সেই রাতে তার পাশে যারা বসেছিল তারা ছিল বিভিন্ন আরব বেদুঈন স্বাধীন গোত্রগুলোর সর্দার। যারা কোন খলীফার শাসন মানতো না। তাদের উপর কারো কোন হুকুম চলতো না। তাদের চেহারা ছবিই বলে দিচ্ছিল তারা কোন আইন কানুনের ধার ধারে না এবং তারা আল্লাহ রাসূলকেও ভয় করে না । বেদুঈনদের এই সমাবেশে সুন্দরী এই তরুণীদের মনে হচ্ছিল এরা অন্য কোন জগতের বাসিন্দা।
হাম্মাদ বিন আলীর এ রাত এভাবেই ভোগ বিলাসিতা আর শরাব পানের মধ্যে কেটে গেল। সকাল বেলা যখন সূর্য উঁকি দিল, তখন সব লোক সবুজ বৃক্ষের ছায়ায় টাঙানো তাঁবুতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। মরুভূমিতে আগুন জ্বালিয়ে সূর্য যখন ডুবে গেল তখন তারা সবাই জেগে উঠলো এবং গত রাতের মতো আজো সেই আসরে গিয়ে জমায়েত হলো। কিন্তু পরের রাতে আর নর্তকী ছিলো না। অবশ্য শরাব পানকারিণীরা যথারীতি উপস্থিত ছিল।
“বন্ধুগণ!” বেদুঈন সর্দারের উদ্দেশ্যে হাম্মাদ বিন আলী বললো, হজ্জ কাফেলার যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। দূরের লোকজন এরই মধ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। এবার বিরাট বড় এক শিকার আসছে। এই শিকার হলো গযনীর হজ্জ কাফেলা। এই কাফেলার সাথে গযনী বাহিনীর অর্জিত হিন্দুস্তানের গযনীমতের ধন-সম্পদ আসছে। তোমরা এর আগেও গযনীর কাফেলা লুটেছে। কিন্তু তেমন কোন সম্পদ পাওনি। আমি খবর পেয়েছি এ বছর যে কাফেলা আসছে এটা লুট করতে পারলে তোমাদের সারা জীবনের কামাই হয়ে যাবে। কিন্তু এই কাফেলায় হাত দেয়া সহজ ব্যাপার নয়। কাফেলায় কমপক্ষে হাজার দেড়েক লোক থাকবে, সবাই থাকবে অস্ত্রসজ্জিত। তাছাড়া তাদের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনীর লোকজনও থাকবে। দু’একশ লোকের পক্ষে এই কাফেলায় হাত দেয়া সম্ভব নয়। আমাদের সবাইকে মিলে একটি সংঘবদ্ধ সেনাবাহিনীর মতো আক্রমণ করতে হবে…। তোমরা সবাই কি বলতে পারো, তোমরা প্রত্যেকেই কতোজন করে লোক সাথে আনতে পারবে?
