প্রধান বিচারপতি ফিরে আসা দূতদের কাছে হাম্মাদের জবাব শুনে তখনই সেনাদের কৌশলগত জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিলেন এবং গোটা কাফেলাকে পূর্ণ রণপ্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন।
অপমানজনক প্রস্তাবে হাম্মাদ বিন আলী প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলো। ডাকাত সর্দারদের একত্রিত করে গিয়ে কাফেলার উপর আক্রমণের নির্দেশ দিলো।
হজ্জ কাফেলা অবস্থান করছিল টিলার বাইরে। কাফেলার সকল পুরুষ উট ও ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিল। আর মেয়েরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা বিধানের জন্য দু’আ করতে শুরু করলো।
ডাকাত সর্দার হাম্মাদ একটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ডাকাতদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। তার ডানে ছিল দু’জন নিরাপত্তারক্ষী এবং তার আগে আগে একটি কালো পতাকা নিয়ে এক বেদুঈন যাচ্ছিল। ডাকাতদের নেতারা ছিল কুচকুচে কালো এবং ভয়ংকর। সাবিলা দূরের একটি টিলার উপরে দাঁড়িয়ে ডাকাত দলের অবস্থা এবং হজ্জকাফেলার অবস্থান দেখার চেষ্টা করছিল।
ডাকাতদলকে আসতে দেখে ইবতেগীন উঁচু টিলা থেকে নেমে নীচু টিলার আড়ালে আড়ালে সেই স্থানে চলে গেল, যে পথ দিয়ে ডাকাত দল অগ্রসর হচ্ছিল। একসময় তার নজরে পড়ল ডাকাত সর্দার হাম্মাদ বিন-আলী। হাম্মাদ মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে অহংকারী মেজাজে অগ্রসর হচ্ছিল। কিছুটা কাছাকাছি আসার পর ইরতেগীন তার ধনুকে একটি তীর ভরে হাম্মাদের চেহারা তাক করে ছুঁড়ে দিল। নিক্ষিপ্ত তীর গিয়ে হাম্মাদের কানপট্টিতে আঘাত হানল। তীর বিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে একটা চিত্তার দিয়ে হাম্মাদ ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ল। হাম্মাদের নিরাপত্তারক্ষীরা সর্দারের এই অবস্থা দেখে অবাক ও বিস্মিত। তখনো তারা ব্যাপারটি বুঝে উঠতে পারেনি কি হয়েছে। ইতোমধ্যে আরেকটি তীর এসে পতাকা বহনকারীর বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেল এবং পতাকা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
এ সময় ইরতেগীন দৌড়ে একটি টিলার উপরে উঠে গগন বিদারী চিৎকার করে বললো–
আল্লাহর কসম আমি হাম্মাদকে হত্যা করেছি। গযনীর সম্ভ্রমের কসম! বেদুঈনদের পতাকা মাটিতে পড়ে গেছে।
সর্দারকে তীর বিদ্ধ হয়ে মরতে দেখে এবং পতাকা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে ডাকাতরা আতংকিত হয়ে পড়লো এবং তাদের মধ্যে বিশৃংখলা দেখা দিলো। এই সুযোগে প্রধান সেনাপতি সেনাবাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন।
ইরতেগীন আগেই প্রধান সেনাপতি আবু মুহাম্মদকে বলেছিল, সে হাম্মাদকে চিনে এবং হাম্মাদকে ধরাশায়ী করাই হবে তার প্রথম কাজ।
প্রধান বিচারপতি ইরতেগীনকে বলেছিলেন, তুমি যদি হাম্মাদকে হত্যা করতে পারো, তাহলে বুক ফাটা চিৎকার দিয়ে তা সবাইকে জানিয়ে দিয়ে।
ইরতেগীনের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। সে সময় মতো হাম্মাদকে তীরবিদ্ধ করতে সক্ষম হয় এবং বেদুঈনদের পতাকাবাহীকে ধরাশায়ী করে উঁচু আওয়াজে সবাইকে জানিয়ে দেয়।
