী করা সম্ভব হবে, যে দুর্গ প্রাচীরে মাথা ঠুকে মরবে হিন্দুরা।
সম্মানিত মুর্শিদ! অনেক সময় আমার সৈনিকরা হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করে ফেলে। অবশ্য যেসব মেয়ে বিয়ের আগেই স্বেচ্ছায় ইসলামে দীক্ষা নেয় তাদেরকেই গযনীর সেনারা বিয়ে করে। আমি কি এই ধারা চালু থাকতে দেবো, না বন্ধ করে দেবো?
শোন মাহমূদ! এই প্রেক্ষিত্রে তোমাকে একটি গল্প বলি- বললেন শায়খ কিরখানী! আমি যখন যুবক, তখন আমার আব্বার একজন বন্ধু প্রায়ই আমাদের বাড়ীতে আসতেন। আব্বার এই বন্ধুটি ছিলেন খুবই দূরদর্শী সৎ ও ব্যবসায়ী। একবার তিনি কোন স্থান থেকে একটি চিতার বাচ্চা নিয়ে এলেন। আমি সেই চিতার বাচ্চাটি দেখেছি। লোকটি চিতার বাচ্চাটিকে খুবই আদর করতেন। মনে হতো তিনি একটি বিড়ালের বাচ্চাকে আদর করছেন। আব্বার সেই বন্ধু চিতার বাচ্চাকে তার কোলে বসিয়ে দুধ পান করাতেন এবং নিজের বিছানায় শোয়াতেন।
চিতার বাচ্চাটি যখন বড় হলো, তখন আব্বার ব্যবসায়ী বন্ধু সেটিকে পাখি ও হরিণের গোশত খাওয়াতেন। ব্যবসায়ী যে দিকে যেতেন, চিতার বাচ্চাও সেদিকেই যেতো। মুনীবের সাথে চিতার বাচ্চার খুবই ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল।
একদিন সেই ব্যবসায়ী আমার আব্বার সাথে দেখা করতে এলেন। তার একটি হাত কুনুই থেকে বাজু পর্যন্ত কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, হাতের গোশত চিতার বাচ্চা ছিঁড়ে খেয়েছে। একথা শুনে আমার আব্বা বললেন, আরে চিতার বাচ্চা না তোমাকে খুবই আপন ভাবতো, তুমি তাকে আদর করতে ব্যবসায়ী বললো, আদর করেই সে কামড় দিয়েছে। আদর করে কামড়ে দিলেও দাঁত আমার হাতে বিধিয়ে ফেলে। ফলে খুব কষ্টে তার দাঁত ছাড়াতে হয়েছে। এতে তার শরীরের অর্ধেক রক্ত ঝরে গেছে।
লোকটি চলে যাওয়ার পর আব্বা আমার উদ্দেশে বললেন, কিছু বুঝলে হাসান?
হিংস্রদের আদরেও হিংস্রতা থাকে। চিতার বাচ্চা তার স্বভাবের কারণে মানুষের বন্ধু হতে অক্ষম, স্বভাবগত কারণে সে মানুষকে শত্রু ভাবতে বাধ্য। মাহমূদ! হিন্দু আর ইহুদীরা হলো সেই চিতার বাচ্চার মতোই হিংস্র। এদের ভালোবাসার মধ্যেও হিংস্রতা রয়েছে। স্বভাবগতভাবেই এরা মুসলমানদেরকে শত্রু ভাবতে বাধ্য। এ থেকে তুমিই সিদ্ধান্ত নাও, মুসলমানরা হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করবে কি না। পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন এই দুই জাতির নারী পুরুষ একে অন্যের শরীরের মধ্যে কোনরূপ বিরূপতা বা শত্রুতা অনুভব করবে না ঠিক, যতটুকু স্বাদ অনুভব করার কথা ততটুকুই করবে বৈ কি? কিন্তু তাতে রক্তের শত্রুতা ও বৈরীতার বিলুপ্তি ঘটবে না। এবং ব্যাপকভাবে আত্মিক মিলনও কখনো ঘটবে না। দৈহিক সম্পর্ক আদর্শিক বিরোধ নিঃশেষ করে না। সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জিনিস। যা কেবল সঠিক সময়েই বুঝা যাবে।
সুলতান মাহমূদ হিন্দু মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে কোন প্রকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেননি বটে, কিন্তু তিনি সেনাবাহিনীর ইমামদের বলেছিলেন, তারা যেন হিন্দু মেয়েদের ব্যাপারে সেনাদের সতর্ক রাখে। এই সতর্কতা অবলম্বনের পরও পরিস্থিতির কবলে পড়ে অনেক সৈনিকই হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছিল। এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখী হয়ে কমান্ডার যুলকারনাইনও রত্মা নামের মেয়েটিকে বিয়ে করেছিল। যে রত্মা স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে রাজিয়া নাম ধারণ করেছিল এবং যুলকারনাইনকে তার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছিল।
