কাদের সেলজুকি তার সহকর্মীদের নির্দেশ দিলেন, “মহারাজাকে গযনীর শীর্ষ উমারা অভিজাতদের পোশাক পরিয়ে এখানে আনা হোক এবং তার সফর সঙ্গীদেরকে রাজকীয় অতিথি হিসাবে সম্মান দেয়া হোক।”
কিছুক্ষণ পর মহারাজা রাজ্যপাল গোসল করে শরীরে মাখানো ধুলো ময়লা পরিষ্কার করে সুন্দর রাজকীয় পোশাক পরিধান করে সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকির সামনে হাজির হলেন। আব্দুল কাদের সেলজুকি মহারাজাকে জিজ্ঞেস করলেন
“আপনি যে গযনী সুলতানের আনুগত্য করবেন এবং নিজেকে বন্দী থেকে মুক্ত ভাবছেন এর বিনিময়ে আপনার কাছে এমন কি আস্থার জিনিস আছে যার প্রেক্ষিতে আমরা আপনাকে বিশ্বাস করবো?”
“আপনারা নিশ্চয় এখানে আমার খাজাঞ্চীখানা শূন্য পেয়েছেন। আমি সব ধন-সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় ধন-ভাণ্ডার আমার সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার রাজ্যে বারী নামক আরেকটি জায়গা আছে এবং সেখানে আমার কিছু সৈনিকও রয়েছে। আপনি যদি এ ব্যাপারে আমাকে আশ্বাস দেন বারীতে আমি পুনর্বার আমার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবো তাহলে আমি আপনাদেরকে এই যুদ্ধের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার পরিশোধ করবো এবং বার্ষিক করও দেবো। তাছাড়া আপনাদের সাথে মৈত্রী চুক্তিও স্থাপন করবো।”
“আপনি রাজধানী ত্যাগ করেছিলেন কেন? জিজ্ঞেস করলেন সেলজুকী।
“এ প্রশ্নের জবাব দেয়া আমার পক্ষে কঠিন। এর জবাব ভবিষ্যতের জন্যে থাক। এর কারণ জানাটা খোশামোদী হবে। আমি আমার দেবতাদেরকেও কখনো তোষামোদ করিনি।”
“আপনি কি ইসলাম গ্রহণ করবেন?”
“ধর্মের ব্যাপারে আমি খুবই বিরক্ত” বললেন মহারাজা। আপনার আচার-ব্যবহারে আমি এতোটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, কোন দিন হয়তো আমার অন্তর আমাকে বলে বসতেও পারে তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি ওসব কথা বলতে চাই না। আপনি আমার আবেদনের ব্যাপারে চিন্তা করুন।
“আমি গযনী সুলতানের পক্ষে আপনার আবেদন মঞ্জুর করলাম” বললেন সেনাপতি আব্দুল কাদের। আপনি নতুন করে রাজ্য গঠন করুন, তবে আমার কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা বারী গিয়ে আপনার কার্যক্রমের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেবে। এখনই আপনার সাথে লিখিত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হয়ে যাবে। আপনার যুদ্ধব্যয়ের ক্ষতি পূরণের পরিমাণ এবং বার্ষিক কর সুলতান নিজে নির্ধারণ করবেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পয়গাম দিয়ে আজই আমি দূত পাঠিয়ে দেবো।”
* * *
এদিকে নদী তার জ্ঞাতি ভাইয়ের সাথে কালার পৌঁছে গেল। সৈনিক কালাঞ্জরের রাজাকে জানাল, মহারাজা রাজ্যপাল গযনীর আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার জন্যে কনৌজ গেছেন। একথা শুনে কালাঞ্জরের রাজা গুণ্ডা ক্ষোভে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। তখন গোয়ালিয়রের রাজা অর্জুনের কাছে পয়গাম পাঠালেন, “আমরা যা আশঙ্কা করেছিলাম অবশেষে তাই ঘটেছে। রাজ্যপাল গযনীর আনুগত্য স্বীকার করে মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছে।
এখন রাজ্যপালকে হত্যা করা ছাড়া আমাদের আর কোন গত্যন্তর নেই। আর রাজা ভীমপালকে সাথে নিয়ে চিরদিনের জন্য গযনীর সুলতানকে খতম করা ছাড়া আমাদের আর বিকল্প কোন পথ নেই। আসুন আমরা শেষ এবং চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেমে পড়ি।”
৪.৫ গযনীর সম্ভ্রম
১০১৯-২০ খ্রিস্টাব্দের হজ্জ মৌসুমের আর কয়েকটি মাস মাত্র বাকি আছে। হজ্জে যাওয়ার জন্যে হজ্জগমনেচ্ছুক যাত্রীরা প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তখনকার দিনে এক একটি অঞ্চল থেকে হাজারো যাত্রী একত্রিত হয়ে গন্তব্যে যাত্রা শুরু করতেন। তখনকার দিনে আজকের মতো উড়োজাহাজ ছিলো না। হজ্জযাত্রীরা উট, গাধা, ঘোড়া কিংবা পায়ে হেঁটে দল বেধে হজ্জ যাত্রা করতেন। হজ্জযাত্রীদের সাথে ব্যবসায়ীরা থাকতেন। কেউ কেউ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে হজ্জ কাফেলায় অংশগ্রহণ করতেন।
কাফেলা যতো বেশী বড়ো হতো যাত্রীরা ততো বেশী নিরাপদ, বোধ করতো। আর কাফেলা যতো ছোট হতো ততোই বাড়তো নিরাপত্তাহীনতা। কারণ প্রায়ই হজ্জ কাফেলার উপর সঙ্গবদ্ধ ডাকাত দলের আক্রমণ হতো। এজন্য সবার চেষ্টা থাকতো বড় কাফেলার সঙ্গী হওয়ার। তাই কাফেলা যতোই সামনে অগ্রসর হতে থাকতো পথে পথে বিভিন্ন এলাকার মুসাফিররা কাফেলার সাথে যুক্ত হতো। ফলে দিন দিন কাফেলার লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতো।
ডাকাতেরাও কম যেতো না। ডাকাত দলও বিশাল বিশাল ডাকাত কাফেলা গড়ে তুলতো। এক সময় এশিয়া মাইনর থেকে যাওয়া হজ্জযাত্রীদের লুটতরাজ করতে খ্রিস্টান রাজশক্তিগুলো লুটেরাদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত সেনাদেরও নিয়োগ করতো।
আবুল কাসিম ফারিতা বহু ঐতিহাসিকের সূত্র উল্লেখ করেছেন, হাম্মাদ বিন আলী নামের এক লোক ছিল সুলতান মাহমুদের শাসনামলে আরব অঞ্চলের সবচেয়ে কুখ্যাত ও শক্তিশালী ডাকাত সর্দার। এই ডাকাত সর্দার পশ্চাদপদ আরব বেদুঈনদের একত্রিত করে বিশাল এক ডাকাতগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিল। তার এই ডাকাত দল সারা বছরই বিভিন্ন কাফেলায় লুটতরাজ করতো। তার ডাকাত দল ছিল নিয়মিত একটা সেনাবাহিনীর মতোই শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এই ডাকাতগোষ্ঠী আবর দেশের সীমানাবর্তী এলাকাগুলোয় হজ্জযাত্রীদের কাফেলাতেও লুটতরাজ চালাতো এমনকি যুবতী মেয়েদের পর্যন্ত তুলে নিয়ে যেতো। ডাকাত সর্দার হাম্মাদ বিন আলীর ডাকাতরা গযনীর কয়েকটি হজ্জ কাফেলাও লুট করেছিলো।
