তারা যখন দু’টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী রাস্তা দিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল তখন সামনে থাকা মহারাজার ঘোড়া হঠাৎ কিছু একটা দেখে ভড়কে উঠলো। এবং হ্রেষাব করে পিছপা হতে শুরু করল। এই অবস্থা দেখে মহারাজার এক সঙ্গী বললেন, ঘোড়া হয়তো সাপ দেখেছে। সাপ দেখলেই ঘোড়া ভয়ে এভাবে কাঁপতে থাকে।
দেখতে দেখতে অপর দু’টি ঘোড়াও ঠায় দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো।
হঠাৎ করে পাহাড়ের ঝোঁপের আড়াল থেকে এক গুরুগম্ভীর আওয়াজ শোনা গেল, “ফিরে যাও। মনের ইচ্ছা ত্যাগ করো। যেখানে যাচ্ছ, সেখানে তোমাদের অপমানজনক মৃত্যু অপেক্ষা করছে।”
থেমে থেমে এই আওয়াজ আসছিল। সেই সাথে ক্ষীণ আওয়াজে মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনির মতো ঘণ্টার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। সকল হিন্দুর কাছেই এই ঘন্টার আওয়াজ পরিচিত। সাধারণত মন্দিরেই এমন ঘণ্টা বেজে থাকে।
“এটা কোন ইহলোকের আওয়াজ মনে হয় না।” বললো মহারাজার এক সঙ্গী।
হঠাৎ ঘন একটি ঝোঁপের ভেতর থেকে একটি প্রকাণ্ড অজগর সাপ মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। সেই সাথে সেটি ধীরে ধীরে সামনে অগ্রসর হতে লাগলো। অজগরকে সামনে অগ্রসর হতে দেখে ঘোড়া তিনটি ভয়ে ভড়কে গিয়ে উধ্বশ্বাসে ডানে বামে দৌড়াতে লাগলো। এ অবস্থায় ঘোড়া লাগামহীন হয়ে পড়লো। কিন্তু মহারাজা ও তার দুই সফরসঙ্গী ছিল অশ্বচালনায় পারদর্শী। এমতাবস্থাতেও তারা সবাই ঘোড়ার পিঠে নিজেদেরকে সংহত রাখতে সক্ষম হলো। তারা ঘোড়াকে থামানোর চেষ্টা না করে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দৌড়ানোর সুযোগ দিল।
* * *
অশ্বারোহী পালিয়ে যাওয়ার পর অজগরটি শিকার হারিয়ে আরেকটি ঝোঁপের ভেতরে প্রবেশ করল। একটি গর্তের মতো গুহা থেকে ঘন সবুজ ঘাস ও গুলের ভেতর থেকে পণ্ডিত মাথা উঁচু করল এবং গুহা থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের ঢালে এসে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক মাথা দোলাতে লাগলো। সে মনে মনে আফসোস করতে লাগলো তিনো অশ্বারোহী তার নাগালের বাইরে চলে গেছে। ব্যর্থতায় পণ্ডিত আকাশের দিকে তাকিয়ে সেখানেই স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ কোত্থেকে একটি লোক এসে পণ্ডিতের সামনে উদয় হলো।
পুরোহিত তাকে চিনতো। লোকটি ছিল অর্ধবয়স্ক এক সৈনিক। লোকটি তরবারী কোষমুক্ত করে উদ্যত কণ্ঠে পুরোহিতকে বললো, “যদি বাঁচতে চাও তাহলে বলো নদী কোথায়?”
