“আরে পণ্ডিত নিজেই তো তার দেবতার খোরাক হয়ে গেছে।” বললো বয়স্ক সৈনিক। সে একটি অজগর ধরে রেখেছিল। অজগর ছেড়ে দিয়ে সে মহারাজার পথ রোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু অজগর শেষ পর্যন্ত পণ্ডিতকেই গিলে ফেললো।”
“মহারাজা এখন কোথায়?” জানতে চাইলো নদী।
“মহারাজা কনৌজ চলে গেছেন। তিনি মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করবেন।” বললো সৈনিক।
“মুসলমানদের সাথে মৈত্রীচুক্তি করতে গেছেন!” বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো নদী।
“হ্যাঁ, তাই। এর মধ্যেই মহারাজার মঙ্গল।” বললো সৈনিক। আমার মতো মহারাজাও বুঝে গেছেন, পণ্ডিত পুরোহিত ঠাকুরদের তৈরী হিন্দুধর্ম আসলে একটা ধোকা। আসলে এসব দেবদেবী যুদ্ধের ময়দানে কোনই সাহায্য করতে পারে না। মহারাজা তো প্রকাশ্যেই বলছেন, মুসলমানরা একে একে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সব মন্দির ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের দেবদেবীরা তাদের কিছুই তো করতে পারলো না। বরং দেবদেবীদের মূর্তিগুলোকে ওরা ঘোড়র পায়ে পিষে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। তাতেও কি দেবদেবীদের উচিত ছিল না, নিজেদের এই অপমান অপদস্থের জন্যে মুসলমানদের শাস্তি দেয়া?”
“তুমিও কি সনাতন ধর্মের প্রতি বিরূপ হয়ে গেছো দাদা?” জিজ্ঞেস করলো নদী।
“আচ্ছা নদী! বলতো আমাদের ধর্মটা আসলে কি? রাজা মহারাজাদের আনন্দ দেয়া আর তাদের সুখ-আহ্লাদের জন্যে আমাদের মতো মানুষের জীবন বিলিয়ে দেয়াই কি আমাদের ধর্ম নয়? এসব ব্যাপারে তো আমাদের কখনো ভাবতে দেয়া হয়নি। এখন সময় এসেছে এসব বিষয়ে আমাদের চিন্তা করার। আমাদের ভাবতে হবে আসলে আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোথায় যাবো। কালাঞ্জর এখান থেকে এখনো দেড় দিনের পথ। চলো আগে সেখানেই যাই। সেখানে গিয়ে আমরা রাজ দরবারে আমাদের উপস্থাপন করবো। কেউ যদি আমাদের ঠাই দেয় তবে সেখানে থেকে যাবো, নইলে অন্য কোন জায়গার জন্যে বেরিয়ে পড়বো।”
নদী ও তার সৈনিকরূপী জ্ঞাতি ভাই সারা দিন রাত পথ চলল। রাত শেষে সকালের দিকে তারা কালাঞ্জরের উপকণ্ঠে পৌঁছলো। তারা যে সময় কালাঞ্জর পৌঁছল ঠিক সেই সময়ে মহারাজা রাজ্যপাল কনৌজের সীমানায় প্রবেশ করলেন। তার অপর দুই সঙ্গীও সাথে ছিল। তাদের সবার পেশাক পরিচ্ছদ ছিল অতি সাধারণ মানুষের মতো।
মহারাজা যখন তার ভগ্নপ্রায় রাজধানী দেখলেন, তখন তার মনের মধ্যে বিরাট এক ধাক্কা লাগল। গোটা শহরটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তখনও পর্যন্ত কোন কোন বাড়ীতে আগুন জ্বলছিল। ভগ্নস্তূপের মধ্য দিয়ে মহারাজা অগ্রসর হলেন এবং প্রধান মন্দিরের সামনে গিয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন। তার দিকে চোখ তুলে তাকানোর মতো একটি লোকও ছিল না। মহারাজা মন্দিরের মূল বেদীতে উঠলেন। মন্দির স্থির। সেখানে পূজারীদের কোন তৎপরতা নেই। জনশূন্য মন্দির থেকে দুর্গন্ধ বেরিয়ে এলো, অথচ এখানটায় সবসময় সুবানের গন্ধে সুরভি থাকতো।
