করতে পারে। তুমি জানো না। গোগীল খুন করতে পারে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, গোগীল ইরতেগীনকে গায়েব করে ফেলেছে। এখন আমার পালা। আমি তোমাকে একথা বলার সুযোগই পাইনি।
তুমি যখন আমাকে এই তাঁবুতে নিয়ে এসেছিলে, তখনই একবার গোগীল আমাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিলো, লোভও দেখিয়েছিল। লোভে কাজ না হওয়ায় আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছিল আমি যেন তোমাকে ত্যাগ করে তার সাথে চলে যাই। কিন্তু আমি তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি আমার মুনিবকে ধোকা দিতে পারবো না।
এরপর সে গতকাল আবার এসেছিল। গত রাতে তুমি যখন তোমার তাঁবুতে চলে গিয়েছিলে আমি আমার তাঁবুতে না গিয়ে একটু ঝর্ণার পাশটায় পায়চারী করছিলাম। আমি জানতাম না গোগল আমার পিছু নিয়েছে। সে আমার কাছে এসে আমাকে নানাভাবে প্ররোচিত করে অপহরণ করতে চাইলো। আমি তাকে বাধা দিলে সে আমার দিকে হাত বাড়ালো। নিজেকে একাকী ভেবে আমি ভীষণ ভড়কে গিয়েছিলাম কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে জানি ইরতেগীন এসে উপস্থিত হলো। আসলে আমার অজান্তেই সে আমার নিরাপত্তার জন্য ধারে কাছেই কোথাও অবস্থান করছিল।
গোগীল ইরতেগীনকে গোলাম বলে খুব গালমন্দ করলো এবং সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। কিন্তু ইরতেগীন বললো–
তুমি জানো না গোগল! সাবিলা আমার মুনিব। আমার মুনিবের জন্যে আমি জীবন দিয়ে দেবো। কিন্তু ওকে নিয়ে যেতে দেবো না।
তখন গোগীল ইরতেগীনকে উদ্দেশ্য করে বললো, আজ রাতই তোর জীবনের শেষ রাত। যা, যদি জীবিত থাকতে চাস, তাহলে মুনিবের তাঁবুতে গিয়ে ঘুমা, নয়তো খতম হয়ে যাবি। এরপর গোগীল ফুসফুস করতে করতে চলে গেলো। ইরতেগীন গোগীলের ক্ষোভ ও হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে আমাকে আমার তাঁবুতে পৌঁছে দিয়ে চলে গেলো। আমি জানি গোগীল খুবই হিংস্র। সে নিশ্চয় আজ রাতের মধ্যেই ইরতেগীনকে খুন করে গায়েব করে ফেলেছে।
সাবিলার কথা শুনে হাম্মাদ বিন আলী ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো এবং বাঘের মতো হুংকার ছাড়তে লাগলো। সেই সাথে সে গোগীকে ডেকে পাঠালো।
আমি জানি গোগল! তুমিও একটি গোত্রের সর্দার। কিন্তু তুমি কি ভুলে গেছো আমি কে? ক্ষুব্ধ কণ্ঠে গোগীলের উদ্দেশ্যে বললো হাম্মাদ।
আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, আমার লোকটিকে তুমি ফিরিয়ে দাও।
কাকে ফিরিয়ে দেব? জিজ্ঞাসু কণ্ঠে বললো গোগীল।
ইরতেগীনকে। সে আমার একান্ত নিরাপত্তারক্ষী। গত রাতে যে তোমার ও সাবিলার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো?
হাম্মাদের ক্ষোভ ও প্রশ্নের কারণ বুঝতে না পেরে গোগীল দারুন বিস্মিত ও অবাক হলো। হাম্মাদের এমন প্রশ্নের কোন কূল কিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না। কেন? কিসের ভিত্তিতে হাম্মাদ তাকে এমন প্রশ্ন ও অভিযোগ করছে। ক্ষোভই বা দেখাচ্ছে কেন?
