“এখন আমিও ইচ্ছা করলে বিরাট বাহিনী গড়ে তুলতে পারি। কারণ সকল উপজাতি বেদুঈন আমার নিয়ন্ত্রণে। সাত আটশ লোক সহজেই আমি নিয়ে আসতে পারবো, বললো হাম্মাদ। মাননীয় সেনাপতি! আপনি তো বেদুঈন কবিতাগুলো সম্পর্কে জানেন… এরা জন্ম থেকেই যোদ্ধা। এরপরও আমি সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হব না। আমি তো সুযোগ বুঝে হঠাৎ ঝটিকা আক্রমণ করে সব লুটে নেবো।”
“হ্যাঁ, কোন পাহাড়ী এলাকায় সুবিধাজনক জায়গায় অতর্কিত আক্রমণ চালাবে… এই তো?” বললো সেনাপতি।
“না না, পাহাড়ী জায়গা কেন, কায়েদ মরু অঞ্চলে। আপনি কেমন সেনাপতি? কায়েদ মরু অঞ্চল সম্পর্কে বুঝি আপনার ধারণা নেই। কায়েদ মরু অঞ্চলে যখন কোন কাফেলার উপর আক্রমণ হবে তখন কাফেলার লোকজন খালি ময়দান পেয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু লুকানোর মতো কোন জায়গা তারা পাবে না। কায়েদ মরু অঞ্চল সম্পর্কে আমি জানি। সেখানে একটা জায়গা আছে যেখানে অসংখ্য বালিয়াড়ী। এই জায়গা সম্পর্কে আমার কবিলা অবগত। কোন অপরিচিত লোক ওখানে পথ হারিয়ে ফেললে তার পক্ষে বালিয়াড়ীর প্যাক মাড়িয়ে পথ পাওয়া কঠিন। এই স্থানে গযনীর বাহিনীও সুবিধা করতে পারবে না। আমার সাথে যেসব বেদুঈন কবিলার লোক আছে এরা মানুষ নয়, মানুষরূপী দৈত্য। আপনি আমাকে খলীফার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিন। তার খেদমতেও আমি কিছু উপহার পেশ করতে চাই।”
খলীফা আল কাদের বিল্লাহ তার খাস কামরায় উপবিষ্ট ছিলেন। তার একান্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি তাকে বলছিল, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাম্মাদ বিন আলী তার সাথে সাক্ষাত করতে এসেছে। হাম্মাদের নিয়ে আসা বিপুল উপহার উপঢৌকন খলীফার সামনে পেশ করা হলো। সেনাপতি হাম্মাদ বিন আলীর দীর্ঘ গুণকীর্তন করলো। সেই সাথে বললো, হাম্মাদ বিন আলী অনেক কাজের লোক। সে সকল বিদ্রোহী বেদুঈন গোষ্ঠীগুলোকে আপনার তাবেদার বানিয়ে ফেলছে এবং সে এসব বেদুঈন গোষ্ঠী থেকে আপনার সেনাবাহিনীর জন্যও লোক সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। প্রয়োজনের সময় এসব বেদুঈন আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবে।”
‘এসব বেদুঈন খুবই স্বাধীনচেতা ও উগ্র। আমি শুনেছি এরা নাকি বিভিন্ন কাফেলা লুটে নেয় এবং অনেক তরুণী মেয়েদের অপহরণ করে এনে বিক্রি করে দেয়’ বললেন খলীফা।
‘জনাবে আলী মুহতারাম, এসব হচ্ছে ওদের দেয়া অপবাদ, যারা হাম্মাদ বিন আলীর জনপ্রিয়তা এবং তার শক্তির প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। তোষামোদীর চূড়ান্ত নিদর্শনস্বরূপ বললো সেনাপতি।
