কাফেলার লোকজন হতাশ হয়ে পড়েছিল। বহু ডাকাতের সাথে একা ইরতেগীন মোকাবেলা করছিল। শেষ পর্যন্ত ইরতেগীনকে কাবু করতে না পেরে ডাকাতেরা তার গোড়াকে আহত করে বেকার করে তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে বন্দী করে ফেললো। ডাকাত দল কাফেলার সমস্ত মালপত্র কেড়ে নিল। সেই সাথে তারা হাতিয়ে নিলো অমূল্য দু’জন মানবসম্পদ। তন্মধ্যে একজন ইরতেগীন আর অপরজন সবিলা।
নিজের অস্বাভাবিক সৌন্দর্যই ছিল সবিলার জন্যে সবেচেয়ে বেশী দুর্ভাগ্যের কারণ। সে ছিল অবলা নারী। শত কান্নাকাটি করেও মুক্তি পেলো না। ডাকাতরা তাকে নিয়ে গেলো। আর ইরতেগীনকে হাতে পায়ে রশি দিয়ে বেধে ঘোড়ার পিঠে ফেলে দিল। তবুও সে বারবার ডাকাতদের হুকমি দিচ্ছিল, “তোমরা কাপুরুষের মতো আমাকে এভাবে না বেধে দু’জন দু’জন করে আমার মোকাবেলায় এসো। যদি আমি টিকতে না পারি তবে নিয়ে যেয়ো।” কিন্তু ডাকাতরা সর্দারের কথায় ইরতেগীনকে মোকাবেলার সুযোগ না দিয়ে কয়েকজন মিলে ঝাঁপটে ধরে তাকে বেধে ফেলতে সক্ষম হলো। ফলে ইরতেগীনের আর করার কিছুই রইলো না।
কয়েক দিনের সফরের পর ইরতেগীন ও সবিলাকে হাম্মাদ বিন আলীর সামনে পেশ করা হলো। এই ডাকাত দলটি ছিল হাম্মাদের নিয়ন্ত্রিত। সবিলা তো কোন কথাই বলতে পারছিল না। কিন্তু ইরতেগীন হাম্মাদকেও হুমকি দিচ্ছিল।
কিন্তু হাম্মাদ ছিল কথার যাদুকর। নানা কথায় অল্প সময়ের মধ্যেই সে ইরতেগীনের ক্ষোভকে প্রশমিত করে তাকে শান্ত করে ফেলল। স্বাভাবিক হলে নানা কথাবার্তায় ও নিজের পরিচয় দিয়ে ইরতেগীন যখন জানাল সে ছিল গোলাম। এ পর্যন্ত সে তিন মুনীবের হাত বদল হয়েছে। এ কথা শুনে হাম্মাদ তাকে সস্নেহে কাছে বসালো এবং বললো
“আজ থেকে তুমি কারো গোলাম নও। এখানে তুমি বাদশা। তুমি একজন সুলতান। তোমার উপর কেউ খবরদারি করবে না। আমি আমার লোকদের কাছে শুনেছি সবাই মিলেও নাকি তোমাকে বশে আনতে তাদের ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তখনই আমি তোমাকে আমার একান্ত দেহরক্ষী হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি ছাড়া তোমার মর্যাদা আর কেউ দিতে পারবে না।”
“তুমি কি আমাকে তোমার মতোই ডাকাত বানাতে চাও?” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানতে চাইলো ইরতেগীন।
“তুমি কি গোলাম থাকাই পছন্দ করো? স্বাধীন জীবনের স্বাদ নেয়ার ইচ্ছা কি তোমার কাছে পছন্দ নয়?” উল্টো প্রশ্ন করলো হাম্মাদ।
অনেক কথার পর হাম্মাদ শেষ পর্যন্ত ইরতেগীনকে সম্মত করালো সে হাম্মাদের একান্ত দেহরক্ষী হয়ে তার সাথে স্বাধীন ভাবে থাকবে।
হাম্মাদ যখন জানতে পারলো, ইরতেগীন ছিল সবিলার স্বামীর দেহরক্ষী যে মেয়েকে তার দল অপহরণ করেছে। তখন সে সবিলাকে বললো
“তুমি যদি আমার কাছে রাণীর মর্যাদায় থাকতে চাও, তবে তোমার স্বামীর দেহরক্ষীকে আমার সাথে থাকতে রাজী করাও। নয়তো তোমাদের উভয়ের পরিণাম খুব খারাপ হবে।”
