“এটা কি করে সম্ভব পণ্ডিত মহারাজা”
“আমরা তোমাকে দেবতার পায়ে উৎসর্গ করতে যাচ্ছি” বললো পণ্ডিত। এ চাঁদের বানোতম রাতে দেবতা তোমাকে নিতে আসবেন। তোমার রক্ত এই জমিনে ফেলে দেয়া হবে। এ রক্ত মাংস নিয়ে তুমি দেবতার কাছে যেতে পারবে না। কারণ, তোমার এই রক্ত মাংস পবিত্র নয়।”
“আমি বুঝে ফেলেছি মহারাজ! আপনি আমার মাথা কেটে ফেলবেন।” আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো নদী। না না মহারাজ! আমি এমন মরণ মরতে চাই না।”
“না চাইলেও তোমাকে মরতে হবে নদী। স্বজাতির ধর্ম আর মহারাজার কল্যাণে তোমাকে জীবন উৎসর্গ করতেই হবে।
নদী পালিয়ে যাওয়ার জন্য এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল। পণ্ডিত তাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললো, দেবতাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করলে তোমার চেহারায় কাটার মতো শত শত টিউমার হবে। পেত্নীর মতো কালো হয়ে যাবে তোমার শরীর। আর দুর্গন্ধে তোমার কাছে কেউ যেতে চাইবে না। তখন তুমি মহারাজার প্রিয়ভাজন তো দূরের কথা কাছে থাকার অনুমতি পর্যন্ত পাবে না। মহারাজার লোকেরা তোমাকে জঙ্গলে ফেলে আসবে। তোমার চোখ দুটো মরা মানুষের মতো সাদা হয়ে যাবে। কোমর বেঁকে যাবে। তুমি ঠিক মতো হাঁটতেও পারবে না।
“এসো নদী। এই তো সামনেই দেবতা রয়েছেন। একটু দেখে নাও।”
পুরোহিত নদীকে অপর কক্ষে নিয়ে গেল এবং ঘাসে ভরা একটি জায়গা থেকে ঘাসগুলো সরালে একটি গর্ত দেখা গেল। পণ্ডিত নদীকে সামনে নিয়ে গর্তের ভেতরটা দেখালো। গর্তের ভেতরে বিশাল এক অজগর কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল, নদী অজগর দেখে চিৎকার করে উঠলো।
“এটাই তো দেবতা যা তোমাকে নেয়ার মেহমান” বললো পুরোহিত।
“আপনি কি আমাকে গর্তের এই অজগরের মুখে ফেলে দেবেন?” কম্পিত কণ্ঠে জানতে চাইল নদী।
পুরোহিত একটি ফুল নদীর নাকের কাছে ধরে বললো, এটার ঘ্রাণ নাও। এটি দেবতা তোমাকে দিয়েছেন।
পুরোহিত একটি ফুল নর্তকীর নাকের কাছে তুলে ধরলো। নর্তকী সেটির ঘ্রাণ নিলে তার শরীর শিথিল হয়ে এলো এবং সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। পুরোহিত নদীকে ধরে অন্য কক্ষে শুইয়ে দিল। এরপর পুরোহিত ঘাস দিয়ে অজগরটিকে ঢেকে দিলো।
এরপর কেটে গেলো তিনটার দিন। এ কয়দিন রাত হলেই একটি মানুষ ছায়ার মতো তাঁবুর আশপাশে পা টিপে আসা যাওয়া করেছে। এক রাতে সে পুরোহিতের তাঁবু ঘেঁষে পঁড়াল। সে পুরোহিতের তাঁবুর সাথে কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এর পরদিন ছায়া মূর্তিটি মহারাজার তাঁবুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালে মহারাজার নিরাপত্তা রক্ষীদের কেউ কিছু একটা অস্তিত্ব টের পেয়ে চেটিয়ে উঠলো, কে কে ওখানে? হুঁশিয়ারী শোনা মাত্রই ছায়ামূর্তিটি অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে