“তাহলে শোন! কোকাতে কোকাতে বললো পণ্ডিত, আমার তাঁবু থেকে দু’শগজ পূর্বদিকে যাবে। ওখানে দুটি টিলার মাঝখানে গেলে ডানপাশের টিলার মধ্যে একটি গুহার মতো দেখতে পাবে। এর ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পাবে খুব সাজানো গোছানো একটি জায়গা। যেনো একটি স্বর্গ। তুমি জায়গাটি দেখলে সেখানেই থেকে যেতে চাইবে। সেখানেই তুমি নদীকে পাবে…। আমি তো নদীর কথা তোমাকে বলে দিলাম। এখন সামনে এসো, সাপটাকে তোমার তরবারী দিয়ে কেটে ফেলো, আমাকে উদ্ধার করো…।”
“তুমি তোমার কুকর্মের শিকার হয়েছে পণ্ডিত। তোমার ধোঁকাবাজি আর প্রতারণা তোমাকে গিলে ফেলছে। কারণ, আমি নিশ্চিত জানি এটা নিছকই একটা অজগর, দেবতা নয়। অজগর দেবতা হতে পারে না।” বলে সৈনিকটি একটি অট্টহাসি দিয়ে তরবারী কোষবদ্ধ করে পণ্ডিতের দেয়া তথ্য মতো নদীর খোঁজে ছুট দিলো।
***
অজগরটি বারবার পণ্ডিতকে মাটির উপর আছড়াতে আছড়াতে আধমরা করে ফেলল এবং ডান পাটি ছেড়ে দিয়ে মাথাটি মুখের ভেতরে নিয়ে নিল। পণ্ডিত ইতোমধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। অজগর এবার পণ্ডিতের মাথা মুখে পুড়ে নিয়ে আছাড় দিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে পণ্ডিতকে গিলতে শুরু করল।
অর্ধ বয়স্ক সৈনিক অনেকটা দূরে তার ঘোড়াকে বেধে রেখেছিল। সে দ্রুত ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে পণ্ডিতের বলে দেয়া জায়গার দিকে ঘোড়া হাঁকাল । পণ্ডিতের বলে দেয়া জায়গাটির আলামত ছিল পরিষ্কার। তাতে কোন জটিলতা…
সৈনিক অগ্রপশ্চাত না ভেবেই দ্রুত পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করল। গর্তের ভেতর দিকটা অনেক ফাঁকা। সেখানে মখমলের দামী কাপড়ের বিছানা বিছানো। একপাশে কয়েকটি মূর্তি বসিয়ে রাখা হয়েছে এবং বিছানার এক প্রান্তে সুগন্ধী আগর বাতি জ্বলছে। সারা গুহা লুবানের সুঘ্রাণে ভরে আছে।
নদী সৈনিককে দেখে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলো যেনো সে তাকে চেনে না। সৈনিক ছিল বয়স্ক এবং অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। সে সহজেই বুঝতে পারল নদীকে কোন ওষুধের দ্বারা অবচেতন করে রাখা হয়েছে। নয়তো একাকী থাকা অবস্থায় সে নিশ্চয়ই এখান থেকে বেরিয়ে যেতো। সৈনিক যখন তাকে নদী বলে ডাকল, নদী তার ডাক শুনে মোহনীয় ভঙ্গিতে একটি মুচকি হাসি দিল।
সৈনিক অযথা সময় নষ্ট করতে চাচ্ছিল না। সে বয়স্ক হলেও শরীরের কাঠামো ছিল শক্ত। সে নদীকে পাজা কোলে করে কাঁধে তুলে নিল এবং বাইরে এনে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিল এবং নিজেও ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে এক হাতে নদীকে আর অপর হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হয়ে গেল।
মহারাজার ছেলে লক্ষণপাল তার পিতা রাজ্যপালকে খুঁজছিলো। বাবার খোঁজে সে পণ্ডিতের তাঁবুতে গেল কিন্তু সেখানে তার বাবাকে পাওয়া গেল না। লক্ষণপাল জানতো পণ্ডিত নদীকে কোথায় রেখেছে। সেখানে গিয়ে সে নদীকেও দেখতে পেল না। শিবিরে ফিরে এলে এক সৈনিক তাকে জানাল, সে পণ্ডিতকে পাহাড়ের ওই দিকে যেতে দেখেছে। লোকটি আরো জানাল, পণ্ডিত একটি বিশাল পোটলা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
লক্ষণপাল সৈনিকের দেখানো পথে পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলো। পথিমধ্যেই তার চোখে পড়লো পোটলা টেনে হেঁচড়ে নেয়ার চিহ্ন। এই চিহ্ন দেখে দেখে লক্ষণপাল সেখানে চলে গেল। যেখানে অজগর তখনো পণ্ডিতকে গিলে শেষ করতে পারেনি। অর্ধেকের চেয়ে বেশী শরীর মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলেছে। তখনো পণ্ডিতের পা দুটো অজগরের মুখের বাইরে ঝুলছে।
লক্ষণপাল অবস্থা দেখে সাথে সাথে তরবারী কোষমুক্ত করে অজগরটিকে কুপিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলল। কিন্তু পণ্ডিতকে অজগর যে পরিমাণ মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলেছিল সেখান থেকে তাকে আর বের করে আনা সম্ভব হলো না। লক্ষণপাল অদূরে পড়ে থাকা একটি মোটা কাপড় ও রশি দেখতে পেল। রশিটা দেখেই সে চিনতে পারলো এই রশিটাই সে সেদিন পণ্ডিতকে দিয়ে ছিল যা দিয়ে ফাঁস তৈরী করে পণ্ডিত অজগরকে বশে আনতে সক্ষম হয়। অজগরটির দিকে তাকিয়ে সেটিকেও সে চিনতে পারল। কিন্তু লক্ষণপাল রশি অজগর আর পণ্ডিতের সাপের পেটে যাওয়ার পরিস্থিতি দেখে বুঝে উঠতে পারছিল না, এখানে আসলে কি ঘটেছে এবং কেনই বা ঘটেছে।
* * *
মহারাজা রাজ্যপাল অনেক দূরে গিয়ে তার সঙ্গীদের সাথে মিলিত হলেন। তার ঘোড়াটি অজগর দেখে ভীত হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে এক পর্যায়ে দৌড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মহারাজা ও তার সঙ্গীদের ঘোড়াগুলো সাপ দেখে ভয় পেয়ে তীব্রগতিতে দৌড়ানোর ফলে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল বটে কিন্তু তারা যে পথ সারা দিনে অতিক্রম করতেন সেপথ অর্ধেক দিনেই অতিক্রম করলেন। তারা সোজা কনৌজের দিকেই অগ্রসর হতে থাকলেন।
* * *
এদিকে নদীকে নিয়ে বয়স্ক সৈনিক সারা দিন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করলো এবং নদীকে পণ্ডিতের খাওয়ানো ওষুধের প্রভাবমুক্ত করার চেষ্টা করলো। সন্ধ্যার কিছুটা পর নদী তার প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করল। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সময় নদী তার জ্ঞাতি ভাইয়ের সাথে এভাবে কথা বলছিল যেন সে একটা গভীর স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে। পণ্ডিত এমন কোন ওষুধ খাইয়েছিল যার প্রভাবে নদী তার স্বাভাবিক বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। সম্বিত ফিরে আসার পর নদীর স্পষ্ট মনে পড়লো, পণ্ডিত তাকে বলেছিল, দেবতাকে খুশী করার জন্যে সে নদীকে বলি দেবে। এরপরের বিষয়গুলোকে সে স্বপ্ন বলে মনে করলো।
