অবশ্য সে দিন এই অসহায় হিন্দু তরুণী যুলকারনাইনের কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে কোন ক্রটি সৃষ্টি করতে পারেনি। তার কর্তব্য কর্মে কোন বাধা হয়নি, তবে তার জীবনের বাঁধনে আটকা পড়ে এই তরুণী! হয়ে পড়ে জীবন সঙ্গিনী।
সেই রাতের বাকী সময়টা তরুণী যুলকারনাইনের তাঁবুতেই কাটায়। যেহেতু যুলকারনাইন ছিল কমান্ডার। এজন্য তার জন্য ছিল স্বতন্ত্র তাঁবু। সেই তাঁবুতে পড়ে মেয়েটি কাঁদতে থাকল এবং তাকে মেরে ফেলার জন্যে অনুরোধ করতে লাগল। যুলকারনাইন তাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তরুণী কিছুতেই আশ্বস্তবোধ করছিল না। এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে মেয়েটির চোখ বন্ধ হয়ে এলো। ঘুমিয়ে পড়ল সে। ঘুম থেকে জেগে সে যখন যুলকারনাইনের মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখতে পেল না তখন নিজের মধ্যেও কোন অস্বাভাবিকতা অনুভব করল না। তার মনে হলো মা বাবার সান্নিধ্যে যেভাবে ঘুমাতো সেভাবেই ঘুমিয়েছে সে।
এমন অবস্থা দেখে তরুণী যুলকারনাইনকে জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার? আমাকে কি তোমার মনে ধরেনি?
তোমাকে যদি ভালো না লাগতো, তাহলে আমার সাথে না রেখে তোমাকে অন্য কোন স্থানে রেখে আসতাম। বললো যুলকারনাইন। তুমি বলছিলে না, তুমি কুমারী। আমি বলছিলাম- হ্যাঁ, তুমি খুবই সুন্দরী। আমি তোমাকে একজন পবিত্র মেয়েই মনে করেছি এবং পবিত্র রাখারই মনস্থির করেছি। এখন মন থেকে সব ভয় ঝেড়ে ফেলে বলো- কোথায় যেতে চাও?
তরুণী কোন কথা না বলে দীর্ঘ সময় যুলকারনাইনের দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় তার দু’পা জড়িয়ে ধরে পায়ে মাথা ঠেকালো। যুলকারনাইন দ্রুত তার পা সরিয়ে নিয়ে বললো- আমাদের ধর্মে কোন মানুষকে অপর মানুষের সেজদা করার অনুমতি নেই। তুমি আমার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে আমাকে গোনাহগার বানিও না। বলো, কোথায় যেতে চাও তুমি?
তরুণী একটি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো, মেয়ে হয়ে জন্মালে মা বাবার ঘর ছেড়ে একদিন না একদিন কারো না কারো ঘরে যেতেই হয়। আমার মা বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন তুমিই বলো, আমি কি করবো? কোথায় যাবো?
আমার সাথে থাকতে চাইলে তোমাকে তোমার ধর্মত্যাগ করতে হবে, বললো যুলকারনাইন। কিন্তু তোমর ধর্ম-ত্যাগ করলে অল্প দিনের মধ্যেই তুমি অনুভব করতে পারবে, ধর্মত্যাগ করে তুমি ভালই করেছে।
যুলকারনাইনের মুখে ধর্মত্যাগের কথা শুনে তরুণী চিন্তায় পড়ে গেল। যুলকারনাইন তরুণীকে বুঝতে দিতে চাচ্ছিল না, সে তরুণীর প্রেমে পড়ে গেছে। তরুণী ছিল খুব সুন্দরী, চলন বলনে মার্জিত। তরুণীর মুখের ভাষা ও কণ্ঠস্বর যে কারো হৃদয় রাজ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করার মতো আকর্ষণীয়। যুলকারনাইন অনুভব করছিল, এই তরুণীকে তার বিয়ে করে ফেলা উচিত। নয়তো এই মেয়ে তার কর্তব্য কাজে বাধা হয়ে উঠতে পারে। এমনিতেও যুলকারনাইনের মনে প্রচণ্ড একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সে কিছুতেই এই তরুণীকে হারাতে চাচ্ছিল না কিন্তু হিন্দু একটি মেয়েকে সাথে রাখা এবং তাকে বিয়ে করাও সম্ভব ছিল না।
আমি তোমর উপর কোন শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছি না। তোমাকে অসহায় পেয়ে আমি তোমার মনের বিপরীতে কোন কিছু করতে বাধ্য করছি না। যদি চলে যেতে চাও, তবে বলো, কোথায় যেতে চাও?