“একথা শুনে সবিলা ইরতেগীনকে আলাদা জায়গায় নিয়ে বললো “আমার দিকে তাকিয়ে তুমি এদের সাথেই থাক। সবিলা তাকে আরো জানালো, হাম্মাদ এ প্রশ্নে তাকে কি হুমকি দিয়েছে। ইরতেগীন হাম্মাদের যাদুকরী কথায় মুগ্ধ হয়েই তার সাথে থাকতে সম্মত হয়েছিল। সবিলার করুণ মিনতি ও তার চোখের অশ্রু ইরতেগীনকে হাম্মাদের সাথে থাকতে বাধ্য করলো। তার এ ইচ্ছা আরো দৃঢ় হলো।
হাম্মাদ পরদিনই ইরতেগীনকে একটি তাজী ঘোড়া উপহার দিল এবং সবিলাকে রক্ষিতা হিসেবে নিজের কাছে রাখল। আর ইরতেগীনকে বললো, তোমার ডাকাতি করতে হবে না। তুমি সব সময় আমার সাথে আমার একান্ত প্রহরী হিসেবে থাকবে।
কিছু দিনের মধ্যেই এরা ডাকাত দলের রীতিনীতির সাথে মিশে গেল। ইরতেগীন যেহেতু হাম্মাদের একান্ত দেহরক্ষী ছিল এজন্য তাকে ডাকাতিতে শরীক হতে হতো না।
সে সময়কার অধিকাংশ আরব বেদুঈন জনগোষ্ঠী ছিল হিংস্র ও লড়াকু। এরা নিজ গোত্রের গোত্রপতিকে ছাড়া পৃথিবীর আর কারো কোন হুকুমের পরওয়া করতো না। কিন্তু হাম্মাদ বিন আলীকে সব বেদুঈনই মানতে এবং সম্মান করতো। এরা তাকে মুকুটহীন বাদশা মনে করতো। কারণ তকালীন খলীফা এবং খলীফার যেসব কর্মকর্তা হাম্মাদকে গ্রেফতার করে এই দুর্ধর্ষ ডাকাত দলকে নির্মূল করে দিতে পারতো, হাম্মাদ তাদের সবাইকে এবং বিশেষ করে খলীফাকে তার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী বানিয়ে নিয়েছিলো। ফলে নির্বিঘ্নে এসব ডাকাত বেদুঈন গোষ্ঠী রাহাজনীও লুটতরাজে লিপ্ত থাকতে পেরেছিল। খলীফার কাছে হাম্মাদকে উপস্থাপন করা হয়েছিল একজন খ্যাতিমান বেদুঈন ব্যবসায়ী হিসেবে। আরো বলা হয়েছিল, হাম্মাদ সকল বেদুঈন জনগোষ্ঠীকে তার অনুগত বানিয়ে ফেলেছে, যেসব লোক বাগদাদের খেলাফতের শাসনকেও স্বীকার করতে নারাজ।
এভাবেই যেতে লাগল সবিলার দিন। সবিলাকে এক অর্থে হাম্মাদ রাজরাণী বানিয়ে দিল। আর ইরতেগীনকেও যথার্থ অর্থেই স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করার সুযোগ দিল। দিনে দিনে তারা উভয়েই সন্ত্রাসী ও বেদুঈন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। সবিলা ও ইরতেগীনের মধ্যে প্রতিদিনই দেখা হতো। তাদের মধ্যে সম্পর্কের বড় উপাদান ছিল তারা উভয়েই অপহৃত হয়ে বেদুঈন সর্দারের হাতে নীত হয়েছিল। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তারা উভয়েই ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিল।
.
রাতের অন্ধকারে অতি সন্তর্পণে সাবিলা ইরতেগীনের সাথে সাক্ষাত করতে এলো। তাদের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম সাক্ষাত। গোপন সাক্ষাতের প্রস্তাবে ভাবনায় পড়ে গেলো ইতেগীন। সাবিলা তাকে কেন রাতের বেলায় একান্তে সাক্ষাত করতে বললো? সে কি তার মুনিবের সাথে বেঈমানী করতে চায়? সে কি কোন অভিসারের জন্যে ইতেগীনকে সম্মত করাতে চায়?
