বাইরের শোরগোল গুনে গুহার মুখ থেকে রাজা ও পণ্ডিত দেখতে পেলেন, ঠিকই পানি গুহার দিকেও গড়িয়ে আসছে। সেই সাথে ভয়ানক বিদ্যুৎত্তমক ও বজ্রপাতের শব্দ। এর মধ্যে লোকজন দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছে।
এক সময় লক্ষণপাল দৌড়াতে দৌড়াতে গুহার মধ্যে এসে পড়ল। গুহাটি ছিল দুটি পাহাড়ের মাঝখানে। তাদের জানা ছিল নীচের এলাকাটিতে উপর থেকে বন্যার মতো পানি নেমে আসে। দেখতে দেখতে পানির স্রোত আরো বেড়ে গেলো। এ অবস্থায় মহারাজার নিরাপত্তা রক্ষীরা জীবন বাঁচানোর জন্যে উঁচু জায়গার দিকে দৌড়াচ্ছিল।
এক সময় গুহার ভেতরেও পানি প্রবেশ করতে শুরু করলো। কিন্তু গুহার মুখ উঁচু থাকার কারণে ভেতরে বেশী পানি প্রবেশ করলো না।
এমন সময় পুরোহিত মহারাজার উদ্দেশ্যে বললো–
“মহারাজ! এটাই হরিহরি মহাদেবের ক্রোধ। মহাদেবের কাছে আত্মসমর্পণ করুন, ক্ষমা চান, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুন। আপনি কি জীবনে কখনো এমন বৃষ্টি দেখেছেন?”
“মহারাজা পুরোহিতের কথা শুনে অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়লেন। উন্মাদের মতো হাসি। দীর্ঘ অট্টহাসি হেসে তিনি বললেন, আরে এই বৃষ্টি আমার কি ক্ষতি করবে, এই বিদ্যুশ্চমক আর বজ্রপাত আমার কি ধ্বংস করবে? নিয়ে যাও তোমার এসব ধন-সম্পদ।
রাজার কথা শুনে পুরোহিত বৃষ্টি ও তুফানের মধ্যে গলা চড়িয়ে বললো, “আপনার কি হয়েছে মহারাজ! বাইরে দৈত্য-দানব চিৎকার করছে এটাকে একটু বোঝার চেষ্টা করুন। দেবতার এই ক্রোধকে অনুভব করার চেষ্টা করুন। আমি যা বলি তা করুন, হাত জোর করে ক্ষমা ভিক্ষা চান, আমি মুখে যা আওড়াচ্ছি আপনিও তা বলতে থাকুন।
পুরোহিতের কথা শুনে মহারাজা আরো হাসলেন। অনতি দূরে দাঁড়ানো নওজোয়ান দু’সাহসী যোদ্ধা লক্ষণপাল ভয়ে আতঙ্কে কী যেন বিড়বিড় করে বলছিল আর দু’হাত লম্বা করে দেবতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছিল। হঠাৎ সে আর্তচিৎকার করে বলে উঠলো
“ওই যে দেখো, এটা কি আসছে…!
