খলীফা হাম্মাদ বিন আলীকে এমনভাবে তার পাশাপাশি বসালেন যেন কেউ অবচেতন মনে কোন কেউটে সাপ তার জামার আস্তীনে ভরে ফেলল।
* * *
বাগদাদের খলীফার প্রাসাদ যেমন তোষামোদকারী ভোগবাদী আমলা, সেনাপতি আর দরবারীদের দ্বারা পূর্ণ ছিল। খেলাফত একটি প্রতাঁকে পরিণত হয়েছিল। খলীফা ভোগবিলাসিতায় আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে জাতি ধর্মের সমূহ ক্ষতি হলেও তারা নিজেদের ভোগবাদিতা ও ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকাটাতেই বেশী গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিলেন। ঠিক তখন সেদিনকার আন্দালুস তথা আজকের স্পেনের অবস্থাও এমনই হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন আন্দালুসিয়ার রাজধানী কর্ডোভা চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রকারীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। স্পেন বিজয়ী তারেক বিন যিয়াদের হাড়মাংস হয়তো তখন মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। তার আত্মা হয়তো পরিবর্তিত আন্দালুসকে জয় করার জন্য মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সকল জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, ফিরে আসার সব ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। সেই তারেক বিন যিয়াদের আন্দালুস তখন তোষামোদকারী, ক্ষমতালিন্দু স্বার্থপর দরবারী ও আমত্যবর্গের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল।
যেদিন বাগদাদের খলীফার দরবারে এক লুটেরা ডাকাত সর্দারকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল, ঠিক সেই সময় আন্দালুসিয়ায় চলছিল ক্ষমতার মসনদ দখলে চাচা ভাতিজার দ্বন্দ্ব।
খোলাফায়ে রাশেদীনের পর প্রায় অধিকাংশ খলীফার যুগেই তোষামোদকারী ও চাটুকারদের একটি গোষ্ঠী খলীফাদের ঘিরে রেখেছে। তারা কখনো শাসকদের সত্যিকার পথে পরিচালিত হতে দেয়নি। প্রশংসা আর ভোগ বিলাসিতায় শাসক গোষ্ঠীকে লিপ্ত রেখে নিজেদের জাগতিক স্বার্থ উদ্ধার করেছে। আর এই সুযোগে ইসলামের শত্রুরা ইঁদুরের মতো ক্ষমতার শিকড় কেটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব তোষামোদকারীদের প্ররোচনায় অযোগ্য অসৎ লোকেরা শাসনকার্যের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করেছে। আর খেলাফতের ছত্রছায়ায় বসে এরা খেলাফতের বিরুদ্ধে সব ধরনের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র এবং ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে।
ইতিহাস সাক্ষী, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরাও তাদের বিবেক বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে আন্দালুসে যখন ইসলামের প্রদীপ নিষ্প্রভ হয়ে আসছিল বাগদাদেও খেলাফতের প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে রাজতন্ত্রের রূপ ধারণ করছিল। ফলে হাম্মাদ বিন আলীর মতো ডাকাত সর্দার বাগদাদের খলীফার কাছে পাচ্ছিল বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর মর্যাদা। অপর দিকে সত্যিকার মুসলমান ও ইসলাম প্রেমিক সুলতান মাহমূদ ছিলেন এদের সবার জন্যেই গলার কাঁটা।
* * *
হাম্মাদ বিন আলীর সাথে চারজন নিরাপত্তারক্ষী ছিল। তাদের একজন ছিল তুর্কী বংশোদ্ভুত ইরতেগীন। দু’বছর আগে সে হাম্মাদের ডাকাত দলে ভিড়ে যায় এবং হাম্মাদের অতি বিশ্বস্ত সঙ্গী ও নিরাপত্তা রক্ষীতে পরিণত হয়।
অন্যান্য বছরের মতো সেই বছর গযনীতেও একটি হজ্জ কাফেলা মক্কা যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিল। প্রস্তুতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল কিভাবে বেশী লোক হজ্জ কাফেলাতে জড়ো করা যায়। এর ফলে ডাকাত ও লুটেরাদের হাত থেকে নিরাপদে থাকা যায়। গমন ছাড়াও আরো বহু দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসে গযনীর হজ্জ কাফেলায় শরীক হচ্ছিল। এ উপলক্ষে বহু উট, ঘোড়া এবং গরুর বেচাকেনা হচ্ছিল। ঘোড়ার গাড়ি ও গরুর গাড়ি তৈরীর ধুম পড়ে গিয়েছিল গযনীতে। অনেকটা মেলার আকার ধারণ করেছিল হজ্জ যাত্রীদের আয়োজনে। এই মেলায় হাম্মাদ বিন আলীর লোকজনও ঘোরাফেরা করছিল। তারা পর্যবেক্ষণ করছিল কাফেলার সাথে কতজন লোক যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং মালপত্র কি পরিমাণ যাবে। যে সব লোক যাবে তাদের কি লড়াইয়ের শক্তি থাকবে কি-না।
মাস দেড়েক পরে হজ্জ কাফেলার রওয়ানা হওয়ার কথা। কাফেলার যাওয়ার পথে আরব এলাকায় মরু অঞ্চলে একটি মরুদ্যান পড়ে। মরুদ্যানটি ছিল যথেষ্ট বিস্তৃত এবং গাছপালা সজ্জিত। সেখানে বহু অভিযাত্রী তাঁবু ফেলেছিল। রাতের বেলায় বহু মশাল জ্বলছিল। যেন তাঁবুর শহর । তাঁবু থেকে একটু দূরে কয়েকজন লোক আসর বেধে বসেছিল। আসরের এক জায়গায় গালিচা বিছানো ছিল। সেখানে বসেছিল হাম্মাদ বিন আলী। সেখানেও মশাল ও বাতি জ্বলছিল।
আসরের মাঝখানে এক নর্তকী নাচছিল। হাম্মাদের সাথে আরো তিন চারজন সুন্দরী যুবতী বসেছিল এবং এরা অন্যদের শরাব পেশ করছিল। যুবতীদের কাঁধ পেট ছিল অর্ধনগ্ন। তাদের পরিধেয় পাগড়ির মতো পোশাকে ছিল তারকা খচিত। এদের চালচলন এমন ছিল যেন মরুর উপর এরা সাঁতার কাটছে। সবার সামনে কয়েকটি আস্ত খাসী ভুনা করে রাখা হয়েছিল।
নর্তকীর নাচ আর বাদকদের বাজনার তাল মিলিয়ে মরুভূমির মধ্যে একটা মন মাতানো সুরের আবহ তৈরী করেছিল। সেই রাতটি যেন ছিল আলিফ লায়লার রহস্য রজনীর মতোই রহস্যে ঘেরা একরাত। মরুভূমির এই অংশটি ছিল সাধারণ গমন পথ থেকে অনেকটা দূরে। এটাই ছিল হাম্মাদ বিন আলীর
জগৎ। মরুভূমির মধ্যে যে নৈসর্গিক মরুদ্যান ছিল এটিকেই হাম্মাদ বিন আলী তার শিষ্যদের আবাসস্থলে পরিণত করেছিল। হাম্মাদ বিন আলী ছিল এই জগতের সর্দার, রাজা বাদশা। এখানে হাম্মাদ ছাড়া জগতের আর কারো কোন হুকুম চলতো না।
