“মহারাজ! এটা হলো দেব-দেবীদের রহস্য। মানুষ যখন দেবদেবীদের নির্দেশ পালন করে না, তখন তাদের মনের মধ্যে দ্বিধা সংশয় সৃষ্টি করে দেয়। ফলে তারা আপনার মতো ভগবানের বিরুদ্ধে দেবতাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে।
ধনরত্ন বোঝাই ঘোড়া ও অন্যান্য ভারবাহী জন্তুগুলো ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। গভীর অরণ্য দিয়ে পথ চলার কারণে দূর থেকে তাদের কানে ভেসে আসছিল সিংহের গর্জন এবং হায়েনার চিৎকার। মাঝে মাঝে বাঘের হুংকারও শোনা যাচ্ছিল। ঘোড়া ও ভারবাহী খচ্চরগুলো ঘন বনজঙ্গলের দুর্গম পথ মাড়াতে মাড়াতে ভীত বিহ্বলতার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হচ্ছিল। পথ চলতে চলতে মহারাজা রাজ্যপাল বললেন,
“আমি আমার রাজ্যের মন্দিরগুলো হিরা মণিমুক্তা দিয়ে সাজিয়েছি, ঋষী, পণ্ডিত সাধু সন্ন্যাসীদের আমি দুহাতে উপহার উপঢৌকনও দিয়েছ এবং সেবা করেছি। তাদের সকল নির্দেশ ও চাহিদা পূরণ করেছি। আপনার মন্দিরের সকল মূর্তিগুলোকে আমি মণিমুক্তা-সোনা দিয়ে কারুকার্য করে তুলেছি এবং সবচেয়ে দামী সুগন্ধি দিয়ে গোসল করিয়েছি….
কিন্তু কোথায় আজ আমার সেইসব সেবার পুরস্কার? কোথায় আজ আমার সিংহাসন? কোথায় আমার রাজমুকুট, রাজত্ব? যে কনৌজ রাজের জয়গান গাইতো সারা হিন্দুস্তান, সেই রাজসিংহাসনের জাকজমকপূর্ণ দাপট এখন কোথায়? আমার মাথায় কেন এমন বুদ্ধি এলো যে, আমি কনৌজে মুসলিম বাহিনী প্রবেশের আগেই রাজত্ব ত্যাগ করে পালিয়ে এলাম? পালাতে আমাকে কে প্ররোচিত করলো?
“ধনরত্নের প্রতি অত্যধিক ভালোবাসাই আপনাকে রাজধানী ও সিংহাসন ত্যাগে প্ররোচিত করেছে মহারাজ বললো পুরোহিত। তাছাড়া আপনি মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। মুসলমানদের সাথে মোকাবেলা করার মানসিক শক্তি ওদের সাথে মোকাবেলা না করার আগেই নিঃশেষ হয়ে গেছে।
“ওসব কথা রাখেন পণ্ডিতজী! আমার প্রশ্নের সত্যিকার জবাব আপনি দিতে পারবেন না। আমিও জানি না আমার প্রশ্নের জবাব কি হবে? বললেন রাজা রাজ্যপাল।
“পণ্ডিতজী! আজো পর্যন্ত আপনি আমাকে বুঝাতে পারেননি, সনাতন ধর্মটা আসলে কি? ধর্ম বলতে আমি শুধু এতটুকু বুঝেছি, কোন রাজা যদি কোন মন্দিরে যাতায়াত করে তাহলে প্রজারা তাকে ভালো জানে, তাকে ধর্মানুরাগী ভাবে। এই বয়সে আমি বুঝতে পেরেছি, ধর্মের নামে প্রজা সাধারণকে ধোকা দেয়া খুব সহজ। ক্ষমতাসীনদের হৃদয়ে ধর্মপ্রীতি থাক আর না থাক কিন্তু ধর্মানুরাগী ভাব দেখালেই প্রজারা বিগলিত হয়ে যায়। সারা হিন্দুস্তান জুড়ে কনৌজ রাজের প্রশংসা করার প্রধান কারণ হলো, আমার বাপদাদার আমল থেকে কনৌজের প্রধান মন্দিরের মূর্তিগুলোকে জাফরান মিশানো মেশকে আম্বর দিয়ে গোসল করানো হতো। বাপদাদার আমল থেকে চলে আসা এই ধর্মীয় রীতিকে আমিও চালু রেখেছিলাম। এজন্যই লোকেরা আমাকে কনৌজের যোগ্য উত্তরসূরী মনে করে প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। আমি রীতি অনুযায়ী বছরে কয়েকবার বিশেষ অনুষ্ঠানে মন্দিরে পূজা দিতাম বটে কিন্তু এগুলো করতাম নিছক প্রথা পালনের জন্যে। এই ধর্মের প্রতি কখনোই আমার কোন অনুরাগ ছিল না। সনাতন ধর্ম কখনো আমার অন্তরে প্রশান্তি দিতে পারেনি।”
“আপনি পথভ্রষ্ট হয়ে গেছেন মহারাজ?”
