সুলতানকে বলবে, এই হজ্জ কাফেলার ওপর পাঁচ হাজার বেদুঈন ডাকাত হামলা করবে। সুলতানকে বলবে, গযনীর এক মজলুম কন্যা এ খবর দিয়ে পাঠিয়েছে যে, হজ্জ কাফেলাকে বাধা দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু ডাকাতদের গতিরোধ করা সম্ভব। এই কাফেলার সাথে যথেষ্ট পরিমাণ সেনা সদস্য না পাঠালে বাবেল ও বাগদাদের বাজারে গয়নীর কন্যা জায়ারা বাদী হিসেবে বিক্রি হবে। সুলতানকে বলবে, হজ্জ কাফেলা থেকে যদি একটি মেয়েও অপহৃত হয় তাহলে আল্লাহ সুলতানকে ক্ষমা করবেন না।
ঠিক আছে, আমি সব বলবো সুলতানকে। বললো ইতেগীন। তুমি দুআ করো আমি যেন জীবিতাবস্থায় সেখানে পৌঁছতে পারি। কিন্তু তুমি কি এখান থেকে বের হবে না। এই জংলীগুলোর কাছে তোমাকে ফেলে রেখে আমি কি করে চলে যাবোর
তুমি চলে যাও, যাও ইরতেগীন! যদি জীবিত থাকি তাহলে এই দেহ ও শরীর নয় আমার হৃদয় ও আত্মার অধিকারী হবে তুমি। তখন তুমি না, আমি হবো তোমার বাদী। আশা করি তুমি গযনী পৌঁছে যাবে। কারণ, তুমি কোন অপরাধ করছে না, আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
তুমি কি এই জংলীগুলোকে কোনভাবে আমার পিছু ধাওয়া করা থেকে বিরত রাখতে পারবে?
সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। এখন এদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখে নিয়েছি। তোমার আগের মুনিবের কথা মনে আছে না? সে ছিল আমার স্বামী। তার অন্য স্ত্রীদেরকেও তুমি চিনতে ও জানতে। তুমি এটাও জানতে রাজপ্রাসাদের মতো সেই হাবেলীতে কি ভয়ানক চক্রান্ত হতো।
আসলে যেখানে সম্পদ ও নারী থাকে, সেখান থেকে সততা, ভদ্রতা আর শালীনতা দূর হয়ে যায়। আমি এই শয়তান জগতের একটি অংশ হয়ে গেছি। ফলে অনেক শয়তানীও আমি শিখে ফেলেছি।
গোগীল নামের এক গোত্রপতিকে তুমি চেনো। এই গোগীলই বলেছে, ডাকাতিতে সে এক হাজার লোক নিয়ে আসবে। এই লোকটিকে আমি ঘৃণা করি। এই লোকটি আমাকে প্রস্তাব করেছিল, হাম্মাদের সঙ্গ ত্যাগ করে আমি যেন তার সাথে চলে যাই। আমি তার প্রস্তাবের জবাবে বলেছিলাম
আমি হাম্মাদের স্ত্রী নই বটে, তবে হাম্মাদকে আমি ধোকা দিতে পারবো না। সে প্রথমে আমাকে লোভ দেখায় এবং পরে হুমকিও দিয়েছিল। তার প্রস্তাবে রাজী না হলে আমাকে সে অপহরণ করবে। সে এও বলেছিলো, আমি যদি হাম্মাদকে একথা বলে দেই তাহলে সে আমাকে খুন করিয়ে ফেলবে।
এখন আমি এর প্রতিশোধ নেবো এবং এদের মধ্যে একটা গণ্ডগোল বাঁধানোর চেষ্টা করবো।
এখানকার কথা থাক ইরতেগীন! তুমি এখান থেকে কবে যাচ্ছে।
এখনই যাবো। এ ব্যাপারে তুমি আমাকে আর কোন কথা জিজ্ঞেস করো না। তুমি তাঁবুর ভেতরে চলে যাও। দেখো, এখন রাতের শেষ প্রহর চলছে।
