* * *
সাজানো অপরাধে গোগল যখন হাম্মাদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নিহত হলো, ততোক্ষণে ইরতেগীন দ্রুত উট তাড়া করে অনেক দূর চলে গেছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ইরতেগীন যখন দেখলো কেউ তার পিছু ধাওয়া করছে না, তখন সে স্বাভাবিক গতিতে সামনে চলতে লাগলো। রাতভর সে উধ্বশ্বাসে উট হাঁকিয়েছে। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে বার বার পিছনের দিকে তাকিয়ে ইরতেগীন দেখছিল তাকে কেউ তাড়া করছে কি না। কিন্তু সূর্য অনেকটা উপড়ে উঠে যাওয়ার পরও পিছু ধাওয়াকারী কাউকে না দেখতে পেয়ে সে নিশ্চিন্ত মনে যথাসম্ভব দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার সিদ্ধান্ত নিলো।
এদিকে হাম্মাদ সকল গোত্রপতিকে গযনীর হজ্জ কাফেলা সম্পর্কে ধারণা দিল। সবশেষে নির্দেশ দিলো, আগামীকাল তোমরা সবাই নিজ নিজ গোত্রের লোকদেরকে কিয়াদ নামক জায়গায় জড়ো করবে। সে দিনই সকল বেদুঈন গোত্রপতি তাদের লোকজন নিয়ে কিয়াদের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো। হাম্মাদও জায়গা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেলো।
হাম্মাদ যখন তার স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছলো তখন গযনী থেকে তার পাঠানো এক লোক খবর নিয়ে এলো। আগন্তুক তাকে জানালো, গযনীর হজ্জ কাফেলায় তোক অনেক বেড়ে গেছে। বিপুল সংখ্যক ব্যবসায়ীও এই কাফেলায় যোগ দিয়েছে।
সে হাম্মাদকে আরো জানালো, পথে পথে এই কাফেলার সঙ্গে আরো অনেক লোক যোগ দেবে। তবে হাম্মাদের সংবাদবাহক একথা বলতে পারেনি, হজ্জ কাফেলার নিরাপত্তার জন্য গযনীর সুলতান সেনাবাহিনীর কোন ইউনিটকে কাফেলার সঙ্গে পাঠাচ্ছেন কি না।
* * *
হেযায় পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কোন ইউনিটকে কি করে আমি পাঠাবো? সুলতান মাহমূদ হজ্জ কাফেলার এক প্রতিনিধিকে বলছিলেন। আমার হাতে তো সৈন্য খুবই সীমিত। তাছাড়া সীমান্তের অবস্থা ভালো না। এজন্য উচিত দেশের প্রতিটি লোকেরই সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়া।
হজ্জ কাফেলার একটি প্রতিনিধি দল সুলতান মাহমূদের কাছে গিয়ে আবেদন করেছিলো, এবারের হজ্জ কাফেলা অনেক বড়। তাছাড়া বহু ব্যবসায়ী অনেক মূল্যবান পণ্য নিয়ে হজ্জ কাফেলায় শরীক হয়েছেন। সার্বিক দিক বিবেচনা করে নিরাপত্তার স্বার্থে কাফেলার সাথে একটি সেনা ইউনিট থাকা দরকার।
আমি জানি, প্রতি বছরই হজ্জ কাফেলা ডাকাত ও লুটেরাদের হাতে নাজেহাল হয়। হজ্জযাত্রীদেরকে আমি সব ধরনের সেবা দিতে চেষ্টা করি; কিন্তু মক্কা পর্যন্ত এদের সাথে কোন সেনা ইউনিট পাঠানোর ব্যাপারটি আমার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে- বলছিলেন সুলতান। যেহেতু অনেক বড় কাফেলা, তাই তাতে অশ্বচালনাকারী এবং যুদ্ধ করার মতো বহু লোক নিশ্চয় আছে। তাছাড়া সেনাবাহিনীর অনেকেই এবার হজ্জে যাচ্ছে। আপনাদের উচিত হবে সবাই সশস্ত্র থাকা। প্রত্যেকেরই তীর-ধনুক, ঢাল-তরবারী সাথে রাখা প্রয়োজন। এতো বড় কাফেলাকে কেউ লুট করার সাহস পাবে বলে আমার মনে হয় না। কাফেলা ছোট হলে লুট হওয়ার আশংকা থাকে। আমার মনে হয় আপনারা নির্ভয়েই যেতে পারেন।
হজ্জ প্রতিনিধিদলকে বিদায় করে সুলতান মাহমূদ তার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের ডাকলেন। এবং তার উপদেষ্টাদেরও ডেকে পাঠালেন। সবাই একত্রিত হলে তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন– হজ্জ প্রতিনিধিদলকে আমি হতাশ করে ফিরিয়ে দিয়েছি। তারা হজ্জ পালন করতে যাচ্ছেন। আমার উচিত ছিলো তাদের আবেদনে সাড়া দেয়া। কিন্তু আপনারা তো দেখতেই পাচ্ছেন, এ মুহূর্তে সেনাবাহিনীর এখানে থাকা বেশি প্রয়োজন। হিন্দুস্তান থেকেও খারাপ সংবাদ এসেছে। কনৌজের দুর্গপতি রাজ্যপাল কনৌজে নিয়োজিত আমাদের সেনাপতির কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে মৈত্রীচুক্তির আবেদন করেছে এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ভর্তুকি ও খাজনা দিতে অঙ্গীকার করেছে। এর বিনিময়ে বেড়া নাশক স্থানে সে নতুন করে রাজধানী পত্তনের অনুমতি চাচ্ছে।
কিন্তু এতে লাহোর, গোয়ালিয়র ও কালারের রাজারা ক্ষেপে গেছে। তারা রাজ্যপালের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এরা রাজ্যপালকে তাদের সহযোগী করে আমাদের সাথে চূড়ান্ত বোঝাঁপড়া করতে চাচ্ছিলো। জানা নেই, এই পরিস্থিতিতে কোন দিন আবার আমাদেরকে হিন্দুস্তান রওয়ানা করতে হয়।
* * *
হজ্জ কাফেলা রওয়ানা হওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। যে প্রতিনিধিদল সুলতান মাহমূদের কাছে নিরাপত্তা বাহিনীর আবেদন নিয়ে গিয়েছিল তারা ফিরে এসে সবাইকে বললো–সুলতান সবাইকে অস্ত্রশস্ত্র সাথে নিয়ে যেতে বলেছেন। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিভিন্ন অভিযানে সেনাদল ব্যস্ত থাকায় হজ্জ কাফেলার সাথে সেনাদল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ সংবাদ পাওয়ার পর হজ্জ কাফেলার লোকদের অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করার জন্য আরো দুদিন সময় বাড়ানো হলো। দু’দিনপর পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে কাফেলা রওয়ানা হয়ে যাবে।
পরদিন যথারীতি সুলতান মাহমূদ তার কক্ষে বসা। এমন সময় দারোয়ান এসে খবর দিলো, ইতেগীন নামের এক লোক দীর্ঘ সফর করে খুবই করুন অবস্থায় এখানে এসেছে। সে এসেই বলেছে, হজ্জ কাফেলাকে যাত্রা মুলতবী করতে বলো, আর জলদী আমাকে সুলতানের কাছে নিয়ে চলো। জরুরী বার্তা আছে।
হজ্জ সংশ্লিষ্ট যেকোন ব্যাপারে সুলতান মাহমূদ ছিলেন খুবই সতর্ক। তিনি হাজীদের ব্যাপারে অন্যসব কাজ মুলবতী রেখে আগে তাদের বিষয়াদি দেখতেন।
