শোন ইতেগীন! হাম্মাদ আমাকে আজ রাতেই বলেছে- সাবিলা। শুনেছি গযনীর সুলতান মাহমুদ নাকি নিজেকে মূতিবিনাশী বলে বড়াই করে। এই বলে সে একটা অট্টহাসি দিয়ে বললো, আসলে সে একটা লুটেরা। আমার মতো সেও একটা ডাকাত। দেখবে একদিন আমি সেই মূর্তি বিনাশীর মূর্তিই ভেঙে দেবো।
একথা শোনার পর আর আমি স্বাভাবিক থাকতে পারলাম না। সে যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো, তখন আমি তার খঞ্জরটি হাতে তুলে নিলাম। তখন আমার হাত কাঁপছিল। বাইরের মশালের আলোয় আমি তার বুক ঠিকই চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম একই আঘাতে তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে। কিন্তু আমার অজান্তেই আমার হাত স্থির হয়ে গেল। আমার মনের মধ্যে হঠাৎ একথা উঁকি দিলো, এতো আমি গযনীর বাদশা আর গযনীর অমর্যাদার প্রতিশোধ নিচ্ছি। এই ভাবনার সাথে সাথেই কোন অদৃশ্য শক্তি যেনো আমার হাত ধরে থামিয়ে দিল।…
আমার কানে যেনো ধ্বনিত হলো
একা এই লোকটিকে হত্যা করে তুমি নিজে যেমন বাঁচতে পারবে না, গযনীর বহু নিষ্পাপ তরুণীর সমও বাঁচাতে পারবে না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে এই হিংস্র জীবগুলো তাদের নেতা হত্যার জন্যে তোমার ওপর কি নির্মম প্রতিশোধ নেবে, এটা একটু চিন্তা কর, ভেবে দেখো।
তখন আমি আমার হাত গুটিয়ে নিলাম। এরপর আমি গভীরভাবে চিন্তা করলাম, নানাভাবে বিষয়টাকে বোঝার চেষ্টা করলাম। বুঝতে পারলাম, আমি কোন অন্যায় কাজ করছি না। এজন্যই হয়তো আমার বিবেক আমাকে সঠিক সময়ে সঠিক দিশা দিচ্ছে। হয়তো বা তাতে মহান প্রভুর ইঙ্গিত আছে। তখন হঠাৎ আমার মনে পড়লো, আরে, আমি তো তোমাকে আসতে বলে রেখেছিলাম। তখনই ভেবে রেখেছিলাম, এ ব্যাপারে তোমার সাথে আলাপ করে কিছু একটা করবো।…
ইরতেগীন! গযনীর আর কোন মেয়েকে যেন ডাকাতদের রক্ষিতা হতে না হয়, সে চেষ্টাটা তো আমরা করে দেখতে পারি। সুলতান মাহমূদ কোন ডাকাত কিংবা লুটেরা নন। আমি হজ্জ কাফেলার সাথে আসা মেয়েদের ইজ্জত বাঁচিয়ে নিজের কাফফারা আদায় করতে চাই।
তুমি কি আমাকে দিয়ে হাম্মাদ বিন আলীকে হত্যা করাতে চাও?