আবেগে সাবিলা ইরতেগীনের দু’হাত নিজের হাতে নিয়ে তার চোখে লাগাল এবং চুমু খেয়ে ধীরে ধীরে তার তাঁবুর দিকে চলে গেল।
* * *
রাতের শেষ প্রহরে তাঁবুর এই পল্লীতে মধ্যরাতের মতোই নীরবতা। পল্লীর লোকদের মধ্যে জেগে ওঠার কোন তাড়া ছিল না। ইরতেগীন ছিল এই ডাকাতপল্লীর মুকুটবিহীন সম্রাট হাম্মাদের একান্ত দেহরক্ষী। তাকে গোটা তাঁবু এলাকা জুড়ে সর্বত্র টহল দিতে হতো যে কোন ঘোড়া বা উট বাঁধন মুক্ত করে নিয়ে যেতে পারতো সে। যে তাঁবুতে খাবার দাবার থাকতো, সেখান থেকে ইচ্ছেমতো খাবার উঠিয়ে নিলেও তাকে কিছু বলার কেউ ছিলো না।
ইরতেগীন যখন দেখলো সাবিলা তার তাঁবুতে ফিরে গেছে তখন সে তার নিজের তাঁবুতে গেল। সেখান থেকে বর্শা, তীর ধনুক ও তরবারী তুলে নিল। কিছু পরিধেয় কাপড়ও সাথে নিয়ে খাবার দাবারের তাঁবুতে চলে গেল। সেখান থেকে একটা পুটলীতে খাবার ও পানির পাত্র নিয়ে একটি উটের বাঁধন খুলে সেটির গলায় এগুলো বাধলো। উটের সাথে প্রয়োজনীয় সবকিছু বেঁধে নিয়ে সে উটকে তাড়া করল।
সাবিলা তার তাঁবুর পর্দা একটু ফাঁক করে সবই দেখছিল। গোটা তাঁবু এলাকাটাই তখন কালো কালো স্কুপের মতো মনে হচ্ছিল। সাবিলার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছিল। একটু পর সাবিলা দেখতে পেলো, তাঁবুর এলাকা থেকে একটি উট ধীরে ধীরে বাইরে চলে যাচ্ছে। মনের অজান্তেই তখন সাবিলার ঠোঁটে উচ্চারিত হতে লাগলো দু’আ কালাম। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যে উটটি অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।
মনের মধ্যে একটা চরম অস্থিরতা নিয়ে বিছানায় গিয়ে দুহাতে মুখ চেপে পড়ে রইল সাবিলা। কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল টেরই পেলো না।
***
সাবিলা যখন ঘুম থেকে জাগলো তখন ভরদুপুর। তার শরীরটা খুবই অবসন্ন। জোর করে বিছানা ছেড়ে বসল সাবিলা। রাতের ঘটনা মনে হতেই তার বুকটা ধুকধুক করে উঠলো। খুব ভয় ভয় লাগছিল সাবিলার। মনে হচ্ছিলো, ইরতেগীন তাকে ধোঁকা দিয়ে হাম্মাদকে সবই বলে দিয়েছে।
সে তার তাঁবু থেকে বের হয়ে ইরতেগীনের তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে দেখল। না, তাতে ইরতেগীন নেই। তার হাতিয়ার এবং কাপড়-চোপড়ও সেখানে ছিল না। সাবিলা ইরতেগীনের তাঁবু থেকে যখন বের হচ্ছে ঠিক সেই সময় হাম্মাদ তার তাঁবু থেকে বের হলো। সে সাবিলাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ইরতেগীনের তাঁবুতে সে কেন গিয়েছিল?
চোখে মুখে আতঙ্কের ভাব ফুটিয়ে সাবিলা বললো, আমি ইতেগীনকে দেখতে গিয়েছিলাম সে তাঁবুকে আছে কি নেই। আমার আশঙ্কা হচ্ছে সে জীবিত নেই, তাকে খুন করা হয়েছে।
খুন? মনে হচ্ছে তোমার মাথা ঠিক নেই। এখানে কে কাকে খুন করবে? বিস্মিত কণ্ঠে বললো হাম্মাদ।
