অবশেষে তিনি একটি উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন এবং হজ্জ কাফেলার শেষ ব্যক্তিটি তাকে অতিক্রম করে যাওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে থাকলেন।
এক পর্যায়ে তার কণ্ঠ থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তিনি বললেন এই কাফেলায় যারা হজ্জ করতে যাচ্ছেন তারা কতইনা সৌভাগ্যবান! আল্লাহ তাদের সবাইকে হেফাযত করুন।
নিরাপত্তা আয়োজনের প্রাণপুরুষ ইরতেগীন প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়ে কাফেলার সাথেই রওয়ানা হলো।
* * *
কিয়াদ মরুভূমির একটি জায়গায় অসংখ্য উঁচু-নীচু টিলা ছিল। যেগুলোর আকৃতি ছিল উঁচু দেয়ালের মতো। আবার কোনটার আকৃতি ছিল খাড়া পিলারের মতো। এগুলোর মধ্য দিয়েই লোকজন যাতায়াতের জন্যে পথ তৈরি করে নিয়েছিল। জায়গাটি ছিল খুবই ভয়ংকর। পাহাড় টিলার মারপ্যাঁচে বহু লোক সঠিক পথ হারিয়ে ফেলতো।
ডাকাতির জন্যে এই জায়গাটিকেই বেছে নিয়েছিল হাম্মাদের দল। হাম্মাদের ডাকাতদল এই ভয়ঙ্কর জায়গাটির অনতিদূরে তাঁবু ফেলে অবস্থান নিয়েছিল। অন্তত পাঁচহাজার বেদুঈন জড়ো হয়েছিল ডাকাত দলে। এসব বেদুঈন যেমন ছিল দুঃসাহসী তেমনই লড়াকু এবং যুদ্ধ ও অশ্বারোহণে পটু। এদের কোন ধর্মকর্ম ছিল না। গোত্রপতিদের নির্দেশ মানাকেই এরা ইবাদত মনে করতো। বেদুঈন গোত্রপতিদের প্রধান সর্দার হাম্মাদকে এরা আল্লাহর বিশেষ প্রতিনিধি বলে বিশ্বাস করতো। এরা বিশ্বাস করতো হাম্মাদের মতো সর্দারের উপর কোন তীর তরবারী কাজ করে না। ডাকাতী ও লুটতরাজকে এরা বৈধ পেশা হিসেবেই বিশ্বাস করতো। তাদের দৃষ্টিতে এটি কোন দুষ্কর্ম ছিল না।
হাম্মাদ বিন-আলীর সাথে এই ডাকাতের তাঁবুতেই অবস্থান করছিল সাবিলা। ভেতরে ভেতরে খুবই বিধ্বস্ত ছিল সে। অধীর আগ্রহে সাবিলা অপেক্ষা করছিল হজ্জ কাফেলার জন্যে। এক দিন রাতের বেলায় এক বেদুঈন এসে যখন খবর দিলো–”হজ্জ কাফেলা খুবই বড় এবং কাফেলার সাথে সেনাবাহিনীও আসছে’–শুনে আবেগ উত্তেজনায় সাবিলার সারা শরীর কাঁপছিল। এক বেদুঈন এসে হাম্মাদকে জানালো, হজ্জ কাফেলা কয়েক মাইল দূরে তাঁবু ফেলেছে।
এই ভয়ংকর কিয়াদ মরু অঞ্চলকে নিজের শাসনাধীন অঞ্চল মনে করতো হাম্মাদ বিন-আলী। যেনো এই মরুভূমির বাতাসও তার কথা শুনে। এজন্য সে এই বিশাল কাফেলা ডাকাতির ক্ষেত্রে বাড়তি কোন সতর্কতা এবং প্রস্তুতি নেয়নি। সে ভাবছিল যতো বড় কাফেলাই হোক না কেন লুটেরাদের তীব্র আঘাত ও হামলা সামলানোর ক্ষমতা ওদের আদৌ নেই।
কিয়াদ মরুভূমির এই ভয়ংকর জায়গাটিতে পৌঁছার আগেই ইরতেগীনের পরামর্শে প্রধান বিচারপতি কাফেলার গতিরোধ করলেন এবং রাতেই সেনা কমান্ডাদের নিয়ে ডাকাতদের প্রতিরোধের কৌশল নির্ধারনে সলাপরামর্শ করলেন। তারা ঠিক করলেন প্রতিটি টিলার ওপর তীরন্দাজ থাকবে। রাতের বেলায় তিনি ডাকাত দলের সংখ্যা ও সার্বিক পরিস্থিতি জানার জন্যে একটি অনুসন্ধানী দলও পাঠালেন। কিন্তু তিনি আক্রমনাত্মক ভূমিকার বদলে আত্মরক্ষার কৌশলকে প্রাধান্য দিলেন। এজন্য তিনি দিনের বেলায় একটি প্রতিনিধি দলকে হাম্মাদের কাছে মৈত্রী ও সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে পাঠালেন। আর রাতের বেলায় গোটা কাফেলাকে সতর্কাবস্থায় রাখলেন এবং কড়া পাহারার ব্যবস্থাও করলেন।