গোগীলের যখন এই অবস্থা তখন এই সুযোগে সাবিলা হাম্মাদের কানে কানে বললো, ধূর্ত গোগীল এখন সবকিছু এড়িয়ে যাওয়ার জন্য না জানার ভান করছে। সাবিলার এ কথায় হাম্মাদ গোগীলের ওপর আরো বেশি ক্ষেপে গেল।
সে গোগীলের উদ্দেশে বললো, গোগীল! একটি গোলাম ও রক্ষিতার জন্যে আমার সাথে শত্রুতা বাধাতে তুমি একটুও চিন্তা করছে না? অথচ এ মুহূর্তে আমাদের মধ্যে জোটবদ্ধতা ও ঐক্য খুবই প্রয়োজন। আমি ইচ্ছা করলে সাবিলার মতো দশটি রক্ষিতা তোমাকে এনে দিতে পারি। কিন্তু ওকে তুমি আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য আমার নিরাপত্তা রক্ষীকে গায়েব করে দিয়েছে। তুমি কেমন সর্দার? কোন সরদারের পক্ষে কি একাজ করা মানায়? আমার সাথে শত্রুতা বাধিয়ে তুমি সর্দারী করতে পারবে? তুমি কি মনে করো তোমার পক্ষে এরপরও জীবিত থাকা সম্ভব?
এমন ঘটনার সাথে আদৌ জড়িত ছিল না গোগীল। তাই এ অভিযোগ সে মেনে নিতে পারছিল না। কথায় কথায় অনেক কথা হয়ে গেলো। তর্ক-বিতর্কে উভয়েই উভয়ের প্রতি চরম আক্রোশে ফেটে পড়লো।
এক পর্যায়ে হাম্মাদ সব গোত্রপতিদেরকে একত্রিত করে সাবিলাকে বললো, তুমি যা বলেছে, তা এদেরকে শোনাও। সাবিলাও কোন প্রকার জড়তা ছাড়া হুবহু যে কথা হাম্মাদকে বলেছিলো তাই সর্দারদের শুনিয়ে দিলো।
সাবিলার কথা যাচাই না করেই হাম্মাদ তার প্রতি এমন অভিযোগ আনায় রাগে ক্ষোভে গোগল এই বলে জমায়েত থেকে উঠে গেলো
ঠিক আছে, আজ থেকে আমার সাথে আর আমার কবিতার সাথে তোমার কোন সম্পর্ক থাকবে না।
ক্ষোভে অপমানে গোগীল উঠে যেই চলে যেতে শুরু করলো, অমনি হাম্মাদ তার পাশে দাঁড়ানো এক প্রহরীর কাছ থেকে ধনুক ছিনিয়ে নিয়ে তীর দান থেকে একটি তীর ধনুকে ভরলো এবং কালবিলম্বন না করে গোলীলের দিকে ছুঁড়ে দিলো। তীরটি গোগীলের পিঠে বিদ্ধ হয়ে এফোঁড় ওফোড় হয়ে গেলো। সাথে সাথেই গোগীলের দেহটা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল।
সেদিন রাতেই হাম্মাদ বিশেষ একটি অনুষ্ঠান ও গণজমায়েত করে গোগীলের জায়গায় আরেকজনকে গোগীল গোত্রের গোত্রপতি ঘোষণা করলো। সেই জমায়েতে হাম্মাদ বললো, আমার ক্ষুব্ধ প্রতিশোধের জন্য আমি তোমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি জানতাম আমার লোককে আমি ফিরে পাবো না। কারণ গোগীল তাকে খুন করে গায়েব করে দিয়েছে। তবুও তোমাদের সবার স্বার্থে আমাকে এই কঠোর কাজটি করতে হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোন গোত্রপতির দ্বারা এমন ঐক্য বিনষ্টকারী ঘটনা না ঘটে এবং নেতৃত্বের অবস্থান থেকে কেউ বিচ্যুত না হয়।
