“তবুও আমরা এখানে বসে তো তামাশা দেখতে পারি না, বললেন, রাজা অর্জুন। দেশ ও ধর্মের জন্যে আমাদেরকে প্রয়োজনে সব কিছু ত্যাগ করতে হবে। মুসলানদেরকে এতো সহজে আমরা হিন্দুস্তান শাসন করতে দেবো না। মুসলমানদের শাসন মানেই হলো, শুধু রাজ্য শাসনই নয় আমাদের ধর্মকর্ম সবই হারাতে হবে।
ঐতিহাসিক গারদিজী, ইবনুল আছির, স্মিথ এবং ফারিশতা লিখেছেন, কালাঞ্জর ও গোয়ালিয়রের রাজা যৌথভাবে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং তারা সিদ্ধান্ত নেন যেভাবেই হোক কনৌজের রাজা রাজ্যপাল কোথায় আছেন তাকে খুঁজে বের করতে হবে। আর রাজা ভীমপালের কাছে দূত পাঠানো হবে। তাকে বলা হবে তিনি যেননা মাহমূদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকেন, যাতে মাহমূদকে সহজেই পরাজিত করা যায়।
সুলতান মাহমূদ গযনী যাওয়ার আগে কনৌজের শাসনভার সেনাপতি আবুল কাঁদেরের কাঁধে ন্যস্ত করে যান। গযনীর ইতিহাসে দু’জন সেনাপতি বেশী খ্যাতি পেয়েছেন। একজন আবু আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আলতাঈ আর অপরজন আরসালান জাযেব। আবুল কাঁদেরের আলোচনা তেমন পাওয়া যায়নি। কিন্তু বেশী আলোচিত ব্যক্তিত্ব না হলেও দায়িত্ব পাওয়ার পর সেনাপতি আবুল কাদের কনৌজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসন এভাবে বিন্যস্ত করেছিলেন যে, কনৌজকে তিনি অজেয় দুর্গে পরিণত করেছিলেন।
মহারাজা কনৌজের খোঁজ পাওয়া সহজসাধ্য ছিল না। পুরোহিত মহারাজা রাজ্যপালকে অজগর দেবতা দিয়ে আতঙ্কিত করতে সক্ষম হয়েছিল। তাছাড়া রাণী ও রাজকুমারের চরম ঔদ্ধ্যত্ব তার সবচেয়ে প্রিয় নর্তকী নদীর বলিদান তাকে চরমভাবে হতাশ করে ফেলেছিল। তিনি এরপর থেকে খুবই কম কথাবার্তা বলতেন।
একদিন রাজকুমার গুহাভ্যন্তরে মহারাজার শয়নকক্ষে গিয়ে মহারাজাকে বললো, বারীকে রাজধানী বানানোর জন্যে আমাকে অনুমতি দিন পিতৃমহারাজ। আমি সেখানে প্রস্তুতি নিয়ে সুলতান মাহমূদকে কনৌজ থেকে বিতাড়িত করবো এবং পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবো। রাজ কুমার আরো বললো, সে গোয়ালিয়র, কালাঞ্জর এবং লাহোরের রাজাদেরকে সঙ্গে নেবে।
“তুমি কি মনে করো সুলতান মাহমূদ তোমাকে নতুন রাজধানী তৈরীর অবকাশ দেবে? জানতে চাইলেন রাজা রাজ্যপাল। তুমি কি জানো, তার গোয়েন্দাদের জাল সর্বত্রই বিস্তৃত। সে যখনই জানবে, বারীতে আমরা যুদ্ধ। প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই সে সেখানে আঘাত হানবে।
“তাহলে কি করবো? এভাবে আমরা কি জঙ্গলেই সারাজীবন লুকিয়ে থাকবোর অনেকটা উত্তেজিত কণ্ঠে বললো রাজকুমার লক্ষণপাল।
“আমি একটি নিরাপদ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করেছি” বললো রাজা। আমি সুলতান মাহমূদের সাথে যোগাযোগ করে কনৌজ চলে যাবো। তাকে বলবো, আপনার যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয় আমরা দিয়ে দেবো এবং আপনার অধীনতাও স্বীকার করে নেবো। তবে তিনি যেনো বারীতে আমাদের নতুন রাজধানী তৈরীর অনুমতি দেন। আমি তার সাথে এমন চুক্তি করতে চাই যে, কখনো তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না, প্রয়োজনের সময় তাকে সৈন্য সাহায্য দেবো।”
