গযনীর সৈন্যদের সাথে সব সময়ই কিছুসংখ্যক ইমাম ও ধর্মীয় পণ্ডিত ব্যক্তি থাকতেন। তারা সৈন্যদের নামাযের ইমামতি করতেন এবং সৈন্যদের ধর্মীয় বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত করতেন।
গযনীর খতীব কনৌজের প্রধান মন্দিরের বেধিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল ভাঙা মূর্তির টুকরো। আর তার সামনে ছিল গযনীর বিজয়ী সৈন্যদের একটা অংশ। তার পেছনে কনৌজের বন্দী সৈন্যরা দাঁড়িয়ে ছিল।
খতীব জলদগম্ভীর কণ্ঠে আবারো উচ্চারণ করলেন, বন্ধুগণ! দেখে নাও, এই হলো হিন্দুদের ধর্ম। ওদের পূজনীয় মাটি পাথরের দেব-দেবী ভাঙা টুকরো এখন তোমাদের পায়ের নীচে। আল্লাহ্ এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তোমরা কোন রাজ্য জয় করার জন্যে কিংবা লুটপাট, মারামারি করার জন্যে এখানে আসোনি। তোমরা এখানে এসেছে, এই বাতিল ধর্মের শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে। হয়তো তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এজন্য আমরা হিন্দুস্তানকে কেননা বাছাই করেছি? এর জবাব হলো, আরব দেশের এক ক্ষণজন্মা বীর মুজাহিদ মুহাম্মদ বিন কাসিম নির্যাতিতা একজন মুসলমান তরুণীর আহ্বানে ভারতে এসেছিলেন। তিনি নির্যাতিতা তরুণীকে উদ্ধার করতে এসে এখানকার এক জালেম অত্যাচারী রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি এখানকার অধিবাসীদের জন্যে ত্রাস ও আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করেননি। তিনি ও তার সঙ্গীরা এদেশের মানুষের কাছে এ সত্য প্রমাণ করেছিলেন, মুসলমানদের তরবারী পাহাড়ের চূড়া কেটে ফেলতে পারে কিন্তু তাদের আচার-ব্যবহার পাথরকেও মোমের মতো গলিয়ে দিতে পারে…।
মুহাম্মদ বিন কাসিম এখানকার পাথরসম কঠিন মনের অধিকারী পৌত্তলিকদের হৃদয় গলিয়ে তাদের অন্তর জয় করেছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম এখানকার পাথরদিল মানুষগুলোকে মোমে পরিণত করেন, ফলে এখানকার মূর্তিগুলো নিজ থেকেই ধ্বংস হতে শুরু করে। হিন্দুরা মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তার সঙ্গীদের উত্তম চরিত্র, বৈষম্যহীন সাম্যের নীতি, আদর্শিক জীবন এবং উচ্চ মানসিকতার জীবন্ত দৃষ্টান্ত দেখে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা নিষ্পেষিত নির্যাতিত হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হতে শুরু করে। ফলে ভারতের পশ্চিম উত্তরাংশের মানুষ ইসলামের আলোয় আলোকিত হলো। একই সাথে ইসলামের আলো গোটা ভারত জুড়ে বিকশিত হতে শুরু করে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মুসলিম কেন্দ্রীয় শাসকের মধ্যে এমন পরিবর্তন সাধিত হলো যে, ইসলামের বীর মুজাহিদ দিগ্বিজয়ী অবিস্মরণীয় বিন কাসিম কেন্দ্রীয় শাসক তাকে অপরাধী বানালো। মুহাম্মদ বিন কাসিম এক লম্পট খলিফার ব্যক্তিগত শক্রতার শিকারে পরিণত হলেন।