মহারাজা ও পুরোহিত একই সঙ্গে গুহার সম্মুখের দিকে তাকালে দেখতে পেলেন বিশাল এক অজগর যার মাথাটা একটা গরুর মাথার মতো বিশাল, গুহার ভেতরের দিকে ঢুকছে। লক্ষণপালের হাতে তরবারী ছিল সে তরবারী কোষমুক্ত করে ফেলল। অজগরটি খুব ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে গুহার ভেতরের দিকে আসছিল। হয়তো পানির স্রোত সেটিকে আপন ঠিকানা থেকে ভাসিয়ে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের অজগর সাধারণ স্যাঁতসেতে কাদাপানিতে থাকে। যদি সেখানটায় আহার না পাওয়া যায় তাহলে ডাঙ্গায় চলে আসে। এ ধরনের অজগরের অভাব হলো এরা জীবন্ত মানুষ কিংবা জীবন জন্তু আস্ত গিলে ফেলে। এরপর দুই তিন মাস পর্যন্ত আর কোন আহার করে না। ঠায় পড়ে থাকে।
অজগরটি লম্বায় অন্তত দশ হাত হবে। লক্ষণপাল যখন সেটিকে মারার জন্যে তরবারী কোষমুক্ত করে প্রস্তুতি নিল তখন পুরোহিত তাকে আঘাত না করার নির্দেশ দিলো। মহারাজা রাজ্যপাল সাপ দেখে নিজ অবস্থান থেকে কয়েক কদম পিছনে সরে এলেন। পুরোহিত কালবিলম্ব না করে মশালটিকে হাতে নিয়ে অজগরটির সামনে তুলে ধরলো। অজগরটি তখনো পুরোপুরি গুহায় প্রবেশ করেনি।
পুরোহিত জানতে এ ধরনের অজগর বিষাক্ত নয়, এরা ছোবল মারে না। ক্ষুধা পেলেই কেবল আহার করতে কোন জীবজন্তুকে গিলে ফেলতে চেষ্টা করে।
মহারাজা তখন পুরোহিতকে বললেন, পণ্ডিতজী মহারাজ! আপনি তো সাপ ধরতে এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারদর্শী? এটিকেও কি আপনি কাবু করতে পারবেন?”
পুরোহিত তার দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেছিল অজগরের দিকে। পুরোহিত অজগর ও নিজের মধ্যে মশাল দিয়ে একটি আড়াল সৃষ্টি করেছিল। এ অবস্থাতেই পুরোহিত মহারাজার দিকে না তাকিয়েই বললো, মহারাজ! এটি যদি পৃথিবীর অজগর হয়ে থাকে তবে আমি অবশ্যই এটিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারব। কিন্তু মহারাজ! এটি সাধারণ কোন অজগর সাপ নয়, এটি দেবতা। এরপর পণ্ডিত একটি মন্ত্র বলে মহারাজাকে এটি আওড়াতে বললো। সেই সাথে বললো, মহারাজ! হরি কৃষ্ণ আপনার দ্বারা বড় ধরনের কোন কাজ নিতে চান।
কিছুটা ভীতবিহ্বল অবস্থায় মহারাজা ও লক্ষণপাল পুরোহিতের মন্ত্র আওড়াতে থাকল। পণ্ডিত মশালের হাতল ধরে আগুনের শিখাকে অজগরের মুখের সামনে ধরে রাখল। এর ফলে অজগরটি সামনে অগ্রসর না হয়ে সেখানেই কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করল। ফাঁকে ফাঁকে অজগরটি মাথা উঁচু করে এদিক ওদিক দেখতে চেষ্টা করছিল। পুরোহিত লক্ষণপালকে বললো, গুহার ভেতরে মোটা একটা রশি আছে সেটা নিয়ে এসো।
লক্ষণ দৌড়ে গুহার ভেতরে গিয়ে সেখান থেকে মোটা লম্বা একটি রশি এনে পুরোহিতের হাতে ধরিয়ে দিল। রশি আনার পর পুরোহিত লক্ষণপালকে মশালটি দিয়ে বললো, এটি সাপের সামনে ধরে রাখবে। পুরোহিত রশিটি দিয়ে ফাঁদ তৈরী করল। অজগর মশালের কারণে সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অজগর যখন আবার মাথা উঁচু করল পুরোহিত তখন রশির তৈরী ফাঁদ অজগরে মাথার উপর দিয়ে নিক্ষেপ করলে অজগরের মাথা ফাঁদে আটকে গেল। এবার পুরোহিত রশি টান দিল। তাতে ফাঁদ আটকে অজগরের মুখ খুলে গেল এবং অজগরের বিশাল দেহ কাঁপতে শুরু করল। পুরোহিত তখন এক লাফে অজগরের উপর উঠে পড়ল এবং রশিটি টেনে শক্ত করে সাপের কুণ্ডলী পাকানো শরীর বেধে ফেলল। এবার সাপটির আর নড়াচড়া করার ক্ষমতা থাকল না। পুরোহিত ঠিকই সাপকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল।