“না, আপনার এই চিন্তা ঠিক নয়। আপনি এমন প্রস্তাব নিয়ে কনৌজ গেলে সে আপনার কাছে পুরো ধনভাণ্ডার চেয়ে বসবে। ধন-সম্পদ তার হাতে তুলে না দিলে আপনাকে সে হত্যা করবে।
এমনটি না হলেও আমরা আপনাকে যেতে দিতে পারি না। কারণ, আমরা আর আপনার উপর বিশ্বাস রাখতে পারছি না। আপনার অন্তরে গযনীর সুলতান এমনভাবে আসন গেড়ে বসেছে যে, আপনি সনাতন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করেছেন।
“ওহ্, তার মানে আমি কি তোমাদের হাতে বন্দি?” জানতে চাইলেন রাজা ।
“পণ্ডিতজী বলেছেন, আপনার উপর কোন শয়তান ভূতের আছর পড়েছে।” বললো রাজকুমার লক্ষণপাল। তিনি বলেছেন, এই অপছায়া নর্তকী বলি দানের দ্বারা অপসারিত হবে। পণ্ডিতজী আরো বলেছেন, ভগবান যখন কারো উপর তার ক্রোধ বর্ষণ করতে আসেন, তখন ধর্মের প্রতি তাকে বিদ্বেষী করে তোলেন।
“ধর্ম… ধর্ম…ধর্ম…। এই ধর্ম ধর্ম করে আমি নিঃশেষ হয়ে গেলাম। জেনে রাখো, আমি কারো কয়েদী নই। তুমি বারী চলে যাও, পারলে রাজধানী হিসেবে বারীকে প্রস্তুত করে। মনে রাখবে, আমি তোমার পিতা। তুমিই
একমাত্র আমার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো পুত্র। আমি যে বিষয়টি তোমার জন্যে নিরাপদ মনে করবো তাই করবো।”
* * *
পুরোহিত তার তাঁবুটিকে মহারাজার তাঁবু থেকে একটু দূরে স্থাপন করাল। মহারাজার তাঁবুর মতো পুরোহিতের তাঁবুতেও ছিল তিনটি কক্ষ। একটি কক্ষে সে পূজা অর্চনা করতো। তার তাঁবুতে কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। সে যখন তার কক্ষে নর্তকী নদীকে ডেকে পাঠালো, তখন সে বুঝতে পারলো মহারাজা কেন নদীকে বলি না দেয়ার ব্যাপারে এতোটা কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।
নদীকে যখন পুরোহিত ডেকে পাঠালো নদী এতে বেশ আশ্চর্যান্বিত হলো। কারণ, পুরোহিতরা কখনো কোন নর্তকীর সাথে কথা পর্যন্ত বলে না; তার তাঁবুতে ডেকে পাঠানো তত দূরের কথা! ডাক পেয়ে নদী পুরোহিতের তাঁবুতে হাজির হলো।
“নদী! তুমি পাপের একটা জীবন্ত মূর্তি। তোমার মৃত্যু হলে পরজন্মে তুমি শূকর কিংবা শিয়ালের রূপ ধারণ করবে। তোমার সেই পুনর্জন্ম হবে দুঃখ শোকে স্ত্রী। তোমার অন্তরাত্মা সব সময় দুঃখ ভারাক্রান্ত থাকবে। প্রথম জন্মকে স্মরণ করে করে তুমি দুঃখের সাগরে ভাসবে। এতো পাপ করার পরও জানি না হরিহরি মহাদেব তোমার প্রতি এতোটা প্রসন্ন কেন হয়ে গেলেন। তিনি তোমাকে নিজের স্ত্রী বানানোর ইচ্ছা পোষণ করেছেন। দেবতাদের ইচ্ছাই নির্দেশ। নদী! তুমি হয়তো বর্তমান জীবন ত্যাগ করতে চাইবে না কিন্তু তুমি যখন আকাশের রাণী হবে তখন তোমার অন্তর আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে।”
