তারা জবাব দিলো, মহারাজা নিজে ধনসম্পদ নিয়ে শহর ত্যাগ করে চলে গেছেন। এই অবস্থায় আমরা কার জন্যে কাকে খুন করে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবোর এক পর্যায়ে এরা দুজনও আমার সঙ্গ ত্যাগ করে চলে গেল।’
একথা শোনার পর মহারাজা রাজ্যপালের মাথা নীচু হয়ে গেল।
“মহারাজ! আমি এদেরকে নিমক হারাম বলতে চাই না।’ বললো পুরোহিত। কারণ, তারা যার নিমক খেয়েছিল তিনি সেখানে ছিলেন না, কাজেই তারা জীবনের ঝুঁকি নেয়াটাকে সংগত মনে করেনি।
তাছাড়া আরেকটি ব্যাপার আছে মহারাজ! কোন বাদশাকে হত্যা করলেই তো তার সৈন্যদের পরাজিত করা যায় না, যদি সেই সৈন্যরা কোন আদর্শের পূজারী হয় এবং তাদেরও যদি আত্মমর্যাদাবোধ থাকে। আমি এখনও আপনাকে অনুরোধ করবো, যেসব সৈন্যদেরকে আপনি কনৌজ ছেড়ে বাড়ীতে চলে যাওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন, এদেরকে এক জায়গায় জড়ো করে প্রস্তুত করুন। বারীকে আপনার রাজধানী ঘোষণা করুন, তাহলে সুলতান মাহমূদকে দেশছাড়া করা আপনার পক্ষে অসম্ভব হবে না। কারণ, যুদ্ধে যুদ্ধে কমতে কমতে গযনীর সৈন্য সংখ্যা এখন আর বেশী নেই। এ দিকে মহারাজা ভীমপাল গোয়ালিয়রের রাজা অর্জুন, কালাঞ্জরের রাজা গুন্ডা আপনার সহযোগী হবে। এদের সহযোগিতায় সামান্য সংখ্যক মুসলিম সৈন্যকে আপনি ইচ্ছা করলে পিষে ফেলতে পারেন। আপনি জানেন, লোকেরা আপনার ক্ষমতা ও সিংহাসনকে খুবই মর্যাদার চোখে দেখে।”
“সবার আগে আমার দরকার লুকানো ধন-সম্পদ সেখান থেকে বের করে আনা। এরপর আমি চিন্তা করবো কি করা যায়। সারা জীবন এভাবে চুপ করে বসে থাকা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
***
এরপর একদিন এক রাতের সফর শেষে কনৌজ রাজ রাজ্যপালের কাফেলা সেখানে পৌঁছালো পুরোহিত রাজার ধন-সম্পদ যেখানে লুকিয়ে রেখে ছিল। জায়গাটি ছিল পাহাড়ী কিন্তু উপর থেকে নীচের দিকে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল। ফাঁকা জায়গাটা ছিল দেখতে অনেকটা কুয়ার মতো। পাহাড়ী গাছ গাছালি হেলে পড়ে শূন্য জায়গাটিতে ছায়া বিস্তার করে রেখেছিল। গুহার পাড়েও ছিল লতাগুল্ম জাতীয় গাছগাছালী। এগুলো গুহার উপর হেলে পড়ে দেয়ালের মতো তৈরী করেছে। গুহার ভেতরে কিছুটা পানির মতো ছিল। অবশ্য পানির চেয়ে কাদামাটিই ছিল বেশী। গুহার পাড় দিয়ে উপর থেকে যাওয়ার একটি ছোট্ট-রাস্তার মতো ছিল। রাস্তার দুপাশে ছিল খাড়া পাহাড়। মূলত রাস্তাটি অনেকটাই ছিল বৃক্ষ লতাগুল্মে ঢাকা। গর্তের শুরুতেই একটি সুড়ং পথের মতো ছিল। আর সুড়ং পথের মুখটি ছিল খোলা। সুড়ং পথটি কিছু অগ্রসর হয়ে অরেকটি গর্তের মুখে গিয়ে শেষ হয়েছে। ওখানেই লুকানো ছিল কর্নেীজ রাজের ধন সম্পদ। কিন্তু ধনসম্পদের গর্তে যাওয়ার পথে একটি গভীর গর্ত খোঁড়া হয়েছিল, যে গর্তের ভেতরে রাখা হয়েছিল বিষাক্ত সাপ বিচ্ছু। সাপ বিদুর গর্তের উপর হালকা পাটাতন দিয়ে ঘাসের ধারা ঢেকে দেয়া হয়েছিল। যাতে কেউ গুপ্ত ধনের দিকে অগ্রসর হলে সাপের গর্তের উপরে পা রাখলেই পাটাতন ভেঙে সাপের গভীর গর্তে পড়ে যায়য়।
