নিঘুম সবিলা বিছানা ছেড়ে উঠে তাঁবুর পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। কিছুই দেখা গেলো না। জন মানুষের কোন সাড়া শব্দ নেই। কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার এসে শুয়ে পড়লো সবিলা। কিছুক্ষণ পর আবার বিছানা ছেড়ে উঠলো সবিলা। এক অসহনীয় অস্থিরতা তার বুকে। কোন মতেই সেটা তাকে ঘুমাতে দিচ্ছিল না। আবার তাঁবুর পর্দা ফাঁক করে বাইরের দিকে তাকাল সে। বাইরের দিকে তাকাতেই আড়াআড়িভাবে থাকা দুটি খেজুর গাছের ফাঁকে তার দৃষ্টি আটকে গেল। রাত অন্ধকার, কিন্তু তারা ভরা আকাশ। কিছুটা তারার আলো যেন অন্ধকার রাতের মধ্যে আলোর আভাস ছড়িয়েছে। সবিলা হঠাৎ দেখতে পেলো একটা ছায়া মূর্তি। তার দৃষ্টি একটি জোড়া খেজুর গাছের মধ্যে এসে স্থির হয়ে গেছে। সবিলার বুঝতে বাকি রইলো না এই তার কাঙিক্ষত আগন্তুক। সে একটি পুরুষের আলখেল্লা গায়ে জড়িয়ে খুব সন্তর্পণে তাঁবুর বাইরে বের হয়ে খেজুর বৃক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।
সবিলা অগ্রসর হলে আগন্তুক ছায়া মূর্তিটি খেজুর গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ঘন খেজুরবীথির দিকে অগ্রসর হলো। কিছুক্ষণ পর ঘন খেজুরবীথির মধ্যে মিলিত হলো দু’জন। ছায়ামূর্তিটি আর কেউ নয় সবিলার অতি পরিচিত তার কথিত স্বামীর দেহরক্ষী ইরতেগীন।
রাতের বেলা যখন বেদুঈন গোত্রপতিদের মদের আসর শেষ হলো তখন সুযোগ বুঝে এক ফাঁকে সবিলা ইরতেগীনকে বলেছিল, “আজ রাতে তুমি পানির ধারের জোড়া খেজুর গাছটার কাছে এসো। তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে।”
ইরতেগীন ও সবিলার মধ্যে গোপনে সাক্ষাতের মতো কোন সম্পর্ক ছিলো না। এমন সম্ভাবনাও ছিল না তাদের মধ্যে। সম্পর্ক বলতে শুধু এতটুকু তারা একজন অপরজনকে দেখলে মুচকি হাসতো। তাছাড়া এক সময় উভয়েই ছিল একই মালিকের মালিকানাধীন ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী। এই লুটেরা জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের কারো দূরতম কোন সম্পর্ক বা পরিচয় ছিল না। এরা দু’জনকে একই কাফেলা থেকে অপহরণ করে এনেছিল এই ডাকাত গোষ্ঠী।
সবিলা ছিল গযনী সেনাবাহিনীর উট ইউনিটের এক সৈনিকের মেয়ে। তার বাবা সেনাবাহিনীর শুধু একজন উট চালকই ছিলো না, সে ছিল সুলতান মাহমূদের একজন গুণমুগ্ধ সিপাহী। এই সৈনিক সুলতান মাহমূদের সাথে দুইবার হিন্দুস্তান অভিযানে গিয়েছিল। সে যেমন ছিল ধার্মিক তেমনই ছিল দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্যে উৎসর্গিত প্রাণ। সন্তানদেরকে সে সব সময় বলতো, ইসলামই একমাত্র সত্য ধর্ম। ইসলামকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য। তার বাবা তাদেরকে সময়ে সময়ে যুদ্ধ ও জিহাদের নানা গল্প শোনাতো। ছোটবেলা থেকে শোনা এ গল্পের চেতনা সবিলার রক্তে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সবিলার তেরো বছর বয়সেই তার পিতৃবিয়োগ ঘটে। সেনাবাহিনীর উটর পরিচালক ইউনিটের