না, জবাব দিল সাবিলা। এই একজনকে হত্যা করে তেমন কিছু অর্জিত হবে না। হাম্মাদ মারা গেলেও এই ডাকাতেরা গযনীর হজ্জ কাফেলা লুট করবে।
আমি চিন্তা করেছি, যে করেই হোক তুমি এখান থেকে চলে যাবে। আমি এখানেই থাকবো। আমিও যদি তোমার সাথে চলে চাই, তাহলে এরা আমাদের পিছু ধাওয়া করবে। তুমি পুরুষ। দ্রুত ঘোড়া চালাতে পারবে, সফরের কষ্টও ক্লান্তি সহ্য করতে পারবে। আমি হয়তো ততোটা পারবো না। তখন আমি হয়ে যাবো তোমার জন্যে একটা বোঝ। পালানোর গতি যদি শথ হয়ে যায় তাহলে আমরা উভয়েই ধরা পড়বে।
আমি একা পালালেও এরা পিছু ধাওয়া করতে পারে। বললো ইরতেগীন। কারণ, আমি একাকী চলে গেলেও তাদের এই আশঙ্কা হবে যে, আমি গযনী গিয়ে সুলতান মাহমুদকে কাফেলা লুটের খবর দিয়ে দেবো। তখন হয়তো তিনি কাফেলার সাথে সেনাবাহিনীর দু’একটি ইউনিট পাঠিয়ে দেবেন।
এই আশঙ্কা হয়তো আছে। তবুও তোমাকে যেতে হবে। বললো সাবিলা। ঝুঁকি তো আমাদের নিতেই হবে।…
তুমি যে ভয় পাচ্ছ তা সঠিক। চিন্তা করো, তোমার কোন মেয়ে নেই, তোমার কোন বোন নেই। আজ যদি আমি তোমার বোন হতাম তাহলে আমার জন্যে তো তুমি জীবন দিয়ে দিতে।
ইরতেগীন! গযনীর প্রতিটি মেয়েই তোমার বোন, তোমার মা। আমি জানি গযনীর মাটি তোমাকে কিছুই দেয়নি। সেখানে তোমাকে গোলাম মনে করা হতো। আমি বুঝি যে দেশের শাসক তার প্রজাদের ভুখা নাঙা রাখে। এবং আল্লাহর দেয়া অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখে, সে দেশের মানুষের মন থেকে দেশের প্রেম ও ধর্মের ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়। সেখানে ভাই ভাইয়ের শত্রুতে পরিণত হয়।…
আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, তুমি যদি সুলতান মাহমূদ পর্যন্ত পৌঁছতে পারো, আর তার কাছে বলো যে, আমি গোলাম ছিলাম, তাহলে তিনি তোমাকে বুকে জড়িয়ে নেবেন। এরপর আর তোমাকে গোলাম থাকতে হবে না। তুমি সুলতানের কাছে এবং আল্লাহর কাছে সম্মানিত মানুষ বিবেচিত হবে।
নিজের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলো ইরতেগীন! নিজ দেশ ও ধর্মের মেয়েরা সেই দেশের সম্ভ্রম। সেই জাতি ধ্বংস ও বেইজ্জতির শিকার হয় যারা তাদের মেয়েদের ইজ্জতের মর্যাদা দেয় না।
আমি তোমার একটা কথা বুঝতে পারছি না। ইরতেগীন বললো। আমার মধ্যে তো এর আগে কেউ দেশ প্রেম জাগিয়ে তুলেনি। আমার এসবের কি প্রয়োজন? আমি তো শ্রমের বিনিময়ে এই লুটেরাদের কাছে থেকেও ভালো বোধ করছি। এখন তুমি যা বলছে, তা করতে আমি অস্বীকারও করছি না। কারণ তুমি মজলুম হওয়ার পর এখনও তোমার ঈমান মজবুত রয়েছে। আমি আগেই বলেছি, তোমার উপকারের প্রতিদান আমি অবশ্যই দেবো। এখন বলো, আমাকে কি করতে হবে?
এখান থেকে এভাবে তুমি পালিয়ে যাবে, যাতে কেউ টেরই না পায়। গযনীর পথ তো তুমি চেনো। আশা করি পনেরো বিশ দিনের মধ্যে তুমি গফনী পৌঁছে যেতে পারবে।
তুমি পৌঁছার আগেই যদি গযনীর হজ্জ কাফেলা রওয়ানা হয়ে যায় তবে তাদের ফেরাবে এবং কাফেলার দায়িত্বশীলদেরকে যথা সম্ভব বোঝাতে চেষ্টা করবে সামনে তাদের কি বিপদ অপেক্ষা করছে।
তাদেরকে বলবে, তুমি সুলতানের কাছে যাচ্ছে। তুমি গিয়ে যদি কাফেলাকে গযনীতেই পাও, তাহলে সরাসরি সুলতান মাহমূদের কাছে চলে যাবে।
