সুলতান মাহমূদের কানেও এ খবর পৌঁছেছিল। কিন্তু হিন্দুস্তানের যুদ্ধ আর স্বগোত্রীয় কুচক্রী শাসকদের শত্রুতার করণে তিনি ডাকাত দল নির্মূলের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেননি। তাছাড়া এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়ার জন্যে অনেক বাধা-বিপত্তিও ছিল। কারণ, গযনীর যেসব হজ্জ কাফেলা লুটতরাজের শিকার হয়েছিল এর ঘটনাস্থল ছিল আরব এলাকায়। যে এলাকা ছিল গযনীর রাষ্ট্র সীমানা থেকে অনেক দূরে অন্য শাসকদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যের সীমানায় গযনী থেকে শত শত মাইল দূরের কোন ডাকাত দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোটাও ছিল তার জন্যে দুরূহ ব্যাপার।
ঐতিহাসিক ফারিতা লিখেছেন, সুলতান মাহমূদের শাসনামলে বাগদাদের কেন্দ্রীয় খলীফা ছিলেন আল কাদের বিল্লাহ আব্বাসী। তখন মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রীয় শাসন বাগদাদ কেন্দ্রিক ছিল। তখন নামে মাত্র খেলাফত ছিল। মূলত খেলাফত তখন রাজতন্ত্রের মতোই ক্ষমতার মসনদে পরিণত হয়েছিল। আলকাদের বিল্লাহ একটি এলাকার শাসকও ছিলেন। তিনি তার শাসনাধীন এলাকার বিস্তৃতির জন্যে সচেষ্ট ছিলেন। যদিও কেন্দ্রীয় খলীফা হিসেবে এটা ছিল একেবারেই তার জন্য অন্যায় ও বেমানান। তার এই প্রচেষ্টা ছিল পর্দার অন্তরালে। ক্ষমতালি আর দখলদারদের জন্যে মিথ্যা প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করাটা সাধারণ ঘটনা। বস্তুত ক্ষমতালি হওয়ার কারণে মুসলিম সালতানাতের ভেতরে নানান ভাঙ্গাগড়ায় খলীফার নেপথ্য হাত থাকতো। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেই গোলযোগের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করতেন। এ কারণে সুলতান মাহমূদের সাথে তার একটা দ্বন্দ্বও ঘটে গিয়েছিল।
বহু ঐতিহাসিক বলেছেন, খলীফা আল কাদের বিল্লাহ জানতেন হাম্মাদ বিন আলীর নেতৃত্বে আরবের বহু বেদুঈন গোষ্ঠী ডাকাতিতে লিপ্ত। কিন্তু তিনি সবকিছু জেনেও চোখ বুজে থাকতেন।
১০১৯-১০২০ সালের হজ্জ মৌসুমে যখন হজ্জ কাফেলা প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন বাগদাদে ডাকাত সর্দার বিন আলী খলীফার একজন সেনাপতির কক্ষে অবস্থান করছিল। তার সাথে ছিল দুটি সুন্দরী যুবতী। সেনাপতি যুবতীদের দেখে মুচকি হাসছিল। যুবতী দু’জন ছাড়া, ডাকাত সর্দার হাম্মাদ বিন আলী আরো বহু উপহার উপঢৌকন সাথে নিয়ে এসেছিল।
কিছুক্ষণ পর দুই তরুণী আর উপহারগুলো অন্য কক্ষে চলে গেল। সেনাপতি ও ডাকাত সর্দার হাম্মাদ শুধু সেই কক্ষে থাকল।
খলীফার মন-মানসিকতা ও মেজাজ-মর্জি এখন কেমন হচ্ছে সম্মানিত সেনাপতি। জিজ্ঞেস করল হাম্মাদ। কারণ হজ্জের মৌসুম তো আসছে।
