সংবাদ বাহকের কাছে হজ্জ সংশ্লিষ্ট খবর শুনে তিনি তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিলেন, আগন্তুককে আমার কাছে নিয়ে আসা হোক।
ইরতেগীন প্রায় জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছিল। তার মুখ চরম ফ্যাকাসে হয়ে পরেছিল এবং চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। ঠিকমতো পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াতে পারছিল না। তাকে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসানো হলো এবং তাৎক্ষণিক পানীয় ও খাবার সামনে হাজির করা হলো। কিছুটা পানীয় এবং খাবার গ্রহণের পর তার শরীরে সতেজতা ফিরে এলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে সুলতানের উদ্দেশ্যে বললো–
গযনী ও খোরাসানের সুলতানের কাছে গোস্তাখী মাফ চেয়ে নিচ্ছি। বিগত পঁচিশ দিনের মধ্যে আমি একদণ্ড দাঁড়ানোর অবকাশ পাইনি। প্রথমে যাত্রা শুরু করেছিলাম উটে সওয়ার হয়ে। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে এক লোককে উটটি দিয়ে তার কাছ থেকে ঘোড়া নিয়ে নিয়েছি।
এভাবে পথিমধ্যে আরো দু’বার ঘোড়া বদল করেছি। ক্লান্ত-শ্রান্ত আমার আধমরা ঘোড়াগুলো অন্যদের দিয়ে তাদের কাছ থেকে তাজা ঘোড়া নিয়ে ঘোড়ার পিঠেই খাবার খেয়েছি, ঘোড়ার পিঠেই রাত কাটিয়েছি, এক মুহূর্তও বিশ্রাম নেইনি। ফলে দেড় মাসের দূরত্ব আমি মাত্র পঁচিশ দিনে অতিক্রম করেছি।
সেই কথাটি বলো, যে কথা বলার জন্য এমন কষ্ট শিকার করে তুমি আমার কাছে এসেছো? মমতামাখা কণ্ঠে বললেন সুলতান।
আপনি যদি হজ্জ কাফেলার সাথে দুই ইউনিট সেনা পাঠাতে না পারেন তাহলে এবারের হজ্জ যাত্ৰা মুলবতী করে দিন। কারণ, হজ্জ কাফেলাকে লুটে নেয়ার জন্যে ডাকাত ও লুটেরা দল একটি পূর্ণ সেনাবাহিনীর শক্তি নিয়ে কিয়াদ মরুভূমিতে অবস্থান করছে। বাগদাদের খলীফার আশির্বাদ আছে এই ডাকাতদের প্রতি। বলা চলে খলীফা নিজেই ডাকাতদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন। বললো ইরতেগীন।
কি বলছো তুমি, বাগদাদের খলীফা ডাকাতদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন?
গযনীর সুলতানের যদি এক নগণ্য গোলামের কথা পছন্দ না হয় তবে গোলাম ক্ষমা প্রার্থনা করছে। সরাসরি খলীফার পৃষ্ঠপোষকতা যদি নাও থাকে তবে তার দরবারের সেনাপতি ও কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চয় আছে। তাও যদি বাস্তবে না ঘটে থাকে তবে আমার একথা মোটেও মিথ্যা মনে করবেন না। হেযায়ের সকল লুটেরা বেদুঈন গোষ্ঠী হাম্মাদ বিন আলীর নেতৃত্বে কিয়াদ মরুভূমির যে জায়গাটি বেশি টিলাও বালিয়াড়ীতে ভরা সেখানে জড়ো হয়েছে গযনীর হজ্জ কাফেলা লুটে নেয়ার জন্য। এরা শুধু পণ্যসামগ্রীই লুট করবে না, হজ্জ কাফেলার সাথে থাকা সকল যুবতী নারীদের অপহরণ করবে।