“তুমি এখানে কোত্থেকে এলে? হমকির সুরে বললো পণ্ডিত। ভালো চাও, তবে এখান থেকে চলে যাও। নয়তো মহারাজাকে বলে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবো।”
“তোমার আর রাজার জীবন এখন আমার হাতে।” বললো সৈনিক। আমি জানতে চাই, নদীকে তুমি কোথায় লুকিয়ে রেখেছো? আমি তাকে বলি দিতে দেবো না। নদীর খোঁজ না দিয়ে তুমি এখান থেকে জীবন নিয়ে পালাতে পারবে না পণ্ডিত।
পণ্ডিত তাকে দেবদেবীদের অভিশাপ ও ক্রোধের ভয়ভীতি দেখাতে লাগল এবং বলতে লাগল নদীকে দেবতার সন্তুষ্টির জন্যে বলি দিতে হচ্ছে। তাকে দেবতা পছন্দ করেছেন। পৃথিবীর মতো নোংরা জায়গা থেকে বিদায় নিয়ে সে তখন থাকবে দেবতার স্ত্রী হয়ে আকাশে। তাতে তুমি বাঁধ সাধছো কেন।
পণ্ডিত যখন এসব কথা বলছিল, ঠিক সেই সময় তার পেছনের ঝোঁপ থেকে মাথা উঁচু করে উঁকি দিল বিশাল অজগর। অজগরটি মাথা উঁচু করে নিঃশব্দে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। মধ্যবয়সী লোকটি অজগরকে আসতে দেখল কিন্তু সে পণ্ডিতকে সতর্ক না করে নিজে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। অজগরটি অগ্রসর হয়ে তার সামনে দাঁড়ানো পণ্ডিতের একটি পা মুহূর্তের মধ্যে মুখের ভেতরে পুরে নিল। পণ্ডিত আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো। অজগর পণ্ডিতকে উপরে উঠিয়ে জমিনে একটা আছাড় দিল। অজগর সাপও কুমিরের মতো খাবার আস্ত গিলে ফেলে। অজগর অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে শিকার পুরোটাই গিলে ফেলে। পণ্ডিতকে যখন ধীরে ধীরে অজগর গিলতে শুরু করল তখন সে চিৎকার করে সৈনিককে বলতে লাগলো, ভাই! দয়া করে তরবারী দিয়ে সাপটিকে কেটে ফেলো, ভগবানের দোহাই আমাকে উদ্ধার করো, জীবন বাঁচাও।”
“আরে এটা না তোমার দেবতা পণ্ডিতজী! বললো সৈনিক। আমি জানি কখন থেকে তুমি এটিকে দেবতা জ্ঞানে পুষে আসছে। আমি মহারাজার প্রতি বিশ্বস্ত, আমি তোমার সুহৃদ নই। আমি সব জানি। তোমার দেবতা আমার মহারাজার পথ রুখতে পারেনি।”
“আরে ভাই! এসব কথার সময় নয়, তুমি আগে এসে তরবারী দিয়ে এটার মাথা কাটো, আমাকে বাঁচাও।”
চিৎকার করে বারবার বলছিল পণ্ডিত।
“আগে বলো নদীকে কোথায় রেখেছো?”
“হ্যাঁ, বলে দিচ্ছি। ব্যথায় কোঁকরানো কণ্ঠে বললো পণ্ডিত। কিন্তু আগে অজগরটিকে কেটে ফেলো।
“নদী কোথায় বলো। তোমার কাছে একটা নর্তকী তেমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হতে পারে কিন্তু ওকে আমি নিজের বোন মনে করি। সে ছিল একটি এতীত মেয়ে। আমার মা বাবা তাকে লালন পালন করে অধিক সুখের আশায় মহারাজার হাতে তুলে দেয়। আমি ওকে এতোটাই আদর সোহাগ করতাম আর সে আমাকে এতোটাই ভালবাসতো যে ওর ভালোবাসার টানে আমি মহারাজার কাছে চলে আসি। আমি মহারাজার কাছে এসে তরবারী চালনা ও তীর নিক্ষেপে নৈপুণ্য দেখালে তিনি তার একান্ত নিরাপত্তা বাহিনীতে আমাকে চাকরী দিয়ে দেন। সেই থেকে আমি প্রকাশ্যে মহারাজার কিন্তু আড়ালে নদীর নিরাপত্তা বিধানে কাজ করছি। কারণ, নদী আমার সহোদরা বোনের মতোই প্রিয়।
