ঘটনাক্রমে এই যুলকারনাইন এক হিন্দু তরুণীকে বিয়ে করেছিল। এই তরুণীর নাম ছিল রত্মা। অবশ্য যুলকারনাইনের সাথে বিয়ের আগেই রত্না তার নাম বদল করে রাজিয়া রেখেছিল। এই রত্মাকে যুলকারনাইন পেয়েছিল মথুরায়। এক ভয়ানক পরিস্থিতিতে রত্মা যুলকারনাইনের সান্নিধ্যে আসে।
সুলতান মাহমূদ যখন মথুরা আক্রমণ করেছিলেন তখন ছিল পূজার মৌসুম। পূজা দেয়ার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার হিন্দু ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে মথুরায় এসে জমায়েত হয়েছিল। পুরো মথুরা শহর আগতদের তাঁবুতে ভরে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এক রাতের তুফান ও ঘূর্ণিঝড় গোটা শহর লন্ডভণ্ড করে ফেলে। তাঁবু উড়িয়ে নেয়। শত শত মানুষ গাছ কিংবা বিধ্বস্ত ঘর বাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। প্রচণ্ড ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় মথুরা নগরী।
ঠিক সেই ঝড়ের দু’দিন পর গযনীবাহিনী মথুরা আক্রমণ করেছিল। হিন্দু বাহিনীর সাথে শহরের বাইরে গয়নী বাহিনীর প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। মথুরার আকাশে তখন শকুনের উড়াউড়ি আর বাতাসে মৃত লাশের গন্ধ। সর্বত্র ভগ্নস্তূপ। মথুরার সৈন্যরা গযনী বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে না পেরে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
এক রাতে পাহারার জন্যে যুলকারনাইন দুই সঙ্গীকে নিয়ে শহরের বাইরে টহল দিচ্ছিল। ভয়াবহ পরিস্থিতি সবখানে। যত্রতত্র গাছপালা ভেঙ্গে পড়ে রয়েছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মৃত মানুষের দেহ। হাজার হাজার তাঁবুর জঞ্জাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সর্বত্র। শহরের ভেতরে ও বাইরে বহু লোক দুই বাহিনীর সংঘর্ষের সময় পদপিষ্ট হয়ে মারা পড়ে।
ঘোর সন্ধ্যার অন্ধকারে টহলরত অবস্থায় হঠাৎ যুলকারনাইনের কানে ভেসে এলো কারো পালানোর শব্দ। যুলকারনাইন ভেসে আসা শব্দের দিকে ঘোড়া হাকাল। ঘোড়ার খুঁড়ে শব্দ শুনে পলায়নপর লোকটি থেমে গেল এবং চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করল। যুলকারনাইন ঘোড়া থেকে নেমে দেখল, ভেঙ্গে পড়া
একটি গাছের আড়ালে একটি তরুণী মেয়ে নিজেকে লুকাতে চেষ্টা করছে। যুলকারনাইন হাত বাড়িয়ে যেই মেয়েটিকে ধরতে গেল, মেয়েটি গলা চড়িয়ে কান্না শুরু করল। দেখেই বুঝা যাচ্ছিল মেয়েটি ভয় ও আতংকে কাঁদছে।
যুলকারনাইন মেয়েটির আরো কাছে গিয়ে তাকে যখন টেনে দাঁড় করাল, তখন বুঝতে পারল, মেয়েটি যুবতী, সম্ভবত কুমারী।
আমাকে মেরে ফেলো- আতংকগ্রস্ত কণ্ঠে বললো মেয়েটি। আমার গায়ে হাত দিয়ো না, আমাকে মেরে ফেলো। আমাকে তুমি তুলে নিয়ো না- নিবেদনের সুরে বললো মেয়েটি।
এখানে আমরা কোন মেয়েকে হত্যা করতে আসিনি- বললো যুলকারনাইন। আমরা নারী ও মেয়েদের মর্যাদা দিতে এসেছি। তাদের জীবন বাঁচাতে এসেছি। আমরা অসহায় জীবন ও ইজ্জতের হেফাযত করতে এসেছি। বলো মেয়ে? তুমি কোথায় যেতে চাও, আমরা তোমাকে সেখানেই পৌঁছে দেবো।
আমি কোথাও যেতে চাই না, আমি মরতে চাই। আমাকে হত্যা করে আমার মা বাবার কাছে পৌঁছে দাও- কান্না জড়িত কণ্ঠে বললো তরুণী।
তোমার মা বাবা কি মারা গেছে?
হ্যাঁ, তারা উভয়েই মারা গেছে। আমি যে স্থান থেকে দৌড়ে পালিয়ে এসেছি, সেখানে তাদের মরদেহ পড়ে আছে। আমার একটি যুবক ভাই ছিল সেও মারা গেছে।
এই মেয়েটি বহু দূর থেকে তার মা বাবা ও ভাইয়ের সাথে মথুরা এসেছিল পূজা দিতে। ঝড়ের দিন তাদের তাঁবু বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়, তার যুবক ভাইটি গাছ চাপা পড়ে মারা যায়। আর দু’দিন পর যুদ্ধ শুরু হলে তার বাবা ও মা ভীত সন্ত্রস্ত ছুটন্ত মানুষের ভিড়ে ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। যুদ্ধ শুরু হলে মেয়েটিকে তার মা বাবা এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিল। ফলে সে বেঁচে যায়।
গয়নী সৈন্যদের এদিকে আসতে দেখে সে আতংকে কেঁপে উঠে, চরম আতঙ্কে দৌড়ে পালাতে গিয়ে পড়ে যায়। তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে সে ভাঙ্গা গাছের আড়ালে বসে পড়ে। যুলকারনাইন এসে তাকে ধরে দাঁড় করায়। এই অবস্থায় মেয়েটিকে রেখে যাওয়া সমীচীন মনে করেনি যুলকারনাইন। সে মেয়েটিকে আশ্বস্ত করতে চায়। কিন্তু মেয়েটি তার পায়ে পড়ে মিনতি করতে থাকে–
আমি কুমারী। পরপুরুষের হাতে নিগৃহীত হওয়ার চেয়ে আমার মরে যাওয়া ভালো। দয়া করে তুমি আমাকে মেরে ফেলো।
যুলকারনাইন কিছুতেই তরুণীকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারছিল না, বাধ্য হয়েই যুলকারনাইন তাকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। তাও অসম্ভব হওয়ায় এক পর্যায়ে সে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল । যুলকারনাইন তাকে বার বার অভয় দিতে দিতে বলছিল
এই অবস্থায় তোমাকে ফেলে যাওয়াটা হবে আমাদের জন্যে অন্যায়। বিশ্বাস করো, আমাদের হাতে তোমার কোন ধরনের নির্যাতিত হওয়ার আশংকা নেই। নারীর মর্যাদা রক্ষাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই। তোমার গায়ে কেউ হাত দেবে না। তোমার আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। তুমি নির্ভয়ে আমার সাথে এসো।
মেয়েটিকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যুলকারনাইন তার উর্ধতন সেনা কমান্ডারের কাছে এলো। সময়টা ছিল খুবই জটিল। এ সময় কোন অসহায় মেয়েকে সেবা দেয়ার অবকাশ ছিল না। কমান্ডার যুলকারনাইনকে বললেন, একে তোমার কাছে রাখতে চাইলে রাখতে পারো, নয়তো কোন হিন্দুর কাছে রেখে আসতে পারো। তবে সতর্ক থাকবে এ যেনো তোমার কর্তব্য পালনে কোন ধরনের ত্রুটির কারণ না হয়।