“খলীফার মেজাজ আমার হাতে”। বললো সেনাপতি। আমি জানতাম মওসুম শুরু হওয়ার আগে তুমি আসবে। আমার অংশ যদি তুমি ঠিক মতো পৌঁছে দাও তাহলেই হলো। তুমি খলীফার চিন্তা করো না। খলীফা ক্ষমতা আর গদির প্রেমিক। তার চারপাশে এমন দরবারী লোকজন দরকার এবং আছেও যারা তাকে ধারণা দেবে, খলীফা সারা দুনিয়ার বাদশা, দুনিয়ার সিংহ ভাগের রাজত্ব তার অধীন। প্রজারা তার রাজত্বে অত্যন্ত খুশী। তোষামোদির এ কাজ আমরা দক্ষতার সাথে করছি। খলীফা যেসব ব্যাপারে খুশী থাকে আমরা তাকে তেমনটাই রাখতে চাই। আমরা ধারণা দিয়েছি, তুমি একজন বিরাট বড় ব্যবসায়ী। যার ব্যবসা গযনী থেকে হিন্দুস্তান এবং আরব থেকে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত।
“এখন আমি আমার ব্যবসা গযনী পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চাই। ওখান থেকে আমি খবর পেয়েছি হাজারো লোকজনের কাফেলা হজ্জের জন্য আসছে। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা নাকি আরো বাড়বে। আমাকে জানানো হয়েছে, এই কাফেলার মধ্যে হিন্দুস্তান থেকে আনা মূল্যবান অনেক ধন-সম্পদ আসছে…। আচ্ছা সেনাপতি সাহেব, একথা কি ঠিক গযনীর সুলতান হিন্দুস্তান খালি করে সব ধন-সম্পদ নিয়ে এসেছে।
“আরে তার পাঠানো উপহার তো খলীফার কাছেও পৌঁছেছে।” জবাব দিলো সেনাপতি। এটা ঠিক সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তান থেকে এই পরিমাণ সোনাদানা, মণিমুক্তা সোনা-রুপার মুদ্রা নিয়ে এসেছে যা তোমার আমার মতো মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না।”
“আমাকে বলা হয়েছে, সে নাকি তার সেনাবাহিনীকে এসব ধন-সম্পদের অংশ থেকে বিনা হিসাবে দুহাতে ঢেলে দিয়েছে।” বললো হাম্মাদ। এই সেনাদের আত্মীয়-স্বজনরাই এ বছর হজ্জ করতে আসছে। হিন্দুস্তানের অনেক দামি দামি জিনিস তারা হজ্জে নিয়ে আসবে। এগুলো আবার আরব দেশের বাজারে বিক্রির জন্যে অনেকেই নিয়ে আসছে। তাছাড়া সুলতানের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে যে ব্যবসায়ীরা মাল পত্র কিনে সেই ব্যবসায়ীরা ও এই হজ্জ কাফেলার সাথে আসছে। এমন ধন-সম্পদে প্রাচুর্যময় কাফেলা আমার জীবনে একটিও পাইনি। খবর শোনার পর থেকেই আমি এই কাফেলার প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছি। আমি আপনার কাছে এজন্য এসেছি, আমি নিশ্চিত হতে চাই, যদি গযনীর এই কাফেলার উপর হাত দেই তাহলে খলীফা না আবার আমার ঘাড় কাটার ব্যবস্থা করে। কারণ সে তো সুলতান মাহমূদকে ভয় পায়।”
“আরে কি বলছো তুমি? আমি তোমাকে বলিনি খলীফা তো তোমাকে ব্যবসায়ী বলেই জানে, বললো সেনাপতি। কে জানবে গযনী কাফেলাকে তুমি লুট করেছো?… অবশ্য তোমাকে একটা ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কাফেলা অনেক বড় হবে, তোমার কাফেলাতেও জনবল বেশী থাকতে হবে। হতে পারে সুলতান মাহমূদ কাফেলার সাথে সেনাবাহিনীর কোন ইউনিট পাঠিয়ে দিতে পারে। শুনেছি, সে নাকি একজন পাক্কা মুসলমান। হজ্জযাত্রীদেরকে সে খুবই সম্মান করে এবং হজ্জ যাত্রীদের সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করে।”