এরপর যুদ্ধ বলতে যা হচ্ছিল তাহলে বেদুঈনদের গণহত্যা। লড়াকু বেদুঈনরা তাদের ঝাণ্ডা ও সর্দারকে হারিয়ে আতংকিত হয়ে পড়েছিল। তারা আক্রমণের চেয়ে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট ছিল বেশি। সেনাদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে বেদুঈন ডাকাতেরা টিলার আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু টিলাগুলো তাদের জন্য মরন ফাঁদ হয়ে উঠলো। টিলার উপরে অবস্থানকারী তীরন্দাজদের তীরবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ছিল একের পর এক বেদুঈন। আর কেউ পালিয়ে যেতে চাইলে সৈন্যরা তাকে তাড়া করে মেরে ফেলছিল।
ডাকাত ও গযনী বাহিনীর মধ্যে যখন চলছে মরণযুদ্ধ, আহতদের আর্তচিৎকার, ঘোড়া ও উটের হ্রেষাধ্বনি ও কোলাহলের মধ্যেই একটি নারী কণ্ঠের ডাক চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল- ইরতেগীন! ইরতেগীন! অবলা এই নারী ছিল সাবিলা। তাকে গযনীর এক সৈনিক ঘোড়ায় তুলে না নিলে সে হয়তো ঘোড়র পায়ে পিষ্ঠ হয়েই মারা যেতো।
দিনের প্রথমভাগে শুরু হওয়া এই লড়াই দুপুরের দিকেই শেষ হয়ে গেল। প্রধান বিচারপতি যুদ্ধ শেষে নিরাপদে কাফেলাকে মক্কায় নিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে প্রধান বিচারপতি ইরতেগীনের উদ্দেশ্যে বললেন– তুমি আর এখন থেকে গোলাম নও, স্বাধীন। আর সাবিলা! তুমি গযনীর মর্যাদার প্রতীক, ইসলামের সম্মান। ইসলাম এ ভাবেই কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে।
চতুর্থ খন্ড সমাপ্ত
৫.১ রত্না হলো রাজিয়া
ভারত অভিযান (মাহমূদ গজনবীর ভারত অভিযান) (পঞ্চম খণ্ড) / এনায়েতুল্লাহ আলতামাস / অনুবাদ – শহীদুল ইসলাম
সুলতান মাহমুদ গজনবীর ঐতিহাসিক সিরিজ উপন্যাস।
উৎসর্গ
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে চক্রান্তমূলক হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনা অফিসারদের রূহের মাগফিরাত এবং প্রতিরক্ষা কাজে নিয়োজিত সকল সদস্যের ঐক্য, সংহতি ও সাফল্য কামনায় যারা হবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়–
শির দেগা নাহি দেগা আমামা
এর মূর্ত প্রতীক।
–অনুবাদক
.
প্রকাশকের কথা
আলহামদুলিল্লাহ! এদারায়ে কুরআন’ কর্তৃক প্রকাশিত সুলতান মাহমূদ এর ভারত অভিযান সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি এবং পাঠক মহলকে জানাচ্ছি মোবারকবাদ। নিয়মিত বিরতি দিয়ে এর প্রতিটি খণ্ড প্রকাশের ঐকান্তিক ইচ্ছা আমাদের ছিল । কিন্তু নানাবিধ কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পঞ্চম খণ্ড প্রকাশের বিলম্বের কারণে অনেক আগ্রহী পাঠক-পাঠিকা ও সুহৃদ আমাদের তাকিদ দিয়েছেন, কেউ কেউ তো রীতিমতো অসন্তোষ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বস্তুত সম্মানিত পাঠকদের এই তাগাদা, ক্ষোভ একজন প্রকাশক হিসেবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। কারণ সিরিজের গোটা উপাখ্যানটি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়বোধ আমার আছে। সেই সাথে একটি প্রিয় সিরিজের অপঠিত অংশের জন্যে একজন উৎসাহী পাঠকের মধ্যে কতোটা তাড়না থাকে এই অনুভূতিটুকুও আমাকে তাড়িয়েছে। মোদ্দাকথা হলো, বিলম্ব বিলম্বই। কোনর জবাবদিহিতাই বই সামনে পেশ করা ছাড়া পাঠকের আহত মনকে সান্ত্বনা দিতে পারে না। অতএব শত যৌক্তিক কারণ থাকার পরও সবার কাছে দুঃখপ্রকাশ করছি।
