এভাবে কেটে গেল তিন চার দিন। এ কয় দিনের মধ্যে তরুণী আর যুলকারনাইনের তাঁবু থেকে বের হলো না। কিন্তু নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কেও সে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না। এ দিকে যুলকারনাইনকে মথুরা ত্যাগ করে আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। যুলকারনাইন যখন তরুণীকে একথা জানাল তখন তরুণী কোন কিছু চিন্তা না করেই বললো- তুমি যেখানে যাও, আমাকেও সেখানে নিয়ে চলো।
বিগত তিন চার দিনে তরুণী অনুভব করলো এবং প্রত্যক্ষ করলো, সুন্দর সুঠামদেহের অধিকারী আকর্ষণীয় এই যুবক বাস্তবে একটা পাথর হৃদয়ের মানুষ নয়তো ফেরেশতা। এ তিন চার দিনে একটি বারও তার দিকে হাত বাড়াবে দূরে থাক একটু স্পর্শও করেনি। তাই রওয়ানা হওয়ার আগে সে যুলকারনাইনকে বললো, আমার ব্যাপারে যা করতে হয় তুমি সেই ব্যবস্থা করো, আমি কিছুতেই তোমাকে ছেড়ে যাবো না। প্রয়োজনে আমি ধর্ম ত্যাগ করতেও রাজি।
তরুণীর কণ্ঠে ধর্মত্যাগের আগ্রহ শুনে যুলকারনাইনের মনে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সে দিনই এক ফাঁকে তরুণীকে সেনাবাহিনীর ইমামের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। ইমাম তাকে কলেমা পড়িয়ে ইসলামে দীক্ষা দিলেন এবং তার নতুন নাম দিলেন রাজিয়া।
তরুণীর নাম ছিল রত্মা। এবার সে রত্না থেকে রাজিয়া। রত্মার ইসলাম গ্রহণের ফলে সেনাপতি নিজেই উদ্যোগী হয়ে যুলকারনাইনের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন। সেনাবাহিনীর সাথে থাকা আরো কয়েকজনের স্ত্রীরা এসে নতুন বধুকে বরণ করে নিল। রাজিয়াকে তাদের কাছে অর্পণ করে যুলকারনাইন তার কর্তব্য পালনে সেনাদলের সাথে অভিযানে চলে গেল।
অভিযান থেকে ফিরে এলে যুলকারনাইনকে রাজিয়া সম্পর্কে জানানো হলো, নওমুসলিম রাজিয়া তাকে ফেরেশতার মতোই পবিত্র মানুষ বলে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু ইসলামের হুকুম আহকাম বিশেষ করে নামায পড়তে গিয়ে এই তরুণী কেমন জানি হাঁপিয়ে ওঠে এবং তার কাছে নামায কঠিন মনে হয়। অথবা এমনও হতে পারে এই তরুণী অন্তর দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেনি। তার মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। নিজের জীবন বাঁচানোর তাকিদেই হয়তো সে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
মথুরা জয়ের পর এক বছর চলে গেছে। যুলকারনাইন এখন রাড়ীতে মহারাজা রাজ্যপালের উপদেষ্টা হিসেবে অবস্থান করছে। রাজ্যপাল বাহ্যত নামে রাজা থাকলেও তার সেই দাপট ও কর্তৃত্ব ছিল না। সে এখন আর একজন লড়াকু রাজা নয়, প্রকৃতই একজন পুতুল রাজা মাত্র। অঢেল বিত্তবৈভবের কারণে সে রাজার হাতেই চলতো বটে। কিন্তু আগের জাঁকজমক আর ছিল না।
অবশ্য নর্তকীর নাচ বাদকদের বাজনা ছাড়া মহারাজার দিন কাটতো না। ফলে রাজ্য হারা রাজা হলেও এসব আয়োজনের কোন ঘাটতি ছিল না রাজ্যপালের। রাড়ীতে রাজ্যপাল অল্প দিনের মধ্যেই একটি রাজ প্রাসাদ গড়ে তুলেন এবং রাজমহলের এসব গান বাজনায় গযনীর কমান্ডার ও উপদেষ্টাদেরও দাওয়াত দেন। কিন্তু গযনী সরকারের কোন কর্মকর্তা রাজার গান বাজনাও নৃত্যগীতে অংশগ্রহণ করেন না।
রাড়ীতে পূর্ব থেকেই একটি মন্দির ছিল। সেটিতে আগে জৌলুস না থাকলেও রাজধানী ঘোষণার পর মন্দিরটি জৌলুসপূর্ণ হয়ে ওঠে। দলে দলে পূজারীরা মন্দিরে পূজা দিতে ভীড় করে। হিন্দুস্তানের বিভিন্ন জায়গা থেকে মন্দিরে এসে আস্তানা গেড়ে বসে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞ পুরোহিত।
সুলতান মাহমূদের নির্দেশে তার কর্মকর্তারা রাজ্যপাল ও হিন্দুদের পূজা অর্চনায় কোন প্রকার বিধি নিষেধ আরোপ করেনি। সুলতান নির্দেশ দিয়ে ছিলেন, হিন্দুদের কাছে যেন ইসলামের দাওয়াত পেশ করা হয় এবং তাদের সামনে ইসলামের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হয়।
গযনীর নিয়োজিত কর্মকর্তা ও সেনারা দাওয়াতী কাজ যথারীতি চালু করেছিল। ফলে দু’চারজন করে হিন্দু প্রতিদিনই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিল।
এ দিকে যুলকারনাইন তার স্ত্রী রাজিয়াকে বলেছিল, সে যেনো হিন্দু মহিলাদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম প্রচার করে। সে যেনো হিন্দু মহিলাদের বলে ইসলাম কতটা সুন্দর। ইসলামের রীতি নীতি কতো মানবিক এবং মুসলমানদের আচার আচরণ ও চরিত্র কতত পবিত্র। সে যেনো হিন্দু মহিলাদের জানায়, ইসলামের অনুশাসন এমনই সুন্দর যে, তা মানুষকে পবিত্র করে তোলে।
রাজিয়া ইসলামের উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীর গুণগ্রাহী ছিল। সে মুসলমান পুরুষদের উন্নত নৈতিকতা নিজের জীবনে অনুভব করেছিল। ফলে হিন্দু কোন মহিলা এলে সে তার জীবনের কাহিনীই বর্ণনা করতো।
এদিকে গফনীতে সুলতান মাহমূদ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। তিনি তার প্রতিবেশী গযনী বিরোধী মুসলমান শক্তিগুলোকে রণাঙ্গনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন। অবশ্য শত ব্যস্ততার মধ্যেও তার একটি কান সব সময় হিন্দুদের দিকে উৎকর্ণ হয়ে থাকতো। কারণ হিন্দুস্তানের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে তিনি মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুসলিম যোদ্ধাকে রেখে এসেছিলেন। যাদের চতুর্দিকে অবস্থান করছিল বিপুল শক্তির অধিকারী হিন্দু রাজা মহারাজারা। যারা এক ফুঙ্কারে গযনীর এই সৈন্যদেরকে উড়িয়ে দেয়ার জন্য রাত দিন চেষ্টা-সাধনা করছিল। মেতে উঠে ছিল গযনী বিরোধী নানা আয়োজনে। মথুরা ছিল হিন্দুদের হৃৎপিণ্ডের মতো। এই হৃৎপিণ্ডে ইসলামের খঞ্জর বিদ্ধ হয়েছিল। ফলে বুকের মধ্যে বিদ্ধ খঞ্জর নিয়ে হিন্দু রাজা মহারাজাদের নীরব নির্বিকার বসে থাকার উপায় ছিল না।
