এদিক সেদিক সতর্ক চোখ রেখে একটি খেজুর ঝোঁপের মধ্যে গিয়ে সাবিলাকে একটু শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো ইরতেগীন।
কী ব্যাপার সাবিলা? এমন কি জরুরি কথা আছে, যেটা তুমি দিনের বেলায় তোমার তাঁবুতে ডেকে বলতে পারলে না, রাতের বেলায় এখানে নিয়ে এসেছো সে কথা বলতে
দেখো ইরতেগীন! আমি তোমাকে আমার মৃত স্বামীর গোলাম মনে করে সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে এখানে ডাকিনি। তুমি নিজেকে আমার গোলাম মনে করো না এবং হাম্মাদ বিন আলীরও গোলাম মনে করো না। বললো সাবিলা।
আমি তোমার ভিতরের গোলামীর জিঞ্জির ছিঁড়ে এক স্বাধীন সক্ষম পুরুষকে জাগাতে এসেছি। আমি তোমার মধ্যে এমন মানুষকে জাগাতে এসেছি যে মানুষ কারো গোলামী করে না, যে শুধু আল্লাহর গোলামী করে। যে মানুষ নিজের দেশ ও ধর্মের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়।
এসব কি বলছে সাবিলা? ম্লান হেসে ইরতেগীন বললো- মনে হচ্ছে তুমি স্বপ্ন দেখছো, ঘুমের ঘোরে কথা বলছে।
না না, আমি কোন স্বপ্ন দেখছি না ইরতেগীন! আমি ঘুমের ঘোরেও কথা বলছি না। আমি একথাই তোমাকে বলতে এসেছি, আমি জেগে উঠেছি। আমি এখন ডাকাত সর্দারের রক্ষিতা নই। আমি এখন গযনীর সেই শহীদ সৈনিকের মেয়ে সাবিলা। যার পিতা জিহাদে শাহাদত বরণ করেছে। কিন্তু এতোদিন সেই সাবিলা মরে গিয়েছিল। কারণ, আমার বাবার শাহাদতের পর আমার মা যখন এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেছিল। সেই অর্থলোভী লোকটি আমার যৌবনের শুরুতেই টাকার লোভে তোমার মালিকের কাছে বিয়ের নামে আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিল। তোমার মুনীবের কাছে বিক্রি হওয়াটাকে জীবনের নিয়তি ভেবে আমি আমার আশৈশব লালিত নারীর সত্তাকে গলাটিপে মেরে ফেলেছিলাম।
অবলা নারী আর গোলামের বিধিলিপি এমনই হয়ে থাকে। বললো ইরতেগীন।
তুমি যেমন তোমার দুর্ভাগ্য দেখেছো। আমিও আমার ভাগ্যের নির্মম পরিণতি সহ্য করেছি। কিন্তু এ নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। কারণ, গোলাম হিসেবেই আমার জন্ম হয়েছিল। বেদুঈন গোত্রের সাথে এখানে ওখানে যাযাবর অবস্থাই আমি বড় হয়েছি আর এক হাত থেকে অন্যের হাতে বিক্রি হয়েছি।
অবশ্য আমি একবার শুনেছিলাম, ইসলাম কোন মানুষকে গোলাম বানিয়ে রাখার অনুমতি দেয় না। একথা শুনে আমি হেসে ছিলাম। কারণ, মুসলমান আমীর উমারারাই তো মানুষকে গোলাম বানিয়ে রাখে।
