সুলতান মাহমূদ কয়েকটি কঠিন অভিযান পরিচালনার পর অনুভব করতে পেরেছিলেন, হিন্দুজাতি মুশরিক ও বহু দেবদেবীর পূজারী হলেও এরা ভীতু নয়, লড়াকু। সুলতান প্রত্যক্ষ করে ছিলেন হিন্দুরা অকাতরে তাদের জাতি ও ধর্মকে টিকিয়ে রাখার জন্যে জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। তাদের প্রধান দুর্বলতা সেনাপতিদের অদূরদর্শিতা। তারা কৌশলের চেয়ে জনবল এবং আবেগের উপর বেশী নির্ভর করে। রণাঙ্গনে মাথার চেয়ে শক্তিকে বেশী ব্যবহার করে। নির্ভিক চিত্তে হামলে পড়া এবং প্রয়োজনে মৃত্যুবরণ করাকেই তারা মনে করে লড়াই।
পক্ষান্তরে সুলতান মাহমূদ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সব সময়ই শক্তির চেয়ে কৌশলকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। তিনি দারুণ কার্যকর কৌশলে শক্তির ব্যবহার করতেন। ফলে তিনগুণ চারগুণ প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করেও তিনি অনায়াসে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারতেন। ইতিহাসবিদগণ এ কারণেই পৃথিবীর ক্ষণজন্মা সমরবিদদের অন্যতম স্থানটি সুলতান মাহমুদের জন্যে ছেড়ে দিয়েছেন। সুলতান মাহমূদ তাই বিশ্ব ইতিহাসে একজন দূরদর্শী সমরনায়ক হিসেবে বিবেচিত।
সুলতান মাহমুদের যুদ্ধ কৌশল সব সময় প্রতিপক্ষকে ফাঁদে আটকে ফেলতো। তখন শত্রুপক্ষের সামনে দুটি পথই খোলা থাকতো। লড়াই করে জীবন দিতে হতো, নয়তো হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পনের পথ বেছে নিতে হতো।
ধর্মীয় ভাবাবেগের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুরা কম ধর্ম অনুরাগী ছিলো না। বলা চলে হিন্দুদের মধ্যে ধর্মের আবেগ ছিল মুসলমানদের চেয়ে বেশী। মুসলমানরা অদৃশ্য আল্লাহর ফরমান বিশ্বাস করে লড়াই করতো। আর হিন্দুরা তাদের দৃশ্যমান দেবদেবীদের সম্মান রক্ষার জন্যে জীবন উৎসর্গ করতো।
হিন্দু ধর্ম যে ভ্রান্ত এমন ধারণা তারা কখনোই মনে স্থান দিতো না। তারা বংশপরস্পরায় মূর্তিপূজাকেই একমাত্র সঠিক ধর্ম বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো। সেই সাথে শৈশব থেকে মনের মধ্যে গেঁথে নিতো রূপকথার মতো দেবদেবীদের নানা কাহিনী। বাস্তবতা ও যুক্তির বিচারে এগুলো প্রত্যাখ্যানযোগ্য হলেও হিন্দু মণী ঋষি ও পুরোহিতেরা যুগ যুগ ধরে সাধারণ হিন্দুদেরকে এসব উপখ্যানই ধর্মের আবরণে পেশ করে আসছিল। পরম শ্রদ্ধায় হিন্দুরা পুরোহিতদের সৃষ্ট এসব কাহিনীকেই ধর্ম পালনের অংশ ভেবে আসছিল।
হিন্দুরা কখনেই বুঝতে চাইতো না, তারা সত্য ধর্মের বিপরীতে মিথ্যার পক্ষ হয়ে লড়ছে। তাদেরকে কেউ বলতো না, সত্য মিথ্যার লড়াইয়ে সত্যের পক্ষেই থাকে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ।
