“জী হ্যাঁ, আমার স্মরণ আছে। বললো পুরোহিত। সে বলেছিল, আমার শরীরকে যদি টুকরো টুকরোও করে ফেলো, তবুও আমি তোমাদের কোন প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না। জবাব দেবো না।”
“এছাড়া সে কি আর কিছু বলেনি?” জিজ্ঞাসু কণ্ঠে বললেন রাজা।
আমি তাকে সোনার বড় একটি টুকরো দেখিয়েছিলাম, সেটি তাকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, রাজমহলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে তার সাথে বিয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়েছিলাম। এমনকি সুন্দরী এক মেয়েকে তার কাছে পাঠিয়েও দিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুতেই সে প্রলুব্ধ হচ্ছিল না। বরং সে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলেছিল, “মহারাজা! এসব সোনাদানা দিয়ে আমার ঈমান খরিদ করতে পারবেন না। এমন নোংরা বহুগামী নর্তকী দিয়ে আমাকে বিভ্রান্ত করতেও পারবেন না। ঈমানকে এসব দিয়ে কেনা যায় না। আমার প্রভুর কাছে আমি এসবের চেয়ে অনেক বেশী পুরস্কার পাবো, ন্যূনতম সত্তরজন কুমারী সুন্দরী নারী আল্লাহ আমাকে দেবেন। তাছাড়া মণিমুক্তা হীরা জহরাত দিয়ে সাজানো একটি প্রাসাদ আমাকে দেয়া হবে। আপনার এক টুকরো সোনা দিয়ে আমি এত বড় পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হতে পারি না। এটাই আমার ঈমান ও বিশ্বাস।
এরপর আপনি একটি বাক্স নিয়ে এলেন। এটির মধ্যে ছিল একটি বিষাক্ত সাপ। আপনি বিষাক্ত সাপটি দেখিয়ে বলেছিলেন, তুমি যদি কথা না বলো, তাহলে আগামীকাল একটি বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করে এই সাপটি ছেড়ে দেয়া হবে। বিষাক্ত সাপটি তোমাকে ছোবল দেবে, বিষাক্ত সাপের একের পর এক দংশনে তোমাকে ধুকে ধুকে মরতে হবে। কিন্তু তাতেও সেই গোয়েন্দার মধ্যে সামান্যতম ভাবান্তর দেখা গেলো না। সে বরং আপনার হুমকির জবাবে বলেছিলো, “দুনিয়ার কোন সাপ বিচ্ছ ঈমানকে ছোবল দিতে পারে না।”
তখন আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, ঠিক আছে আগামীকালই দেখা যাবে ঈমানকে বিষাক্ত সাপ ছোবল দিতে পারে কি-না।…….
এর পরদিন আপনি একটি ছোট্ট কক্ষে তাকে আটকে বিষাক্ত সাপটি কক্ষে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। লোকটি বিষাক্ত সাপের দংশনে ছটফট করতে করতে মারা গেল কিন্তু একটিবারও বাঁচার জন্য উহ শব্দটা পর্যন্ত করলো না। তার সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোন কথা বললো না।
“হ্যাঁ মহারাজা! আমার মনে আছে আমিই তাকে একটি কক্ষে ভরে বিষাক্ত সাপ দিয়ে হত্যা করেছিলাম।”
“এটাই তো মুসলমান! আর এমনই হলো তাদের ঈমান। আছে হিন্দুদের মধ্যে এমন কেউ? পণ্ডিতজী! ঈমান জিনিসটা কি?”