ডাকাত সর্দার হাম্মাদ বিন আলী সম্প্রতি বাগদাদ থেকে এসেছে। আমি হাম্মাদের সাথে ছিলাম। হাম্মাদ প্রথমে খলীফার সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং প্রভাবশালী সেনাপতির সাথে সাক্ষাত করে। তার পর আরো দু’জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সাথে দেখা করে। পরবর্তীতে এই ডাকাত সর্দার হাম্মাদ বিন আলীকে খলীফার কাছে নিয়ে যায়। খলীফার একান্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি ডাকাত সর্দার হাম্মাদকে একজন আন্তর্জাতিক মানের বেদুঈন ব্যবসায়ী বলে খলীফার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারা খলীফাকে জানায়, হাম্মাদের ব্যবসা আরব থেকে গযনী পর্যন্ত বিস্তৃত। শুধু তাই নয় সে খলীফার শাসন বিরোধী এবং বিদ্রোহী সকল আরব বেদুঈন জনগোষ্ঠীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে খলীফার ভক্ত বানিয়ে ফেলেছে।
ইরতেগীন সুলতান মাহমুদকে হাম্মাদ বিন-আলী কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় গযনীর হজ্জ কাফেলা লুটে নেয়ার চক্রান্ত করেছে সবকিছু বিস্তারিত জানালো। হাম্মাদ কিয়াদ অঞ্চলে কতোজন বেদুঈনকে একত্রিত করেছে তা জানাতেও ভুললো না ইরতেগীন। ইরতেগীন জানালো, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, গযনীর কাফেলা লুট করার জন্যে হাম্মাদ পাঁচ হাজার লড়াকু বেদুঈনকে প্রস্তুত করে রেখেছে।
পাঁচ হাজার ডাকাত জড়ো হওয়ার কথা শুনে সুলতান মাহমূদ বেশ অবাক হলেন।
এতো বিপুল সংখ্যক ডাকাত দলের একত্রিত হওয়ার অর্থ হলো, ডাকাতের লোকেরা গযনীতে এসে কাফেলার লোকসংখ্যা দেখে গেছে। তারা জেনে গেছে কাফেলার সাথে ব্যবসায়ীরাও আছে এবং তারা হিন্দুস্তানের নামী দামী মালপত্র নিয়ে যাচ্ছে। ডাকাতের লোকেরা এটাও দেখে গেছে, কাফেলায় হজ্জযাত্রীদের মধ্যে প্রচুর সংখ্যক সেনাবাহিনীর লোকজন রয়েছে যারা মোকাবেলা করতে সক্ষম।
আপনি ঠিক বলেছেন সুলতানে মুহতারাম! ডাকাতের সংবাদ বাহক বলেছে, কাফেলায় দেড় দু’হাজার লোক হতে পারে- বললো ইরতেগীন।
আসলে কাফেলায় নিয়মিত কোন সেনা নেই। সৈনিকদের যদি হজ্জ করার সুযোগ হতো তাহলে সবার আগে আমি হজ্জ করতাম। বললেন সুলতান।
সুলতান এ খবরে গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি বললেন, হজ্জগামী কাফেলাকে আমি বাধা দিতে পারি না। যদিও আমার হজ্জে যাওয়ার সুযোগ হয় না, কিন্তু হজযাত্রীদের সবধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা আমার কর্তব্য। হজ্জযাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমি দেশের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করবো না।
একথা বলতে বলতে তিনি থেমে গেলেন এবং ইরতেগীনের দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে বললেন–
আমি তো এ পর্যন্ত তোমার নাম পরিচয় পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলাম না। তুমি আসলে কে? কি তোমার পরিচয়? তুমি বলছো, ডাকাত দলের সর্দারের একান্ত ব্যক্তি ছিলে তুমি। এরপরও আমাদের প্রতি তুমি এতো দরদ কেন অনুভব করলে? তুমি কি আল্লাহর সেই সৈনিককে ধোঁকা দিতে পারবে, যার ভয়ে হিন্দুস্তানের মন্দিরগুলোর মূর্তিগুলো পর্যন্ত ভয়ে কাঁপে
