এর পরবর্তী রাতে রাজ্যপালের তাঁবুতে জমজমাট নাচগানের আসর বসলো। শরাবের আয়োজন রাজার সাথেই ছিলো। রাতের অন্ধকারে প্রচুর মশাল জ্বালিয়ে বিজন জঙ্গল ভূমিকে রাজপুরী বানিয়ে ফেলা হলো। বাদক দলের বাজনার তালে তালে রাজার বিশেষ নর্তকীরা দেহ উজাড় করে নাচলো গাইলো। রাজার সকল নিরাপত্তারক্ষীকেই প্রচুর পরিমাণে উপহার উপঢৌকন দেয়া হলো। বিশেষ করে যারা ধন-রত্ন লুকানোর কাজে জড়িত ছিলো তাদেরকে রাজ্যপাল বিপুল পরিমাণ সোনাদানা দিয়ে খুশী রাখতে চাইলেন। কারণ, এখন রাজ্যপালের জীবন সম্পদ তাদের বিশ্বাস ও আস্থার উপর নির্ভশীল হয়ে পড়েছিল।
রাতের এই আসরে দু’জন লোক অনুপস্থিত ছিলো। একজন পণ্ডিত আর দ্বিতীয়জন তার প্রথম ও প্রধান রাণী। মহারাজা রাজ্যপাল এই দুজনের অনুপস্থিতিকে কিছুই মনে করেননি। পুরোহিত তার তাঁবুতে পূজা-অর্চনায় লিপ্ত ছিলো। সে ছোট দুটি পুতুলের মতো মূর্তি তার সাথে নিয়ে এসেছিল। পুরোহিত যখন পূজায় মগ্ন এমন সময় রাণী তার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। বড় রাণীর দেহে বার্ধক্যের ছাপ পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। মহারাজা এই রাণীকে বেশ গুরুত্ব দিতেন, যেহেতু রাজার স্থলাভিষিক্ত রাজকুমার লক্ষণ পালের জন্মদাতা মা তিনি। রাণী এসে পুরোহিতের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে গেলেন।
“মহারাণী! আপনি কি বুঝতে পেরেছেন মহারাজার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? রাণীকে জিজ্ঞেস করলো পুরোহিত। এটা কি আনন্দ উৎসব আর শরাব পান করে নর্তকী নাচানোর সময়?”
“না আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন আমি মহারাজাকে নিয়ে ভাবছি না। আমার সকল মনোযোগ এখন রাজকুমারকে কেন্দ্র করে। আমার কলিজার টুকরো রাজকুমারের ভবিষ্যত অন্ধকার। বারী এখনো আমাদের হাতে আছে। ইচ্ছা করলে আমরা একে কনৌজের মতো রাজধানীতে রূপান্তরিত করতে পারি। কারণ, কনৌজ আর আমাদের পক্ষে ফিরে পাওয়া অসম্ভব। ….. আমি তো মনে করছি মহারাজার মাথা বিগড়ে গেছে। আমি তাকে কোন কথা জিজ্ঞেস করলেই তিনি আমাকে ধমকে দেন।
“তোমার সাথে রাজনীতির কি সম্পর্ক পণ্ডিত মহারাজ! এ সময়ে আপনি কি কিছু করতে পারেন না? আপনি যাদুটোনা করে কিছু একটা দেখান না। আপনার তো অনেক ক্ষমতা আছে।”
“হ্যাঁ, রাণী। আমিও তাই ভাবছিলাম। মহারাজার চিন্তা চেতনাকে কাবু করতে হবে। বললো পুরোহিত। আমি হিসাব করে দেখেছি, দেবীর চরণে একটি নর বলি দেয়া দরকার। একটি কুমারীর রক্ত ঝরাতে হবে।”
“কুমারী মেয়ে কোথায় পাওয়া যাবে।”
“তেমন মেয়ে আমি দেখেছি। ওই যে সবচেয়ে ছোট নর্তকীটা আছে না, যার নাম নদী।”
“আপনি তাই করুন। আপনি যখন চাইবেন তখনই ওকে বলি দিতে পারেন। ও সুন্দরী ও তরুণী। হ্যাঁ এমন মেয়েকেই নর বলি দেয়া উচিত। বললেন রাণী।
* * *