আমাকে হরিকৃষ্ণের পায়ে বসিয়ে দাও, বাকী জীবন মন্দিরে দেবীর পূজা করে কাটিয়ে দেবো।
তরুণীর মুখে একথা শুনে যুলকারনাইনের রক্তে আগুন ধরে গেল। সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- নিজেকে কেন ধোঁকা দিচ্ছে। এসব মন্দিরে কি হয় তা সবাই জানে। এসব রহস্য আর গোপন নেই যে, দেব-দেবীর নামে জীবন উৎসর্গকারিণী কুমারীদেরকে সব সময় মন্দিরের পুরোহিতরা রক্ষিতার মতো ব্যবহার করে। এই মন্দিরে গিয়ে তোমাকেও তো পুরোহিতদের রক্ষিতা হয়েই কাটাতে হবে। তোমাদের পাথরের গড়া দেবদেবী আসলে একটা ধোকা। কেন নিজে এই নোংরা জীবন বেছে নিতে চাচ্ছো। তোমার বয়স কম, জীবন জগত সম্পর্কে তোমার ধারণাও কম। এজন্যই তোমার প্রতি আমি এতটা দরদ দেখাচ্ছি। নয়তো তুমি তো আমার কাছে একজন বিধর্মী মেয়ে ছাড়া কিছুই নও। তোমার মতো একজন তরুণীই তো আর গোটা হিন্দুস্তান নয়। আমি এতো দূর থেকে শুধু তোমার মতো একটি তরুণীকে পাওয়ার জন্যে আসিনি। আমি এসেছি তোমাদের এই পূজনীয় মূর্তি ধ্বংস করতে। তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখো, তোমাদের দেবদেবীদেরকে আমরা টুকরো টুকরো করে ফেলে রেখেছি। মানুষ এগুলোকে পায়ে পিষে আসা যাওয়া করছে।
যুলকারনাইনের কথা শুনে তরুণী গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। কারণ সে ধর্মীয় আবেগ তাড়িত হয়েই তো মা বাবার সাথে ভারতের এক কোণ থেকে মথুরায় পূজা দিতে এসেছিল। তখন তার মনে হিন্দুত্ববাদের আবেগ ছিল প্রবল। তাই ধর্ম ত্যাগের কথা শুনে সে চিন্তায় পড়ে গেলো ।
যুলকারনাইন বললো, তুমি যেখানে যেতে চাও, সেখানেই তোমাকে পৌঁছে দেয়া হবে। কিন্তু কোন মন্দিরে তোমাকে থাকতে দেয়া হবে না।
ঝড়ের তাণ্ডব, যুদ্ধের বিভীষিকা, মা বাবা ভাইয়ের মৃত্যু আর অগণিত মৃতের লাশ দেখে তরুণী এতোটাই আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, যুলকারনাইনের তাঁবু থেকে বাইরে যাওয়ার সাহস সে পাচ্ছিল না। তা ছাড়া বিগত একরাতের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কারণে যুলকারনাইনের প্রতি যে আস্থা জন্মেছে সেই আস্থা ও আশ্রয় সে হারাতে চাচ্ছিল না। মনের অজান্তেই তরুণীর কাছে যুলকারনাইনই হয়ে পড়ে ছিল আস্থা ভরসা ও নির্ভরতার মূর্তপ্রতীক।
