আমি নিজ থেকে আসিনি মহামান্য সুলতান! গযনীর এক শহীদ সৈনিকের হতভাগ্য কন্যা আমাকে পাঠিয়েছে। জঘন্য প্রতারণার শিকার হয়েছে সে। তার জীবনের কাফফারা দিয়ে সে গযনীর অন্যান্য মেয়েদের সম রক্ষা করতে চায়। বললো ইরতেগীন।
সে গযনীর বিপদগ্রস্ত স্ত্রমকে রক্ষা করতে সুলতানকে আগে-ভাগেই ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে আহবান জানাচ্ছে।
আমি গোলামের পুত্র গোলাম। আমি ঔরসজাতভাবে তুর্কি বাবার সন্তান। কিন্তু গয়নীতে আমার জন্ম হয়েছিল।
যে মেয়ে আমাকে পাঠিয়েছে তার নাম সাবিলা। তার বাবা আপনার সেনাবাহিনীর উট ইউনিটের একজন সৈনিক ছিল। সে যুদ্ধে শাহাদতবরণ করেছে। এই শহীদের মেয়ে আমার হৃদয়ে গযনীর মমতা তৈরি করেছে। সুলতানের যদি শোনার অবসর থাকে তবে আমার জীবনবৃত্তান্ত শুনতে পারেন।
ইতেগীন তার জীবন কাহিনী এবং সাবিলার জীবনকাহিনী সবিস্তারে সুলতানকে শোনালো। একথাও সে সুলতানকে জানালো, সাবিলা কিভাবে তার জীবন বাঁচিয়েছিল এবং কিভাবে সাবিলা তার মনে গযনীর মমতা জাগিয়ে তুলেছে। সবিলার গল্প শুনে সুলতানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
যে জাতির কন্যারা এমন দুরবস্থায় থাকার পরও জাতির মর্যাদা ও নিজের আত্মসত্তাকে লালন করে হৃদয়ের মধ্যে ঈমানের স্ফুলিঙ্গ নিভে যেতে দেয়নি, সে জাতিকে কোন শক্তিই দারিয়ে রাখতে পারে না। সামনে উপবিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে সুলতান বললেন, তোমরা যদি নতুন প্রজন্মকে ঈমান থেকে সরিয়ে পাপের সাগরে ডুবিয়েও দাও, তবুও এক সময় না এক সময় ঈমানের স্ফুলিঙ্গ এই জাতির মধ্যে জ্বলে উঠবে। ঈমানের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে এমন কোন শক্তি পৃথিবীতে নেই। আবেগাপুত সুলতান ইরতেগীনের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন
তুমি গোলাম নও ইরতেগীন! এসো, এগিয়ে এসো। সুলতান তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন
আমরা সবাই গোলাম। তবে কোন মানুষের গোলাম নই আমরা, আমরা সবাই আল্লাহ ও তার রাসূলের গোলাম। এই গোলামী কোন অপমান নয় এই গোলামীতেই রয়েছে মুসলমানদের প্রকৃত মর্যাদাও সম্মান। সুলতান দরাজ কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, হজ্জ কাফেলা অবশ্যই যাবে এবং দুই ইউনিট সেনাও এই কাফেলার সাথে থাকবে। গযনী রাষ্ট্রের সীমানা পাহারার ব্যবস্থা আল্লাহ নিজে করবেন।
* * *
সুলতান অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে বলে ফেলেছিলেন হজ্জ কাফেলার সঙ্গে সেনাবাহিনী থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তিনি কখনো আবেগের বশীভূত হয়ে সেনাদের পরিচালনা করেননি।
কিছুক্ষণ পর তিনি দু’জন সেনাপতি এবং তার সামরিক উপদেষ্টাদের ডাকলেন। তারা এলে তিনি দেশের সীমান্তের অবস্থা, সেনাবাহিনীর অবস্থা এবং হিন্দুস্তান থেকে আসা সামরিক সংবাদের ওপর আলোচনা পর্যালোচনা করলেন। তিনি এব্যাপারটিও আলোচনায় আনলেন, যদি পাঁচ হাজার প্রশিক্ষিত ডাকাত আমাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হয়ে থাকে, তবে এদের মোকাবেলায় কি পরিমাণ সৈন্য পাঠাতে হবে।
সুলতান বললেন, বেদুঈনরা খুবই লড়াকু হয়ে থাকে। এরা ঘোড়া ও উটকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মোকাবেলা করতে জানে এবং পালানোর পথটি সবসময় পরিষ্কার রাখে। এজন্য হজ্জ কাফেলার সাথে ঝটিকা বাহিনীর একটি ইউনিট এবং তীরন্দাজ বাহিনীর একটি ইউনিট পাঠাতে হবে।
সেই সময়ের ইতিহাস ঘাটাঘাটি করেও এ বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়া যায়নি, হজ্জ কাফেলার সাথে যে সেনা ইউনিট দু’টি সুলতান মাহমুদ পাঠিয়েছিলেন, এর নেতৃত্বের ভার কাকে দিয়েছিলেন। একটি সূত্রে জানা যায়, তিনি গযনীর তল্কালীন প্রধান বিচারপতি কাযিউল কুযযাতের কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
অবশ্য এ বিষয়টি পরিষ্কার যে তকালে যারা প্রধান বিচারপতি হতেন, তাদেরকে সামরিক বিদ্যায়ও পারদর্শী হতে হতো। তারা শুধু ধর্মীয় বিষয়েই ফয়সালা দিতেন না, সামাজিক রাজনৈতিক সব ব্যাপারেই প্রধান বিচারপতির ফায়সালা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ঐতিহাসিক ফারিতা লিখেছেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু মুহাম্মদকে সুলতান মাহমূদ হজ্জ কাফেলা এবং সেনাবাহিনীর চীফ কমান্ডারের দায়িত্ব দিয়ে হজ্জে পাঠিয়েছিলেন। তিনি প্রধান বিচারপতির হাতে প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়াও আরো অতিরিক্ত ত্রিশ হাজার দিরহাম দিয়েছিলেন, ডাকাতদের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে এই ত্রিশ হাজার দিরহাম ডাকাত সর্দারকে দিয়ে হজ্জ কাফেলা নিরাপদে যাওয়া আসার জন্যে ডাকাত সর্দারের সাথে প্রধান বিচারপতি নিরাপত্তা চুক্তি করে নেন।
সুলতান যখন হজ্জ কাফেলার নিরাপত্তার জন্যে এমন নিরাপদ ব্যবস্থা নিলেন, তখন হজ্জ কাফেলায় আরো লোক শামিল হলো। লোকের সংখ্যা বেড়ে গেলো আরো কয়েক হাজার। এর ফলে তা হয়ে গেলো স্মরণকালের সবচেয়ে বড় হজ্জ কাফেলা। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এই অঞ্চল থেকে আগে এতো বড় হজ্জ কাফেলা একসাথে যাওয়ার কথা কখনো শোনা যায়নি।
হজ্জ কাফেলাকে বিদায় জানাতে সুলতান মাহমূদ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কাফেলার নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে কথা বললেন এবং অনেক দূর পর্যন্ত কাফেলার সাথে সাথে তিনিও ভ্রমণ করলেন। কাফেলা ছিল কয়েক মাইল দীর্ঘ। সুলতান ঘোড়া দৌড়িয়ে কাফেলার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করলেন এবং হাত উঁচু করে যাত্রীদের অভিবাদন জানালেন এবং মুচকি হেসে তাদের সালামের জবাব দিলেন। কাফেলা যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে হজ্জমণ শেষে ফিরে আসতে পারে সেজন্য জন্য দু’আ করলেন।