রাজার নিরাপত্তা রক্ষীদের ছোঁড়া তীর ছায়া মূর্তিটির পাশ দিয়ে শনশন করে এসে মাটিতে বিদ্ধ হলো। ছায়ামূর্তি জঙ্গলী জন্তুর মতোই ঝোঁপের মধ্যে হারিয়ে গেল। একটু পড়েই শোনা গেল শেয়ালের ডাক। মহারাজার নিরাপত্তা রক্ষীরা মনে করলো, এটি ছিলো শিয়াল! তারা কোন বিপদাশঙ্কা বাদ দিয়ে ছায়ামূর্তিকে খোঁজাখুঁজি না করে আবার নিশ্চিন্ত মনে নিজেদের জায়গায় পায়চারী করতে লাগলো।
এর কয়েক দিন পর মহারাজা রাজ্যপাল দু’জন নিরাপত্তারক্ষীকে ডেকে পাঠালেন। উভয়েই নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এরা মহারাজার অতি বিশ্বস্ত।
সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে এরা দু’জন সবসময় রাজার সঙ্গে থেকেছে এবং মহারাজার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। এদের আনুগত্যও প্রশ্নাতীত। মহারাজার জন্যে এরা নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করবে না। এমনই তাদের আচার-ব্যবহার।
মহারাজার এই দুর্দিনেও এরা দু’জন মহারাজাকে এই আশ্বাস দিয়েছে, মহারাজার যে কোন সিদ্ধান্ত তারা মাথা পেতে নেবে এবং যে কোন বিপদে তাদের জীবন উৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না।
মহারাজা তাদের বললেন, “আমি কনৌজ গিয়ে সুলতান মাহমুদের আনুগত্য মেনে নিতে চাই। কারণ, তার সাথে বৈরীতা করে আমি আমার ভবিষ্যত গড়তে পারবো না।”
মহারাজা চাচ্ছিলেন সুলতান মাহমুদের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে বারীকে রাজধানী রূপে গড়ে তুলতে। কিন্তু পণ্ডিত মহারাণী ও রাজকুমার লক্ষণপাল তার এই সিদ্ধান্তের ঘোরতর বিরোধী ছিল।
এক রাতে মহারাজা তার রাজকীয় পোশাক ত্যাগ করে সাধারণ প্রজার বেশ ধারণ করলেন। অনুরূপ পোশাক তার বিশ্বস্ত দুই সঙ্গীকেও পরালেন। চোখে মুখে মাথায় খেটে খাওয়া শ্রমিকের মতো করে মেটে রঙের প্রলেপ দিলেন। তারা তিনজন যখন বেশ বদল করছিল তখন পণ্ডিত রাজার তাঁবুর দিকে আসছিল এবং দূর থেকে তাদের বেশ বদলের দৃশ্য দেখে পণ্ডিতের মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। সে ঠায় দাঁড়িয়ে গেল, আর অগ্রসর হলো না। সে এমন গোবেচারার ভাব করলো যে, কিছুই দেখেনি। পণ্ডিত সন্ধিগ্ধ মনে সেখান থেকেই ফিরে এলো।
* * *
বেশ ভূষা বদল করার পর মহারাজা ও তার একান্ত দুই সঙ্গী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সাধারণ পথ এড়িয়ে বনভূমির দিকে অগ্রসর হলো। কনৌজের দিকে যাওয়ার জন্য সেখানে একটি মাত্র পথ ছিল। আর এই পথটি ছিল দুটি পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। জায়গাটি ছিল ঘন গাছগাছালি ও ঝোঁপঝাড়ে ভরা। তিনজন অশ্বারোহী একটি পাহাড়ের আড়ালে চলে যাওয়ায় তাঁবুর শিবির তাদের আড়ালে হয়ে গেল। তাঁবুর আড়ালে গিয়ে তারা অনেকটাই স্বস্তির সাথে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগল।