সৈনিক সবিলার পিতা এক যুদ্ধে নিহত হয়। মৃত্যুর পর সবিলার মা তার স্বামীর জানা শোনা এক ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সবিলার সৎ পিতার আগের সন্তান ছিলো। তাদেরকেই সে আদর স্নেহ করতো, সবিলা ও তার ছোট এতীম দুই ভাইয়ের ভাগ্যে আর তেমন আদর স্নেহ জুটেনি। তার মায়ের পক্ষেও তাদের প্রতি যথার্থ যত্ন নেয়ার অবকাশ ছিলো না। কারণ এই নতুন স্বামীর সাথে বিয়ে হওয়ার পর আবারো সবিলার মায়ের দুটি বাচ্চা হয়। এদের এবং সবিলার বৈপিত্রেয় সন্তানদের নিয়েই সবিলার মাকে ব্যস্ত থাকতে হতো।
সবিলার বয়স যখন ষোল সতেরো তখন তার সৎপিতা বয়স্ক এক লোকের সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। সবিলা ছাড়াও এ লোকের আরো দুজন স্ত্রী ছিল।
সবিলার এই স্বামী ছিল বিত্তবান সম্মানী লোক। সে অবাধে মদ্যপন করতো। ইরতেগীন ছিল সবিলার স্বামীর কেনা গোলাম।
সবিলাকে তার সৎ বাবা এই বয়স্ক লোকটির সাথে বিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের পণ নিয়েছিলো। আসলে এটা বিয়ে ছিলো না ছিল এক প্রকার বিক্রি।
ইরতেগীন ছিল তুর্কি বংশজাত। শৈশব থেকেই গোলামীর শেকলে বাধা তার জীবন। যৌবনে পদার্পণ করার সাথে সাথে ইরতেগীনের দেহের অঙ্গ সৌষ্ঠব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যৌবনের দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। তার তখনকার মালিক ইরতেগীনের সুঠাম দেহসৌষ্ঠবে মুগ্ধ হয়ে তাকে অশ্বারোহণ, তীরন্দাজী ও তরবারী চালনা শিখিয়ে ইরতেগীনকে তার দেহরক্ষীতে রূপান্তরিত করে। সেই যুগে কারো সাথে একজন দেহরক্ষী রাখাটা বিরাট মর্যাদা ও সম্মানের বিষয় ছিল।
সেই মুনীবের মৃত্যুর পর তাকে আরেক ধনী ব্যক্তি কিনে নেয়। সেই লোক কয়েক বছর পর এক ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করে এবং মেয়ের বিনিময়ে ইরতেগীনকে ব্যবসায়ীর হাতে দিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এই লোকও ইরতেগীনকে বিক্রি করে দেয় । শেষ বার তাকে খরিদ করে সবিলার কথিত ধনী স্বামী। সবিলার স্বামীর একান্ত দেহরক্ষী ও সেবক হিসেবে যতটুকু সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক ইরতেগীনের সাথে সবিলার এতটুকুই পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল।
প্রায় বছর খানে আগে সবিলার স্বামী সবিলাকে সহ একটি সফরে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গোটা কাফেলাকেই ডাকাতদল ঘিরে ফেলে। কাফেলার লোকেরা প্রথমে মোকাবেলা করলো বটে কিন্তু তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতিয়ার ফেলে দিতে বাধ্য হলো। কিন্তু এই দলের মধ্যে একমাত্র ইরতেগীন তখনো একাকী লড়ে যাচ্ছিল। সে তার ঘোড়াকে জায়গা বদল করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মোকাবেলা করে যাচ্ছিল। ডাকাতদলের লোকেরা তাকে বশে আনতে পারছিল না। এই অবস্থা দেখে ডাকাত দলের সর্দার ঘোষণা করলো ওকে হত্যা না করে জীবিত পাকড়াও করে আনো।