বিন কাসিম হিন্দুস্তান ত্যাগ করার পর এখানকার হিন্দু শাসকরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো এবং হিন্দুদের ক্রমবর্ধমান প্রাবল্যে এক সময় মসজিদগুলো পুনরায় মন্দিরে রূপান্তরিত হতে শুরু করলো। সেই সাথে হিন্দু শাসকরা এখানকার মুসলমানদের জীবন সংকীর্ণ করে তুললো। অবস্থা এমন হলো যে, মুসলমানদের জীবন ধারণই হয়ে পড়লো কঠিন। হিন্দুরা মুসলিম নিধনকে মিশন হিসেবে গ্রহণ করলো। ফলে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ নওমুসলিমরা আবারো পৌত্তলিকতায় ফিরে গেলো। আর প্রকৃত মুসলমানরা জীবন-মরণ সমস্যার সম্মুখীন হলো…….।
গযনীর বীরযোদ্ধা ভাইয়েরা! তোমরা শুধু গযনীর পতাকা বহন করছে না, তোমরা ইসলামের পতাকা বহন করছে। যে জমিন এক সময় দারুল ইসলামে পরিণত হয়েছিল সেটি পুনরায় দারুল কুফরে পরিণত হলো। সত্যের উপর মিথ্যা বিজয়ী হতে শুরু করলো।
তোমরা পৌত্তলিকতা কী জিনিস সেটি বুঝতে চেষ্টা করো। হিন্দু জাতি সাপের মতো। বিষধর সাপের মতোই এদের স্বভাব। এরা সাপকে পূজা করে । এরা আল্লাহর একক সত্তা সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখে না। যে গঙ্গা ও যমুনা নদীকে তোমরা কয়েকবার এপার ওপার করেছে, এই নদী দুটিকেও এরা দেবতা মনে করে। এই নদী দুটির অপরিষ্কার পানিকেও এরা পবিত্র মনে করে পূজা করে। এরা গঙ্গা যমুনায় গোসল করে মনে করে গঙ্গা যমুনার পানি সব পাপকে ধুইয়ে ফেলেছে। আকাশের বিদ্যুৎপাত বজ্রপাতকে দেবতার ক্রোধ বলে বিশ্বাস করে এবং সে সময় হিন্দুরা মন্দিরের ঘণ্টা বাজাতে শুরু করে। কোন বড় অজগর সাপ দেখলে সেটিকে পূজা করতে থাকে। হিন্দু নামের জ্ঞানপাপীগুলো তাদের দেবদেবীদের খুশী করতে জীবন্ত তরুণী কিশোরীকে হত্যা করে দেবতার নামে উৎসর্গ করে দেবতাদের খুশী করতে চেষ্টা করে। তোমরাই বলো, মানুষের রক্তে পাথরের মূর্তির পা ধোয়াকে কি কোন সজ্ঞান মানুষ সমর্থন করতে পারে? এটাকে কি আদৌ ইবাদত বলা যায়?……..
ইসলামের সৈনিকেরা! তোমরা এখানে হিন্দু পুরোহিত পণ্ডিতদের এই মূর্খতার মূলোচ্ছেদ করতে এসেছো। তোমরা যদি এই জমিন থেকে পৌত্তলিকতা সমূলে উৎখাত করতে না পারো তাহলে এই জমিনে কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। কিছু আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতিকে এরা ধর্মজ্ঞান করে। এ কারণে এরা সব সময়ই মুসলমানদের শিকড় কাটতে থাকবে। সত্যিকার অর্থে হিন্দুত্ব কোন ধর্ম নয়। হিন্দু ঠাকুর পুরোহিত ও পণ্ডিতেরা সাধারণ হিন্দুদেরকে দেবদেবীর ভয় দেখিয়ে তাদের মনগড়া ভ্রান্ত ধারণাকেই ধর্ম হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে। যুগ যুগ ধরে এখানকার মানুষ অন্ধের মতো মণি-ঋষী ঠাকুর-পণ্ডিত ও পুরোহিতদের বানানো রীতি-রুসমকেই ধর্ম বলে বিশ্বাস করছে।
