এক পর্যায়ে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে শুর করল। পুরোহিত নানা কথায় মহারাজাকে বুঝাতে চেষ্টা করল এটি সাপ নয় সাপের রূপ ধারণ করে দেবতা এসেছেন। সব শুনে মহারাজা নিশুপ হয়ে গেলেন। পুরোহিত তাকে বললো, আপনার আর বাইরে বের হওয়ার দরকার নেই। বাইরের পরিস্থিতি আমরা সামলাবো। আপনি গুহার ভেতরেই শুয়ে বিশ্রাম নিন, আরামে একটু মিয়ে নিন।
***
পরদিন সূর্য যখন অনেক উপরে ওঠে গেছে তখন মহারাজার ঘুম ভাঙল। তিনি চোখ খুলে গুহার চতুর্পাশটা দেখলেন। সেখানে তখন পণ্ডিত ছিল না, পুরোহিতের রশিতে বাধা সাপও ছিল না। লক্ষণপালকে গুহার কোথাও দেখা গেল না।
অনেকক্ষণ পর পুরোহিত গুহায় প্রবেশ করলে মহারাজা জিজ্ঞেস করলেন, “গতরাতের অজগর সাপটি কি মেরে ফেলা হয়েছে।
“এটি অজগর নয় মহারাজা! এটি দেবতা! বললো পুরোহিত। দেবতা আপনাকে সে কথাই বলতে এসেছিলেন যে কথা আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। শুরুতে আমিও অজগরটিকে সাপই মনে করেছিলাম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম, এতো বড় অজগরকে বশে আনা কোন মানুষের সাধ্যের ব্যাপার নয়। আমি দেবতার ইঙ্গিত পেয়ে সেটিকে রশি দিয়ে বেধে ফেলি যাতে আপনারা আতঙ্কিত না হন।
আপনি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, তখন রাজকুমারও চলে গেলেন। নির্জন পরিবেশ পেয়ে অজগর রূপধারণকারী দেবতা আমাকে তার আসল রূপ দেখাল। আমি তার সাথে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেবতা আমাকে বললেন, মন্দিরের ধ্বংস এবং আমাদের অবমাননা বন্ধ করাও এবং এর কঠিন প্রতিশোধ নাও। আমরা খুবই কষ্ট পাচ্ছি। আমরা যখন মর্তে আসি তখন বিদ্যুৎ চমকে চমকে আমাদের পথ দেখায় এবং বৃষ্টি আমাদের পথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেয়। আমরা এসব বিদ্যুৎপাত ও বজ্রপাত মুসলমানদের উপরও ফেলতি পারি কিন্তু আমরা তা না করে তাদেরকে সনাতন ধর্মে ফিরে আসার অবকাশ দেই…। দেবতা আমাকে জোর দিয়ে বলেছেন, তুমি তোমার রাজাকে বলো, রাজধানী থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করে আযানের ধ্বনি বন্ধ করতে। আযানের আওয়াজের কারণে আমরা খুবই অশান্তি বোধ করছি।”
“আচ্ছা! আপনার দেবতা পরে কোথায় চলে গেলেন?”
