এদের ধর্ম যদি সত্য হয়ে থাকে তবে এদের যে সব দেবদেবীকে তোমরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যাদের ভগ্নাবশেষ তোমাদের পায়ের নীচে পড়ে আছে এদেরকে বলো না, তাদের উৎখাতের প্রতিশোধ নিতে। সেই ঝড়তুফানের রাতে বিদ্যুৎপাত ও বজ্রাঘাত হয়েছে, তোমরা তখন নির্বিঘ্নে ঘুমিয়েছো, আর ওরা সেটিকে দেবতার ক্রোধ ভেবে রাতভর পেরেশান হয়ে পূজা-অর্চনা করেছে। বলো, রাতের তুফান কি তোমাদেরকে সামান্যতম আতঙ্কিত করেছে? ঝড় বৃষ্টিকে কি মুসলমানরা ভয় করতে পারে? কিন্তু সেই রাতে তোমরা যদি হিন্দুদের অবস্থা দেখতে তাহলে তোমাদের হাসি পেতো, ওরা সারারাত রাম রাম হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ জপতে জপতে নিধুম কাটিয়েছে…।
বন্ধুগণ! সত্য-সততা এবং ঈমান ও ইহসান তোমাদের শক্তি। ঈমানের শক্তির সামনে কোন মিথ্যার দুর্গ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তোমাদের যে রক্ত এ জমিনে পড়েছে তা ফুলের মতোই খুশবো ছড়াবে এবং এই জমিন আল্লাহর নূরে আলোকিত হবে।”
* * *
মুসলমানদের কনৌজ বিজয়ের ডংকা দেড়শো মাইল দূরের কালাঞ্জর ও একই দূরত্বের গোয়ালিয়র পর্যন্তও পৌঁছে। কনৌজ থেকে কিছু হিন্দু সেনা কালাঞ্জর পৌঁছে এ খবর আগ্নেয়গিরির মতো ছড়িয়ে দিলো যে, মুসলমানরা কন্নৌজ দখল করেছে এবং সেখানকার মহারাজাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
কালাঞ্জরের রাজা গুন্ডা কয়েক পক্ষকাল থেকে শুধু শুনে আসছিলেন, অমুক রাজ্য মুসলমানরা দখল করে নিয়েছে। অমুক রাজা মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে। অমুক রাজা রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গেছে। গুন্ডা আরো শুনতে পাচ্ছিলেন, অমুক রাজ্যের রাজা হাতিয়ার ফেলে দিয়ে সুলতান মাহমূদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। অমুক রাজা সুলতান মাহমুদের সাথে মৈত্রি চুক্তি করেছে। রাজা গুভা এভাবে সুলতান মাহমূদের অগ্রাভিযানের প্রতি দৃষ্টি রাখছিলেন। এখন তো সুলতান মাহমূদ বলতে গেলে তার দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত। কারণ, সেই অমিততেজী গযনীর যোদ্ধাদের কাছে দেড়শো মাইলের দূরত্ব তেমন দূরত্ব ছিল না। রাজা গুন্ডা এ খবর পাওয়ার পরপরই গোয়ালিয়র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাজা গুন্ডা যখন গোয়ালিয়র পৌঁছলেন, তখন তিনি জানতে পারলেন, তার আসার আগেই কনৌজ পতনের খবর গোয়ালিয়র পৌঁছে গেছে। গোয়ালিয়রের রাজা অৰ্জুন এ ব্যাপারে অবগত। রাজা গুন্ডা কনৌজ পতনের সংবাদে চিন্তিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষুব্ধও ছিলেন। তিনি কনৌজের মহারাজা রাজ্যপালের মোকাবেলা না করে পালিয়ে যাওয়াটাকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অথচ সংবাদবাহীরা তাই বলছিলো। লোকজন বলছিলো, রাজধানীতে মাত্র কিছু সংখ্যক সৈন্য অবস্থান করছিল। মুসলিম সৈন্যরা অনায়াসে কোন প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েই শহরে প্রবেশ করে। রাজাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। গযনী বাহিনী শহরে প্রবেশ করেই ধ্বংসযজ্ঞ রু করে।