“আসলে প্রতিটি জনপ্রিয় লোকই পরশ্রীকাতর ঈর্ষাপরায়ণদের গলার কাটা হিসেবে বিবেচিত হয়। আপনারও হয়তো শত্রু আছে যখন দেখে আপনার প্রজারা আপনার নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করে দেয়। তখন হিংসুটেদের গায়ে জ্বালা শুরু হয়। ওরা অস্বস্তিবোধ করে। হাম্মাদ বিন আলী সকল বিদ্রোহী বেদুঈন গোষ্ঠীগুলোকে তার অনুগত বানিয়ে ফেলেছে এবং সে আপনার একজন অন্ধ ভক্ত। সমস্ত বেদুঈন গোষ্ঠীগুলোকেই সে আপনার অনুগত বানিয়ে ছাড়বে।”
“আমীরুল মু’মিনীন! সেনাপতির অনুগত আরেক তোষামোদকারী দরবারী আমলা বললো, এই বয়সেও আপনারা চেহারা মোবারকে যৌবনের দীপ্তি বিদ্যমান। হাম্মাদ বিন আলী আপনার জন্যে যে তুহফা এনেছে তা আপনি রাতে আপনার হারেমে দেখতে পাবেন।
“আপনিই এই হাদিয়া উপযুক্ত” বললো সেনাপতি।
“হাম্মাদ বাইরে অপেক্ষা করছে। আপনি হাম্মাদকে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে তাকে সম্মানিত করুন।”
“তাকে আর বাইরে অপেক্ষমাণ রাখা হলো কেন? সারা জগতের বাদশার মতো শাহী মেজাজে বললেন খলীফা। তাকে আমি আমার সাথে বসিয়ে সম্মানিত করবো।”
খলীফার অনুমতির সাথে সাথে হাম্মাদ বিন আলীকে খলীফার সামনে হাজির করা হলো। সে ছিল প্রকৃতপক্ষেই জাত আরব। তার চেহারা ছিল টকটকে লাল আর চোখ ঘন কালো। বয়স পৌঢ়ত্বের কাছাকাছি; কিন্তু শরীরের গাথুনী এতোটাই মজবুত যে, তখনো দেখতে যুবকের মতো। তার চেহারার মধ্যে সেই সব আরবের দ্যুতি ছিলো যারা রোমানদের গর্ব খর্ব করে তাদের অহংকার ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিল। যারা আরবের সীমানার বাইরে সাগর পাড়ি দিয়ে ইসলামের ঝাণ্ডা ইউরোপের বুকে গেড়ে দিয়েছিল। হাম্মাদের বাহু ছিলো লম্বা, কাঁধ চওড়া। বুক ও বাহু পেশীবহুল মাংসল।
সে যখন খলীফার কক্ষে প্রবেশ করল তখন তার পায়ের নীচে পৃথিবীটা যেনো দুলছিল। তার ঠোঁটে ছিল ঈষৎ হাসির রেখা এবং চেহারায় পৌরুষের দীপ্তি। তার চেহারার গভীর দৃষ্টি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদের দ্বারা কারো সন্দেহ করার উপায় ছিল না এই লোকটি লুটেরাদলের সর্দার।
হাম্মাদ বিন আলী প্রবেশ করতেই খলীফা দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এগিয়ে এসো হাম্মাদ বিন আলী। আল্লাহর কসম! তোমার চেহারা দেখেই আমি বুঝে ফেলেছি তুমি খেলাফতের মর্যাদা রক্ষার একজন নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক। লুটতরাজকারী বেদুঈন লোকগুলোকে বশে এনে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে তুমি ইসলাম ও খেলাফতের বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছে।”
“আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনার নগণ্য একজন প্রজা মাত্র বললো হাম্মাদ। প্রজাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তিটা আছে, যে আপনার আনুগত্য না করার ধৃষ্টতা দেখাবে। আপনি ঠিকই বলেছেন, এই অধম খেলাফতের একজন নগণ্য সৈনিক। আপনার খেদমতে আমার জীবন এবং সমগ্র বেদুঈন গোষ্ঠীগুলোর আনুগত্য পেশ করতে এসেছি।