কনৌজ রাজ্যের একান্ত অনুগত নিরাপত্তারক্ষী এবং তার পরিবারবর্গ ও পণ্ডিত মিলে একটি ছোট্ট কাফেলা বিজন এই পাহাড়ী জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় উপস্থিত হলো। তাদের কাফেলায় অনেকগুলো খচ্ছর গাধা এবং ঘোড়া ছিল। পুরোহিত যখন এই জায়গায় রাজার ধন-সম্পদ লুকাতে এসেছিল তখন রাতের অন্ধকারে কিছু সংখ্যক লোককে চোখ বেধে খচ্চর ও ঘোড়ার পিঠে করে লোকগুলোকে একটি রশি দিয়ে বেধে এনেছিল । কিন্তু এখন আর কারো চোখ বাধা ছিল না এবং গুপ্ত ধনের গুহায় যাওয়ার আগে সাপের গভীর গর্তে যাতে কেউ পড়ে না যায় তাই একটি লম্বা চওড়া কাঠের তক্তা সেটির উপর রেখে দেয়া হলো। আগে পুরোহিত গুপ্তধনের গুহায় প্রবেশ করল এবং পরে অন্যান্য রাজকর্মচারীদেরকে ডেকে নিল। কর্মচারীরা বাক্স ভর্তি ধনভাণ্ডার গুহা থেকে বাইরে এনে গাধা ও খচ্চরের পিঠে বোঝাই করছিল। কনৌজের রাজা মহারাজারা বংশানুক্রমে যে ধনরত্ন সোনাদানা জমা করেছিল মহারাজা রাজ্যপাল সেগুলোকেই গণ মানুষের চক্ষুর আড়ালে একমাত্র প্রধান পুরোহিতের জ্ঞাতসারে তার মাধ্যমে এ জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলেন।
বাপ দাদাদের সঞ্চিত সম্পদের সাথে মহারাজা রাজ্যপালের আমলে আরো বিপুল বিত্ত যুক্ত হয়েছিল। মনের পর মন সোনা রুপা, সোনার মোহর এবং মণিমুক্তা ছিল। বাক্সের ভেতরে ভরা এসব ধনরাজি গুহা থেকে বের করে আনতে বিশ শুণের মত লোককে কয়েকবার গুহার ভেতরে প্রবেশ করে বাক্স বাইরে এনে গাধা খচ্চর বা ঘোড়ার পিঠে উঠাতে হয়েছে। শেষ বাক্সটি যখন গর্ত থেকে বের করে এনে বহনকারী জন্তুর পিঠে বেধে দেয়া হলো, তখন পুরোহিত বাক্স বহণকারীদেরকে পুনরায় গর্তের ভেতরে নিয়ে গিয়ে নিজে বাইরে চলে এলো এবং সাপের গর্তের উপর রাখা তিনটি তক্তা খুব দ্রুততার সাথে টেনে এ পাশে নিয়ে এসে এগুলোকে শক্তির জোড়ে গর্তের বাইরে নিয়ে এলো। বাইরে এসে বললো
“চলুন মহারাজ!”
রাজা রাজ্যপাল বললেন। “ওরা কোথায়?”
“ওরা আর কখনো বাইরে আসতে পারবে না।” বললো পণ্ডিত। ওদেরকে গর্তের ভেতরে ঢুকিয়ে তক্তা বের করে ফেলেছি। এরা যদি বাইরে বের হতে চায় তাহলে সাপের গর্তের ভেতরে পড়বে। এক দু’জন গর্তে পড়লে আর কেউ বাইরে বের হওয়ার দুঃসাহস করবে না। ক্ষুধা পিপাসায় গুহার ভেতরেই মারা যাবে।