মহারাজা মন্দিরের ভেতরে গিয়ে দেখলেন সব শূন্য। না ছিল সেখানে দেবদেবী না ছিল দেবদেবীর মূর্তি। তিনি মন্দিরের ভেতরের কক্ষে প্রবেশ করলেন।
এক পর্যায়ে স্বগতোক্তির মতো তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি জানি না এটা কি দেবতাদের অভিশাপের বহিঃপ্রকাশ যে আমরা আমাদের শহর থেকে উচ্ছেদ হলাম; আমাদের শহর ধ্বংস হয়ে গেলো? এটা কি আমার কোন অপরাধের ফসল? আমি বুঝতে পারছি না, আমরা মিথ্যা, না আমরা সত্যিকার পথে আছি? এখানে পূজা-অর্চনায় দেবদেবীদের সাথে আমার নামও তো উচ্চারিত হতো।”
‘সত্য সেই খোদা, যিনি ভজন ও ঘণ্টা ধ্বনির ঊর্ধ্বে। তার পেছন থেকে উচ্চারিত হলো।
আওয়াজ শুনে মহারাজা ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলেন, এক লোক তার ভাষায় একথা বলছে। লোকটি আরো বললো, কনৌজের রাজা কি ভগ্নস্তূপের মধ্যে নিজের জাঁকজমক এবং ভ্রান্তধর্মের ধ্বংসাবশেষ দেখছেন? মহারাজা কি এসব থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্যে এসেছেন?
“আরে তুমি, সগ্রাম? তুমি এখানে? এখানে কি করছো তুমি?” চেনা লোকটির নাম উচ্চারণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন মহারাজা?
“যারা বেশ বদল করে এখানে সে তাদের প্রকৃত রূপ আবিষ্কারের কাজ করি আমি।” জবাব দিলো সগ্রাম। এখন আর সংগ্রাম নই আমি, উসমান। আমি মুসলমান হয়ে গেছি। আপনি আমাকে গাদ্দার বলতে পারেন। কিন্তু মহারাজা নিজেই যদি জাতির সাথে গাদ্দারী করতে পারেন তাহলে…?”
“না, সংগ্রাম। আমি এখানে কাউকে গাদ্দার বলতে আসিনি। আমি গযনী সুলতানের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছি।”
“সুলতানতো ননী চলে গেছেন। এখানে এখন দায়িত্ব পালন করছেন সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকী” বললো উসমান।
“ঠিক আছে, আমাকে তুমি তার কাছেই নিয়ে চলো।”
***
সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকীকে যখন জানানো হলো, এই ব্যক্তি কন্নৌজের মহারাজা, তখন তিনি একথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কিন্তু তাকে যখন নিশ্চিত করা হলো, এই ব্যক্তিই কনৌজের মহারাজা, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মহারাজা কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন?”
“সুলতানের শাসনকে মেনে নিতে এসেছি, তার কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে এসেছি।” বললেন রাজা রাজ্যপাল। আপনি এখন ইচ্ছা করলে আমাকে বন্দী করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে হত্যাও করতে পারেন।”
“একজন মহারাজাকে এই বেশে আমি দেখতে চাই না।” বললেন সেনাপতি আব্দুল কাদের সেলজুকি। আপনার শরীর যদি রক্তে রঞ্জিত থাকতো তাহলে আমি দেখে খুশী হতাম, মনে করতাম, আপনি আপনার রাজ্যের জন্য লড়াই করেছেন। কিন্তু আপনি এসেছেন ভিন্ন বেশে। আমি আপনাকে একজন মহারাজা হিসাবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, আপনাকে সম্মান করছি।”
