আমি কি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে পালিয়ে যাবো? জানতে চাইলে ইরতেগীন। এটা কিন্তু সহজ ব্যাপার নয়!
না, পালানোর ব্যাপার নয়। আমি এখান থেকে পালাতে চাই না। কিন্তু তোমাকে পালাতে হবে…।
শোন ইরতেগীন! তুমি যখন আমার স্বামীর গোলাম ছিলে, তুমি জানো তখন তোমার সাথে আমার কি সম্পর্ক ছিলো? তোমার হয়তো মনে আছে, একবার আমার স্বামী তোমাকে কোথাও পাঠাতে চাচ্ছিল, তখন তুমি ছিলে খুবই অসুস্থ। কিন্তু আমার স্বামী বলছিল পথের মধ্যে তুমি মারা গেলেও তোমাকে যেতে হবে। তখন আমি তোমাকে এই দুর্দশা থেকে রক্ষা করেছিলাম।
এজন্য আমার স্বামীর সাথে আমাকে লড়াই করতে হয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, যে লোকটি অসুখের কারণে উঠে দাঁড়াতে পারে না, তাকে তুমি কিভাবে এমন কষ্টকর দীর্ঘ সফরে পাঠাচ্ছো। সেদিন আমি তোমাকে পাঠাতে বাধা দিয়ে বাড়িতে রেখে ডাক্তার ডেকে তোমার চিকিৎসা করিয়েছিলাম। তুমি জানো না, তোমার প্রতি এই মানবিক মমতা দেখানোর কারণে আমার স্বামীর কাছে আমাকে কতো কটু কথা শুনতে হয়েছে।
সবই আমার মনে আছে সাবিলা! মুনিব এজন্য আমাকেও অনেক গালমন্দ করেছিল। সে তো আমাকে এতটুকু পর্যন্ত বলেছিল, তোর আর সাবিলার মধ্যে এমন মাখামাখি যেন আর কখনো দেখা না যায়। যদি দ্বিতীয়বার এমনটি ঘটে তবে তুই ভালো করেই জানিস গোলামের শাস্তি ও পরিণতি কি ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে…।
ওই সময়ের চেয়ে এই ডাকাতদের সাথে আমি বেশ ভালো আছি সাবিলা! এখানে আর কিছু না পাই, অন্ততঃ আমাকে কেউ গোলাম বলে তাচ্ছিল্য করে না।
তবে তুমি যদি ভীষণ কোন কষ্টে থেকে থাকো, তোমার উপকারের প্রতিদান দিতে আমি জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবো না সাবিলা!
এরপর দীর্ঘ সময় ইরতেগীনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রইলো সাবিলা। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে ইরতেগীনের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছিল সে। মরুভূমির সেই রাতটি ছিল নীরব নিস্তব্ধ। মনে হচ্ছিল তাঁবুর পল্লী যেন প্রাণহীন মূর্তির পল্পী। সেই রাতে মরুর শিয়ালগুলোও যেন ডাকতে ভুলে গিয়েছিল, ঘুমিয়ে পড়েছিল শিয়ালের পাল। কিন্তু সাবিলার বুকের মধ্যে বারবার জেগে উঠছিল কৈশোরের ঈমানের স্ফুলিঙ্গ।
কী ব্যাপার! নীরব হয়ে গেলে কেন সাবিলা? বলল কি বলতে চাও। এই গোলামকে একবার পরীক্ষা করে দেখো। বললো ইরতেগীন।
ভাবছি, তুমি আমার কথার আসল অর্থ বুঝবে কি না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো সাবিলা। যাক, তবুও বলছি। শোন…। আমি নিজের জন্যে তোমার কাছে কিছুই চাই না। তোমার কাছে কোন প্রতিদানও প্রত্যাশা করি না। তুমি কি হাম্মাদ বিন আলীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলে, যে কথাগুলো সে বেদুঈন সর্দারদের বলছিলো? সে গয়নীর হজ্জ কাফেলা লুটে নিতে চায়।
তুমি কি তা রুখতে পারবে? বিস্মিত কণ্ঠে বললো ইরতেগীন। এখনো কি মন থেকে গযনীর মায়া দূর করতে পারোনি?
গযনীর স্মৃতি আমি মন থেকে বিদায় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু গঘনীর সম্ভ্রম আমি মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি। হাম্মাদ গযনীর হজ্জ কাফেলা লুটে নেয়ার কথা বলছিল, তাতে আমার মনে কোন আঘাত লাগেনি। কিন্তু সে যখন আমার মাথায় হাত রেখে বললো
এ হলো গযনীর সুন্দরী মেয়েদের নমুনা। ঐ কাফেলা লুটতে পারলে একে তোমরা পাবে। আর এর মতো অনেক সুন্দরী সেই কাফেলায় থাকবে, যেগুলো তোমাদেরকে উপহার স্বরূপ দেয়া হবে; তখন আমার শরীর কেঁপে উঠলো। যেন প্রচণ্ড হিম শীতল কোন বাতাস আমার শরীরের শিরায় শিরায় ঢুকে গেছে। কিংবা হঠাৎ জমিন কেঁপে উঠেছে।
তখন আমার মুজাহিদ বাবার চেহারা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তার সেইসব কথা আমার কানে বাজতে লাগলো, যেসব কথা তিনি আমাকে বারবার বলেছেন। কিন্তু আমি অবলা নারী। আমি অসহায়। তবুও হাম্মাদের কথার তীরে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটছে। অসহায়ের মতো আমি শুধুই ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থেকেছি। কিছুই করার ছিল না আমার।
ও আচ্ছা! তার কথায় ক্ষেপে গিয়েই হয়তো তখন তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে?
হ্যাঁ, এজন্যই তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম। কারণ, আমার বুকে তখন প্রতিশোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। আর তখন আল্লাহ ছাড়া আমার পাশে কেউ ছিল না। কিন্তু তোমার চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছিল, হাম্মাদের কথায় তোমার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়াই হয়নি। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একান্তে তোমাকে ডাকবো এবং তোমার মধ্যেও গযনীর সম্ভ্রম ও মর্যাদার আগুন জ্বেলে দেবো, যে গযনী তোমার মতো বীর যুবককে জন্ম। দিয়েছে।…
আমি এটাও ভেবেছি, আমি নিতান্তই এক অসহায় মেয়ে। ডাকাতদের এই পল্পীতে ডাকাত সর্দারের আমি কিছুই বিগড়াতে পারবো না। একথা ভেবে আমি যন্ত্রণাটা সামলে নেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাম্মাদ তাঁবুতে গিয়েই আমার দিকে চরম আসক্তি নিয়ে তার নোংরা হাত বাড়ালো এবং আমাকে কাছে টেনে নিল। আমি যখন তার শরীরের উষ্ণতা অনুভব, করলাম, তখন আমার মধ্যে আবার সেই আগুন জ্বলে উঠলো।
ইরতেগীন এতোটাই নীরব ছিলো যেন সে কোন কিছুই শুনছিলো না। তাই তাকে পরখ করার জন্যে সাবিলা জিজ্ঞেস করলো আমার কথা শুনতে পাচ্ছে ইরতেগীন
হ্যাঁ, হা, মনোযোগ দিয়েই তোমার কথা শুনছি সাবিলা! বুঝতে পারছি তোমার প্রতিশোধের আগুন এখন অনিয়ন্ত্রিত এবং তোমাকে সেটা ক্রমেই অস্থির করে তুলেছে।