“আমরা যেটাকে ধর্ম বলি, এটাই হচ্ছে ঈমান”, বললো পুরোহিত। এমন ঈমান আমাদের মধ্যেও সৃষ্টি হতে পারে।
“সবই কথার কথা পণ্ডিত মশাই, সবই ফাঁকা বুলি” বললেন, মহারাজা রাজ্যপাল। “আপনি শুধুই কথায় কথায় ধর্মের দোহাই দেন। সারাক্ষণ ধর্ম ধর্ম জপেন। আর সাপ নিয়ে খেলা করেন। আপনি সাপ ধরে সাপকে বশ মানাতে এবং সাপকে পালতে পারেন। মূলত এগুলো সাধারণ মানুষকে চমক দেখানোর খেলা মাত্র। এসবের মধ্যে ধর্মের কিছু নেই।
মহারাজা রাজ্যপাল সর্বপ্রথম যখন তার ধনভাণ্ডার গুপ্ত স্থানে লুকানোর চেষ্টা করছিলেন তখন সুলতান মাহমূদ খুবই সতর্কতার সাথে তার সেন্যদের নিয়ে কনৌজের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। সুলতানকে বলা হয়েছিল, কনৌজে তাকে সবচেয়ে কঠিন মোকাবেলার সম্মুখীন হতে হবে। কোন গোয়েন্দা তাকে বলতে পারেনি, প্রকৃতপক্ষে কনৌজে কোন মোকাবেলা হবে না। মহারাজা রাজ্যপাল মাত্র কয়েকজন সৈন্য রাজধানীতে রেখে নিজে রাজ্য ত্যাগ করবেন এটা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। এটা কেউ চিন্তাও করেনি যে, সাধু বেশধারী এই পুরোহিত চক্রান্ত করে সুলতান বা তার সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হত্যার নীল নক্সা করেছিল।
পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, প্রথম যখন এই পুরোহিত রাজার সম্পদ লুকাতে যায় তখন গযনীর দুই গোয়েন্দা তা দেখেছিল। লোভে পড়ে একজন মারা গিয়েছিল কিন্তু অপরজনের সাথে পুরোহিতের অনেক কথা হয়। সেই সূত্রেই পুরোহিত গোয়েন্দাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয় যে, কনৌজে কয়েক মহারাজার সৈন্য একত্রিত হয়েছে, এখানে তোমাদের বাহিনী এলে সবাইকে হিন্দু সৈন্যরা পিষে ফেলবে।
গোয়েন্দা সালেহ সেই সংবাদকে সত্য মনে করে সুলতানকে এই খবর দিয়ে আরো বেশী সতর্ক হতে পরামর্শ দিয়েছিলো। ফলে সুলতান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চতুর্দিক বিবেচনা করে গুণে গুণে প্রতিটি কদম ফেলেছিলেন। এই ফাঁকে মহারাজা রাজ্যপাল কনৌজ থেকে পালানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। পুরোহিত চেয়েছিলো, একটা সময়ে সে রাজ্যপালকে যুদ্ধে প্ররোচিত করতে পারবে। কিন্তু রাজ্যপাল যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। সুলতান মাহমূদ যদি তার স্বভাবসুলভ দ্রুতগতিতে কনৌজের দিকে অগ্রসর হতেন, তাহলে রাজ্যপাল ফেরার হওয়ার আগেই তিনি কনৌজ পৌঁছে যেতে পারতেন। কিন্তু পুরোহিতের বিভ্রান্তিকর তথ্য সুলতান মাহমূদকেও প্রভাবিত করতে সমর্থ হয়। তিনি সম্ভাব্য কঠিন মোকাবেলার প্রস্তুতিস্বরূপ খুব সতর্ক ও সচেতনভাবে ধীর-স্থিরভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন। যাতে দ্রুততার কারণে শত্রুপক্ষ মুসলিম বাহিনীর কোন ক্ষতি করতে না পারে।
অবশেষে রাজা রাজ্যপাল ও পুরোহিত তাদের লুকানো ধনরাজী তাদের কাঙিক্ষত ঠিকানা পর্যন্ত নিয়ে যেতে সক্ষম হলো। রাজ্যপাল যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে প্রাকৃতিক ভাবেই একটি গর্তের মতো জায়গা ছিলো। সেটিকে আরো খনন করে এবং আরো গভীর করে রাতের বেলায় রাজ্যপালের নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে অতি বিশ্বস্ত চার পাঁচজনকে দিয়ে সেই গর্তে ধনরত্ন রাখা হলো।