“এক হাজার” একজন হাত তুলে বললো।
“ছয়শ” আরেক গোত্রপতি হাত তুলে বললো।
“চারশ” বললো আরেকজন।
একে একে সব গোত্রপতি বললো কতোজন লোক আনতে পারবে। সব মিলে সংখ্যা দাঁড়ালো পাঁচ হাজার।
“মনে রেখো, আমাদের দরকার সিপাহী যোদ্ধা। পাঁচ হাজার যুবক দিয়ে আমাদের কোনই কাজ হবে না” বললো হাম্মাদ বিন আলী। হয়তো আমাদের যুদ্ধ করার দরকার নাও হতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি বাগদাদ থেকে এসেছি। খলীফার এক সেনাপতি আমাকে বলেছে, গযনীর সুলতান মাহমূদ হাজীদের খুব সম্মান করে এবং তাদের সেবা যত্নের প্রতি খুবই খেয়াল রাখে। বিরাট এই কাফেলার নিরাপত্তার জন্যে সে হয়তো কোন সেনা ইউনিটও পাঠিয়ে দিতে পারে।”
প্রত্যেক গোত্রপতি হাম্মাদকে এই বলে আশ্বস্ত করলো, তারা এমন লোকদেরই আনবে যারা গযনীর সেনাবাহিনীকেও কচুর মতো কেটে ফেলবে।
“তোমরা যদি সত্যিই সৈনিকের মতো শক্তি নিয়ে আসতে পারো তাহলে তোমাদেরকে আমি বাড়তি আরেকটি পুরস্কার দেবো।” বললো হাম্মাদ। হাম্মাদের পাশেই বসা ছিল এক সুন্দরী তরুণী। বিগত এক বছর যাবত এই তরুণী হাম্মাদের সাথে ছিল। হাম্মাদ তরুণীর মাথায় হাত রেখে বললো, এ হলো গযনীর সুন্দরীদের নমুনা। গযনীর কাফেলা থেকেই আমি একে পেয়েছি। এবার এমন বহু সুন্দরী আসছে। অনেকেই আসছে গোটা পরিবার পরিজন নিয়ে। কাজেই বহু সুন্দরী থাকবে এবারের কাফেলায়। এমন পুরস্কার তোমরা আর কোথাও পাবে না।”
তরুণীটি তখন মুচকি হাসছিল। কিন্তু গযনীর কাফেলা থেকে তরুণীদের অপহরণের কথা শুনে তার চেহারা লাল হয়ে গেল।
হাম্মাদ এরপর বলতে শুরু করলো, কোথাও কোন মোক্ষম সুযোগে গযনীর কাফেলার উপর আক্রমণ করা হবে। হাম্মাদের পেছনেই দাঁড়ানো ছিল তার বডিগার্ড ইতেগীন। মরুর এই মজলিসে কোন নিরাপত্তারক্ষীর দরকার ছিল না। কিন্তু হাম্মাদ এই মরুরাজ্যের রাজা। রাজার মর্যাদা বুঝানোর জন্যে তার পেছনে একজন নিরাপত্তারক্ষীকে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো।
হাম্মাদ যখন বেদুঈন গোত্রপতিদের সাথে কথা বলছিল তখন তরুণী আড়চোখে কয়েকবার তাকিয়েছিল ইরতেগীনের প্রতি। ইরতেগীনের চেহারায় কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু যখন গযনীর কাফেলা থেকে তরুণীদের অপহরণের কথা বললো ডাকাত সর্দার হাম্মাদ, তখন তরুণী গভীরভাবে তাকালো ইরতেগীনের দিকে। তরুণী দেখলো, একথা শোনার পর ইরতেগীনের চেহারা পুরো বদলে গেছে। যেন তার কোন মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে।
বেদুঈন গোত্রপতিরা মিলে গযনীর হজ্জ কাফেলা লুটে নেয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলো এবং কিয়াদ নামক মরু অঞ্চলকেই তারা একাজের জন্যে উপযোগী বলে সাব্যস্ত করলো।
* * *
সেই রাতের ভিন্ন একটি পর্ব। হাম্মাদ বিন আলী গভীর ঘুমে অচেতন। তার পাশের তাঁবুতে সবিলা নামের হাম্মাদের এক রক্ষিতা শুয়ে ছিল। কিন্তু তার দু’চোখে ঘুম নেই। এই সবিলা জন্মসূত্রে গযনীর মেয়ে। সারা ডাকাতপল্লী যখন ঘুমের ঘোরে নীরব নিস্তব্ধ তখনো নিজের তাঁবুতে দুচোখের পাতা এক করতে পারছিলো না সবিলা। রাতের এই ডাকাতপল্লী যেন তখন মৃত নগরী। সবাই নির্বিঘ্নে অঘোের ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমাবেই না কেন, এই ডাকাতদের দুনিয়ার কোন ভয় তো তাদের ছিল না। না তাদের উপর চলতো কোন শাসকের শাসন। তাদের উপর কেউ রাতের বেলায় হানা দেবে এমন দুঃসাহস আরব কেন পৃথিবীর কোন জনগোষ্ঠীরও তখন ছিলো না। এমনই ভয়ঙ্কর হিংস্র ছিল এরা। তাদের এখানে রাতের বেলায় পাহারার কোন ব্যবস্থা ছিল না।
