এদেরকে এভাবে হত্যা না করে মোটা অংকের পুরস্কার দিয়ে কি খুশী করা যায় না? যেন তারা আর আমার ধনরত্নের প্রতি লোভ না করে। বললেন মহারাজা রাজ্যপাল। ওদের অসহায় অভিপাশ না নিলে হয় না?”
“মহারাজ! এই সম্পদের জন্য আপনি আপনার রাজত্ব আত্মমর্যাদা সবই বিসর্জন দিয়েছেন, অনুরূপ এই বিত্ত বৈভব দেখে ওরা আমাকে আপনাকে এবং রানী ও রাজকুমারকে হত্যা করার চিন্তা করতেই পারে। এতো বিশাল সম্পদ থেকে সামান্য কিছু নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না। দেখুন না, সম্পদ জড়ো করতে আপনি কি আপনার প্রজাদের প্রতি কখনো দয়া পরবশ হয়েছেন? মানুষ যখন ক্ষমতার মসনদে বসে এবং মাথায় রাজমুকুট রাখে তখন প্রজাদের দুঃখ ও অভাবের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে আরো বেশী ধনরত্ন এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রতি। তখন সেই ক্ষমতাবান লোকেরা বুঝে ঠিকই কিন্তু বিবেক দিয়ে চিন্তা করে না। আজ আপনি এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন। আপনি ভীতু শিয়ালের মতো লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আপনার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত স্বগোত্রীয় এবং স্বধর্মীয় প্রজাদেরকে শত্রুদের দয়ার উপর ছেড়ে এসেছেন।
“পণ্ডিত মহাশয়! বারবার আপনি আমাকে অপমান করছেন। দেখবেন আমি আপনাকে একটা কিছু করেই আমার সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করবো। বললেন মহারাজা রাজ্যপাল।
“হ্যাঁ, এজন্য তো আমি এখনো আপনার সাথে রয়েছি যে, আপনি একটা কিছু করে দেখাবেন।” বললো পুরোহিত।
আপনি কি ভুলে গেছেন, কনৌজে সিংহাসন হিন্দু জাতির গর্ব, অহংকার আত্মমর্যাদা, রণাঙ্গনের বীরত্ব, জ্ঞান বিজ্ঞান ও হিন্দুস্তানের মর্যাদার প্রতীক। হিন্দুস্তানের সকল রাজা মহরাজা আপনাকে তাদের নেতা মনে করে। আপনি নিজেও তা উপলব্ধি করেন। তাই আমি চাই আপনি এই জঙ্গল থেকে বের হোন।
ঠিক আছে পণ্ডিত মশাই! আপনি যা চান তাই হইবে। বললেন রাজ্যপাল ।
এখন চলুন মহারাজ। এখানে থাকা নিরাপদ নয়।
মহারাজের জয় হোক। রাজাকে উদ্দেশ্য করে পুরোহিত বললো।
পুরোহিত যখন তক্তা টেনে গর্তে প্রবেশকারীদের বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়ে চলে এলো, তখন গর্তের ভেতরে আটকেপড়া লোকগুলো কাতর কণ্ঠে পুরোহিতকে ডাকছিল। কিন্তু পুরোহিত ও রাজা রাজ্যপাল তখন ধন-রত্ন বোঝাই করা ঘোড়া ও খচ্চরগুলোকে সারি করে বেঁধে সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলো। ক্রমশ নাড়ছিলো তাদের মধ্যে ও গর্তে আটকে পড়াদের মধ্যে দূরত্ব। ক্ষীণ হয়ে আসছিল তাদের করুণ আর্তনাদ।
এরপর রাজা ও পুরোহিতের দুর্গম কঠিন জঙ্গলাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হচ্ছিল যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত দুঃসাধ্য, শুধু বনের হিংস্র জীব জন্তুরাই যেখানে অবাধে বিচরণ করে।
পণ্ডিতজী! আপনার মহানুভবতায় আমার মাথা আপনার কাছে কুঁকে আসছে। আমি আপনাকে এমন বিরল পুরস্কারে ভূষিত করতে চাই যা কেউ কোনদিন আমার কাছ থেকে পায়নি এবং পাবার কল্পনাও করতে পারে না। পুরোহিতে উদ্দেশে বললেন রাজ্যপাল। আপনি নিজেই বলুন। আমি আপনাকে কি পুরস্কার দিতে পারি?”
“একটা পুরস্কার অবশ্য আছে, যে পুরস্কার আজ পর্যন্ত কোন রাজা বাদশা কোন সুহৃদ বন্ধু কিংবা আস্থাভাজনকে দেননি। এবার আপনি ইচ্ছা করলে তা দিতে পারেন।”
বলুন পণ্ডিত মশাই! কি সেই পুরস্কার? অবশ্যই তা আমি আপনাকে দেবো বলুন! অবশ্যই বলুন!
“সেই পুরস্কার হলো গযনী সুলতানের দ্বিখণ্ডিত মস্তক।” বললো পুরোহিত।
“পুরোহিতের কথা শুনে মহারাজা রাজ্যপালের হাসি পেল। এ মাথা যদি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে হিন্দুস্তান ভবিষ্যত আক্রমণের শিকার হওয়া থেকে শুধু নিরাপদ হবে না, হিন্দুস্তানে ইসলামের প্রচার প্রসারও চিরদিনের জন্যে রুদ্ধ হয়ে যাবে, বললো পুরোহিত। সুলতান মাহমূদের মৃত্যুতে আমাদের এই ভারতমাতা চিরদিনের জন্যে পবিত্র হতে পারে। অবশ্য আমার আশঙ্কা হয় আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকেও আমাদের মতো মুসলমানদের প্রতিরোধে লড়াই করতে হবে। যুদ্ধ বিগ্রহ হবে, ভারতমাতার সুপুত্রদের রক্ত ঝরবে, তবুও ইসলাম এই মাটি থেকে চিরবিদায় হবে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে যদি ভগবান সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা দান করেন, তাহলে তারা এভাবে যুদ্ধ করে মরবে না বরং মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করবে। আমরা যদি ভারতমাতার উপর থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করতে নাও পারি; কিন্তু এদের বিরুদ্ধে যদি হিন্দুদের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারি তবুও আমাদের কর্তব্য কিছুটা পালিত হবে। যাতে কোন হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করা তো দূরে থাক কোন মুসলমানের সংস্পর্শে যাওয়াটাকেও এতটুকু ঘৃণা করবে যেন সে অপবিত্র হয়ে গেছে।”
“পণ্ডিত মহারাজ! আপনি সবসময় সব কথাতেই ধর্মের কথা টেনে আনেন। কিন্তু আমি নিজেই এখন ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে গেছি। হরিহরি মহাদেব আর হরিকৃষ্ণ আমাদের কি উপকারটা করতে পারলো, বলুন তো? আপনি আমাদের সব সময় দেব-দেবীদের ক্ষোভের ভয় দেখান, তাদের কি শুধু ক্ষোভ ক্রোধই আছে। তাদের মধ্যে কি দয়া মায়া নেই। প্রতিটি যুদ্ধে শুধু মুসলমানরাই জয়ী হচ্ছে। আমাদের লোকেরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেও একটি ক্ষেত্রেও বিজয় অর্জন করতে পারছে না। আপনার সেই মহাদেবের ক্রোধ কি একবারও ওই মুসলমানদের উপর গিয়ে পড়তে পারে না?”