সুলতান মাহমূদের অস্বাভাবিক সামরিক দূরদর্শিতা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর দেয়া বিশেষ এক দান ছিল। আল্লাহ তাআলা সুলতান মাহমূদকে এমন সামরিক দূরদর্শিতা, সাহস ও দৃঢ়তা দিয়েছিলেন যার সামনে কঠিন পাহাড় ধসে যেতো। সুলতান মাহমূদ বলতেন, সাপ শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই মারা পড়ে কিন্তু মানুষকে সতর্ক থাকতে হয়, তার অসতর্কতায় সাপ না আবার তাকে দংশন করে বসে। তিনি হিন্দুদেরকে সাপ বিচ্ছুর সাথে তুলনা করতেন। কারণ, বিচ্ছুর মতোই হিন্দুরা সব সময় কিভাবে মুসলমানদের দংশন করবে এ চিন্তায় বিভোর থাকতো।
আমি হিন্দুদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না- সামরিক উপদেষ্টাদের, বলছিলেন সুলতান মাহমূদ। কারণ হিন্দুদের সমূলে উপড়ে ফেলা আমার পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি। আমি হিন্দুদের আত্মসমর্পণের উপর নির্ভর করতে পারি না। সাপ-যদি গর্তেও চলে যায় কিংবা সাপকে যদি বাক্সেও ভরে ফেলা হয় তবে তার স্বভাব বদলে যায় না, তার বিষ নিঃশেষ হয়ে যায় না। সুযোগ পেলেই সে ছোবল মারতে পারে।
তিনি প্রায়ই বলতেন, আমাকে আল্লাহ হয়তো এতো বেশী বয়স দেবেন না, যাতে আমি মুহাম্মদ বিন কাসিমের আযাদকৃত যমীনকে পুনর্বার ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসবো। এটাও জানা নেই, আমার পরবর্তী গযনী শাসকরা এ দিকে মনোযোগ দেবে কি না। পরবর্তী শাসকরা যদি হিন্দুদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে তা হবে মুসলমানদের সাথে দুশমনী। যতো দিন পৃথিবীতে হিন্দু থাকবে তারা ইসলামকে ছোবল মারবেই এবং হিন্দুস্তানের যমীন মুসলমানদের রক্তে রি ত হতেই থাকবে। হিন্দুস্তানের মজলুম মুসলমানদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসবে না। যাদের এগিয়ে আসার কথা তাদেরকে হিন্দু শাসকরা মৈত্রী ও বন্ধুত্বের জালে আটকে রাখবে।
সুলতান মাহমূদ বলতেন, হিন্দু শাসকরা বহুগামী, স্ত্রীর মতো, যে প্রকাশ্যে স্বামীর পা ধুইয়ে দেয় এবং দৃশ্যত সে স্বামীর অর্ধাহীনী হিসেবে নিজেকে জাহের করে, কিন্তু স্বামীর আড়াল হলেই সে আরো কয়েক জনের সাথে প্রেম করে। প্রকৃত পক্ষে সে স্বামী বেচারার জন্যে প্রেমের ফাঁদ এবং জীবন্ত প্রতারণা হয়ে সবসময় স্বামীর সাথে প্রতারণা করে। এমন স্ত্রী যে কোন সময় তার প্রেমিকদের মনোরঞ্জনের জন্য স্বামীকে হত্যা করতে দ্বিধা করে না।
সুলতাম মাহমূদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও মুর্শিদ শায়খ আবুল হাসান কিরখানী তাকে বলেছিলেন, মানবেতিহাসে দু’টি জাতি একই মাটি থেকে একই সচে বানানো হয়েছে। এই দু’টি জাতি হলো ইহুদী ও হিন্দু। মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ এদের স্বভাবজাত এবং এদের ধর্মের অংশ। যে যুগে মুসলমানরা এই দুই জাতি সম্পর্কে অসতর্ক হবে কিংবা এই দুই জাতিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সেই যুগ হবে মুসলমানদের পতনের যুগ।