কালাঞ্জরের রাজা গুন্ডা আর গোয়ালিয়রের রাজা অৰ্জুন দু’জনে মিলে একটি যৌথ পরিকল্পনা করলো যে, গোয়েন্দাদের মাধ্যমে সুলতান মাহমুদের প্রতি নজর রাখা হবে এবং গযনী সুলতানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে তিনি কনৌজেই অবস্থান করেন না ফিরে যান। সুলতান মাহমূদ যদি কনৌজ অবস্থান করে তাহলে তার উর সেখানেই আক্রমণ করা হবে এবং এই আক্রমণে লাহোরের রাজা ভীমপালের সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কালারের মহারাজা তখনো গোয়ালিয়রে অবস্থান করছিলেন, এমন সময় কন্নৌজ রাজদরবারের এক ঊর্ধ্বতন অফিসার সেখানে পৌঁছল। এই কর্মকর্তা কালার হয়ে গোয়ালিয়র পৌঁছে। কালাঞ্জর গিয়ে এই কর্মকর্তা শুনতে পায় কালাঞ্জরের রাজা গুন্ডা গোয়ালিয়র চলে গেছেন। কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গেই গোয়ালিয়র রওয়ানা হয়ে যান।
গোয়ালিয়র পৌঁছে কনৌজের সেই কর্মকর্তা রাজা শুভা ও রাজা অর্জুনকে জানায়, “কনৌজের মহারাজা কনৌজ অবরোধের আগেই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। গযনীর সুলতান মাহমূদ কনৌজ পৌঁছে যখন খাজাঞ্চীখানা খুললেন, তখন সেখানে কিছুই পাওয়া গেল না। রাজমহলের রাণীদের অলঙ্কারগুলোও ছিল নিরুদ্দেশ। সেই সাথে রাজমহলও ছিল লোকশূন্য। দুর্গে সৈন্যও ছিল হাতে গোনা।
এর অর্থ হলো, মহারাজা রাজ্যপাল শত্রুকে দেখার আগেই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন, বললেন কালারের রাজা শুভা। সেই সাথে তিনি সেনাবাহিনীর একটি অংশও সাথে নিয়ে গেছেন।
হিন্দুজাতি কি তার এই অপরাধ ক্ষমা করতে পারবে? বললেন গোয়ালিয়রের রাজা অর্জুন।
“এটা কি জানা সম্ভব হয়নি তিনি কোথায় গিয়েছেন?” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সেই কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলেন অর্জুন।
“না, তা জানা সম্ভব হয়নি।” জবাব দিলো কর্মকর্তা। আর দ্বিতীয় খবর হচ্ছে, সুলতান মাহমূদ গযনী ফিরে গেছেন।
“তার সেনাবাহিনী কোথায়?” জানতে চাইলেন অর্জুন।
“কিছুসংখ্যক এখানে রয়েছে আর কিছুসংখ্যক তিনি সাথে নিয়ে গেছেন।
“এমন তো নয় যে, মহারাজা রাজ্যপাল গোপনে সুলতান মাহমূদের সাথে কোন প্রকার চুক্তি করে বসেছেন?” উমামাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন রাজা অর্জুন। আর এই চুক্তি মতে তার সাথে নেয়া সৈন্যদেরকে তিনি প্রয়োজনের সময় মাহমূদের সাহায্যের জন্য দিয়ে দেবেন?
“যেহেতু আমরা এর কিছুই এখনো জানি না, তাই আমাদেরকে ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে” বললেন রাজা শুভা। রাজা রাজ্যপালকে আমরা গোটা হিন্দুস্তানের একজন অভিভাবক মনে করতাম, কিন্তু লোকটি ধারণাতীত কাপুরুষতার পরিচয় দিলো। মথুরা, মহাবন, বুলন্দশহর আর মুনাজের সৈন্যবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু লাহোরের রাজা ভীমপালের দিকে এখনও একটু তাকানো যায়। কিন্তু তিনিও তো আবার গয়নীর মাহমূদের সাথে চুক্তি করে বসে আছেন। তাই তিনি সরাসরি আমাদের সঙ্গ দেবেন না।