এরা ভোগবিলাসে মত্ত অবাধ্য মুসলমান। বললো সাবিলা। ইসলামের দৃষ্টিতে কাউকে গোলাম বানিয়ে রাখা মস্তবড় অপরাধ। তোমার মুনিবের সাথে আমার বিয়েটাও ছিল এমনই একটা অপরাধ। প্রকৃত পক্ষে এটা বিয়ে ছিলো না। রীতিমতো একটা লেনদেন। পয়সার বিনিময়ে সৎপিতা নামের ওই অসৎ লোকটা আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিল। প্রথমে এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। সব সময় আমার মন উদাস থাকতো। কিন্তু একপর্যায়ে নারীর ভাগ্য এমনই হয় ভেবে সব মেনে নিলাম। নিজেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে নিলাম। সয়ে নিলাম সবকিছু। নিজের সুখ স্বপ্ন সোহাগ আহ্লাদকে নিজ হাতে দাফন করে হাসি খুশী থাকতে এবং যা ভাগ্যে জুটেছে তাই নিয়ে সুখী হতে চেষ্টা করলাম। তখন হয়তো কখনো আমাকে হাসতে দেখেছো তুমি। কিন্তু এটা আমার স্বতস্ফূর্ত হাসি ছিলো না। এটা ছিলো দামী অলঙ্কার ও দামী কাপড়ে মোড়ানো কৃত্রিম হাসি। আমার এই বিক্রি হওয়ার মূলে ছিল আমার যৌবন আর রূপ। সেই বণিক টাকা দিয়ে আমার শরীরটা কিনে নিয়েছিল। কিন্তু আমার শরীরটা দামী কাপড় ও অলঙ্কারে মোড়ানো থাকলেও অন্তরটা দিন রাত গুমড়ে কাঁদতো।
ঠিক বলেছো। তোমার মতো মেয়ের বিয়ে তোমার মতোই কোনো সুন্দর যুবকের সঙ্গে হওয়া উচিত ছিলো। বললো ইরতেগীন।
এখন আমি আমার এই মন্দ নিয়তি আর অসম বিয়ের কান্না কাঁদছি না ইতেগীন! আমার বাবা বেঁচে থাকাবস্থায় কখনো আমি বিয়ে করবো এমনটি চিন্তাও করিনি। কারণ বাবা আমার মনে একটাই চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, আমি একজন মুসলমান। আমাকে জীবন ও সম্পদের লোভ ত্যাগ করে কুফর খতম করতে হবে। কখনো কখনো আমার মনে হতো, হিন্দুস্তানের মূর্তিগুলো যেন আমাকে হুমকি দিচ্ছে। কারণ, আমার বাবা দু’বার হিন্দুস্তান গিয়েছিলেন। তিনি হিন্দুস্তানের বহু মন্দিরের ধ্বংসযজ্ঞ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বিজিত মন্দিরে মুসলমানদের আযানও শুনেছেন। আমার বাবা সেই সব মুজাহিদদের একজন যাদের জীবন রণাঙ্গণেই বেশি কেটেছে। সেই বাবার রক্ত আমার দেহে প্রবাহিত ইরতেগীন!
সাবিলা! তুমি কি ভুলে গেছো আমরা কোথায় বসে এসব কথা বলছি। কেউ যদি দেখে ফেলে আর হাম্মাদকে জানিয়ে দেয় তবে হাম্মাদ আমাদেরকে হাত-পা বেধে মরুভূমিতে ফেলে রাখবে। মরুভূমির মৃত্যুর কষ্ট যে কী তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না, সাবিলা!
আমাকে আগে এ কথাটি বলো, আজ রাতে তোমার এই অতীতের কাহিনী আমাকে কেন শোনাচ্ছো? তুমি যদি নিজের স্বাধীন সত্তাকে মেরেই ফেলে থাকো তবে আবার জাগিয়ে তুলছো কেন? যে শিকল এখন তোমার গলায় লেগেছে, তা আর ছেঁড়া সম্ভব নয়। আমি তো দেখছি তুমি বেশ সুখেই। আছো
হ্যাঁ, ইরতেগীন। এখানে আমি বেশ সুখেই ছিলাম। আমি যদি শুধু হাড়মাংসের অনুভূতিহীন পুতুল হতাম তাহলে এ নিয়ে আমার সুখী না থাকার কোন কারণ থাকতো না। কিন্তু আজ রাতে আমার পুতুল সর্ব জীবন চাপা পড়ে আমার ভেতরে আবার সেই কৈশোরের স্বাধীনসত্তা জেগে উঠেছে। এক ডাকাত সর্দারের রক্ষিতার স্থলে আগের সেই বীর মুজাহিদ কন্যার সত্তা ফিরে এসেছে। যার কারণে আমি তোমাকেও জাগাতে এসেছি, কারণ তোমার সাহায্য ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই।