বারী কনৌজ থেকে দুই তিন দিনের দূরত্বে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী একটি জনপদ। এলাকাটি ছিল কনৌজের অধীনস্থ। অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, কল্লৌজ ত্যাগ করে কিছুদিন দুর্গম জঙ্গলে সেচ্ছা নির্বাসনে কাটানোর পর মহারাজা রাজ্যপাল বারীকে তার রাজধানী করেছিলেন এবং তার ছেলে লক্ষণপালকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। লক্ষণপাল সেখানে গিয়ে বারীকে পরিপূর্ণ রাজধানীতে পরিণত করার জন্যে বিভিন্ন ধরনের ইমারত নির্মাণ করেছিল। মহারাজা রাজ্যপাল আগেই তার সেনাবাহিনীকে বারী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাসনে থাকাবস্থায় তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না আসলে তিনি কি করবেন। কারণ, সুলতান মাহমূদের আতঙ্ক তার মনে ভূতের মভোই গেড়ে বসেছিলো। ঐতিহাসিক আলজওযী তো একথাও লিখেছেন, পর্দার অন্তরালে মহারাজা রাজ্যপাল ইসলাম গ্রহণের প্রতিও আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।
স্বেচ্ছা নির্বাসনে মহারাজার প্রায় মাস দুয়েক কেটে গেছে। এ সময় একরাতের ঘটনা। হঠাৎ করে আকাশে গর্জন শোনা গেল। সেই সাথে চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে এলো। শুরু হলো তীব্র বাতাস। এ সময় পণ্ডিত তার তাঁবুতে পূজা অর্চনায় লিপ্ত ছিল। হঠাৎ এক সময় ধারে কাছেই কোথাও বজ্রপাত ঘটলো এবং বিদ্যুৎ চমকানোর তীব্র আলোয় সবার চোখে অন্ধকার নেমে এলো। ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকে জঙ্গলকে মনে হচ্ছিলো ধবধবে সাদা আলোয় আলোকিত ময়দান। এমন প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত শুরু হলো, মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়েছে। এ সময় মহারাজা রাজ্যপাল ছিলেন সেই গর্তে যে গুহায় তিনি তার সমস্ত সহায় সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিলেন। তিনি যখন তার তাঁবুর দিকে রওয়ানা হলেন, তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঝড়ো হওয়ার কারণে তার পক্ষে আর সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হলো না।
এমন ঝড়ো বৃষ্টি শুরু হলো, যেন আসমান ফেটে পড়েছে। তীব্র বৃষ্টির মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানী আর বজ্রপাতে সবারই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছিল। গুহার ভেতরে একটি মশাল জ্বলছিল, আর গুহার বাইরে তার বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলো ভয় আতঙ্কে হেরব শুরু করছিল। ঠিক এ সময় পুরোহিত গুহায় ঢুকে ভেতরে চলে গেল। পুরোহিত রাজাকে বললো–
“আমি বৃষ্টি শুরু হতেই আপনার তাঁবুতে গিয়েছিলাম। সেখানে আপনাকে পেয়ে এখানে এসেছি। আপনার জন্যে সব সময়ই আমার মন উদ্বিগ্ন থাকে।
দেখতে দেখতে বৃষ্টির জোর আরো তীব্রতর হলো। এমন অবস্থা ঘণ্টাখানিক চলার পর গুহার বাইরের লোকজনের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হলো। বেঁধে রাখা ঘোড়া ও গাধাগুলো আতঙ্কে তীব্র হ্রেষার শুরু করে দিল। গুহার বাইরে লোকজনের মধ্যে শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ। ঝড়ের শনশন আওয়াজ আর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর মানুষের আর্তচিৎকার মিলে তৈরী হলো ভয়ানক এক অবস্থা। এ সময় চিৎকার চেঁচামেচির সঙ্গে কানে ভেসে এলো- বন্যা এসে গেছে, ঢল নেমেছে, তাঁবুর খুঁটিগুলো উপড়ে ফেলো…।