সকাল বেলায় প্রধান বিচারপতি ও কাফেলার নেতাদের পক্ষ থেকে ডাকাত সর্দার হাম্মাদ বিন আলীর কাছে দু’জন অশ্বারোহী দূতকে পাঠানো হলো। তারা গিয়ে হাম্মাদকে প্রস্তাব দিলো, কাফেলাকে যদি নিরাপদে মক্কা যেতে এবং গযনী ফিরতে দেয়া হয় তাহলে তোমাকে পাঁচ হাজার দিরহাম উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হবে।
প্রস্তাব শুনে হাম্মাদ ভয়ানক ক্ষেপে গেল এবং এ প্রস্তাবকে সে খুবই অপমানজনক মনে করে বললো–
পাঁচ হাজার দিরহাম? পাঁচ হাজার দিরহাম দিয়ে তোমরা আমার পায়ের ধুলোও কিনতে পারবে না। তোমরা আমাকে অপমান করতে এসেছে। আমি ভিক্ষা করি না।
হাম্মাদ ডাকাতদের দিকে ইঙ্গিত করে দূতদের বললো-তোমাদের নেতাকে গিয়ে আমার শক্তি ও জনবলের কথা বলবে। বলবে এদেরকে কি আমি এক দিরহাম করে দিয়ে ফিরে যেতে বলবো?
তোমাদের কাফেলার সকল ধনসম্পদ আমার। আর সকল যুবতী মেয়েরও মালিক আমি। সম্পদ ও যুবতী মেয়েদেরকে আমার হাতে সোপর্দ করে নিরাপদে তোমরা চলে যেতে পারো।
হাম্মাদ বিন আলী! নিজের শক্তির উপর এতোটা অহংকার করে ফেরাউন সেজো না! আমরা তোমার কাছে কোন আবেদন নিয়ে আসিনি, বন্ধুত্বের পয়গাম নিয়ে এসেছি। বললো এক দূত। সে আরো বললো, হতে পারে কাফেলার লোকজন সবকিছু নিয়েই মক্কায় যাবে। তাদের কিছুই হবে না। উল্টো তোমার লোকদের রক্তে মরুভূমির বালু রঙিন হবে।
একথা শুনে হাম্মাদের ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে গর্জন করে বললো, চলে যাও তোমরা। এক্ষণই আমার সামনে থেকে চলে যাও। আমরা কোন মেহমানকে হত্যা করি না, নয়তো এই ধৃষ্টতার জন্যে তোমাদের মাথা উড়িয়ে দিতাম।
অবশেষে দূতেরা ফিরে এলো। পথিমধ্যে তাদের দেখা হলো ইরতেগীনের সাথে। ইরতেগীন দূতকে জিজ্ঞেস করলো, হাম্মাদ কী জবাব দিয়েছে? জবাব শুনে ইতেগীন হাসলো এবং তীর-ধনুক নিয়ে একটি উঁচু টিলার উপরে চড়ে বসলো।
ডাকাত সর্দার হাম্মাদকে ত্রিশ হাজার দিরহাম দিয়ে মৈত্রীচুক্তি করার জন্যে প্রধান বিচারপতিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সুলতান। এজন্য তিনি নগদ ত্রিশ হাজার দিরহাম প্রধান বিচারপতির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতোগুলো দিরহাম ডাকাত সর্দারকে দেয়া ঠিক মনে করেননি প্রধান বিচারপতি। এজন্য তিনি পাঁচ হাজার দিরহামের প্রস্তাব দিয়ে দূত প্রেরণ করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এতো বড়ো ডাকাতদলের সর্দার পাঁচ হাজার দিরহামের প্রস্তাবকে অপমান মনে করবে। তবুও তিনি তাই করলেন এবং পরোক্ষভাবে ডাকাতদের উস্কানি দিয়ে বললেন- এসো, ক্ষমতা থাকলে ডাকাতি করে যাও।