‘হ্যাঁ আমি পথভ্রষ্ট হয়ে গেছি পণ্ডিত। পথভ্রষ্ট আমি আজ হইনি। আপনার কি স্মরণ নেই মথুরার প্রধান মন্দিরের প্রধান মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আপনাকে আমি বলেছিলাম, আমার সাথে আপনি কখনো ধর্ম নিয়ে কথাবার্তা বলবেন না। এসব দেবদেবীর নাম আমার সামনে উচ্চারণ করবেন না। হ্যাঁ, হিন্দু রাজা মহারাজাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোল এবং গযনীর সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে লড়াই করো, এ ধরনের কাজের কথা বেশী করে বলুন। এতে কিছু ফায়দা হলেও হতে পারে। কিন্তু ওসব কথায় তো কাজ হলো না। সম্মিলিত বাহিনী গঠন করেও তো শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতে হলো। শুনেছি, লাহোরের মহারাজা জীবন্ত মানুষ জবাই করে দেবদেবীদের নামে উৎসর্গ করেছে। একটি যুবতী মেয়েকে বলি দিয়ে তার তাজা রক্ত দিয়ে দেবদেবীদের পা ধুইয়ে দিয়েছে কিন্তু তার পরও তো তারা মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়েছে।”
“আপনি যাই মনে করুন না কেন, আমাদের ধর্মের যাদুকরী প্রভাব আমি আপনাকে দেখিয়ে দেবো” বললো পুরোহিত।
“অনেক হয়েছে পণ্ডিতজী! আমাকে আর আপনার ধর্মের কারিশমা দেখাতে হবে না। আমি আপনার ধর্মের কারিশমা দেখে ফেলেছি। বললেন মহারাজা রাজ্যপাল।
“আমাকে একথাটি বুঝান তো, মুসলমানরা এতো দূর থেকে সামান্য কিছুসংখ্যক সৈন্য নিয়ে এসেছে, তাদের না আছে প্রয়োজনীয় রসদসামগ্রী, না আছে কোন সাহায্যের ব্যবস্থা। তারপরও কীভাবে একেরপর এক রাজ্য দখল করে নিচ্ছে। প্রতিটি যুদ্ধে তারাই বিজয়ী হচ্ছে হিন্দুরা কেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরাজিত হচ্ছে আমি জানি, আপনার কাছে এর কোন সদুত্তর নেই।”
কিন্তু আমি আপনাকে এর জবাব বলে দিতে পারি। আপনার হয়তো মনে আছে, একবার আমার লোকেরা একজন মুসলমান গোয়েন্দাকে ধরে এনেছিল। তখন আপনি আমার কাছেই ছিলেন। আমি সেই গোয়েন্দাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমাদের সেনাবাহিনী এবং তোমার সঙ্গীরা কোথায় আছে? এবং তোমার সুলতানের পরবর্তী টার্গেট কি? আপনার হয়তো মনে আছে, সে কি জবাব দিয়েছিলো।