“যেখান থেকে এসেছিলেন সেখানেই চলে গেছেন।” জবাব দিলো পুরোহিত। আমি তার পায়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেছি। আপনার পক্ষ থেকেও ক্ষমার জন্যে আমি তার কাছে করজোড় নিবেদন করেছি। কিন্তু তিনি আপনার প্রতি খুবই নারাজ। তিনি বলেছেন, তার সৃষ্টি বিদ্যুৎপাত এখানকার পাহাড় পবর্ত পুড়ে ফেলার জন্যে এসেছিল। আমাদের সবাইকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করতে এসেছিল। দেবতা বলছিলেন, তোমাদের রাজার ধন-সম্পদ মাটি চাপা দেয়া উচিত। যাতে আর কোনভাবেই উদ্ধার করতে না পারে। কিন্তু আমি এসব শুনে তার পায়ে পড়ে নিবেদন করেছি, বহু অনুনয় বিনয় করে তাকে রাজি করিয়েছি। অবশেষে তিনি একটি নর্তকীর বলিদানের বিনিময়ে আমাদের ধ্বংস করা এবং আপনার ধন-রত্ন মাটি চাপা দেয়া থেকে বিরত রইলেন। তার ইঙ্গিতে বলিদানের জন্যে আমি নর্তকীও নির্বাচন করে ফেলেছি।
“কোন নর্তকী!’ জানতে চাইলেন মহারাজা। “নদী।”
“না। তা হবে না পণ্ডিতজী! আমি কোন অবস্থাতেই নদীকে নরবলি হতে দেব না।”
“আপনি গযনীর সুলতানের মোকাবেলা করতে পারেন নি; সেখানে আপনি দেবতাদের মোকাবেলা কি ভাবে করবেন?” উম্মামাখা কণ্ঠে বললেন মহারাণী । দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্যে নদীকে বলি দিতেই হবে?”
“তুমি চুপ থাকো, ধমকে উঠলেন মহারাজা।”
“পতি কোন দেবতা না কিন্তু দেবতা পতি হতে পারে, আমাকে দেবতাদের নির্দেশ মানতে পতির বিরুদ্ধাচরণ হলেও তা করতে হবে।” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন মহারাণী।
“পিতা মহারাজ! আমাকে আপনি তরবারী চালনা শিখিয়েছেন, ছেলের তরবারীতে পিতার মাথা দ্বিখণ্ডিত হোক আমাকে সে রকম কাজে বাধ্য করবেন না।” কাছেই দাঁড়ানো রাজপুত্র লক্ষণপাল তার বাবার উদ্দেশ্যে দৃঢ়কণ্ঠে বললো । কোন সুপুত্র পিতার পথভ্রষ্টতার জন্যে তার দেশ জাতি ও ধর্মকে বিসর্জন দিতে পারে না। পণ্ডিতজী যা বলছেন তাই হবে।”
পিতা মহারাজ! আমি ভালো করেই জানি, আপনি আপনার ধর্মত্যাগ করেননি কিন্তু আপনি গযনী সুলতানের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন যে, আপনার মনমস্তিষ্ক থেকে এই আতঙ্ক দূর করতে পারছেন না।”
মহারাজা রাজ্যপাল যখন রাণী ও একমাত্র পুত্রের চরম সীমাহীন ঔদ্যত্য এবং তাদের কণ্ঠে জীবনের হুমকি উচ্চারিত হতে দেখলেন তখন চুপসে গেলেন। তিনি আর কোন কথাই বললেন না। তিনি পণ্ডিতের কাছে একথাও জিজ্ঞেস করার সাহস পেলেন না, দেবতাগণ শুধু তাকেই ধ্বংস করার শপথ কেন নিয়েছে। মথুরা কনৌজের চেয়েও পবিত্র নগরী ছিল। সেটা কৃষ্ণমহারাজের জন্মভূমি। থানেশ্বরের মন্দির ও হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র জায়গা ছিল। সেখানে এখন শাখা ঘন্টার ধ্বনির বদলে আযানের ধ্বনি গুঞ্জরিত হচ্ছে, কিন্তু দেবতারা তো সেখানকার কোন রাজাকে অজগর সেজে এসে ভয় দেখাননি?”
মহারাজা প্রত্যক্ষ করলেন, তার রাণী ও রাজকুমারের উপর দেবতাদের ক্রোধের আতঙ্ক গেড়ে বসেছে। তখন আর কোন কথা না বলে তিনি যে গুহার ভেতরে তার ধনরত্ন রেখেছিলেন সেখানে চলে গেলেন।
এই তো হলো হিন্দুদের ধর্ম। কল্লৌজের প্রধান মন্দিরের সামনের বিজয়ী কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল এই ধ্বনি। এই আওয়াজ ছিল সেই প্রধান খতীবের যিনি সুলতান মাহমুদের সাথে গযনী থেকে এসেছিলেন।
