এই অসম্ভবকে সম্ভব করেও ধীরে ধীরে ঘোড়া অগ্রসর হলো। কঠিন জায়গাটি বহু কষ্টে পারি দেয়ার পর আবারো জঙ্গলের ঘনত্ব কমে এলো। সামনে দু’টি পাহাড়ের ঢালে ময়দানের মতো একটা জায়গা দেখা গেল। দুই পাহাড়ের ঢালে পৌঁছে পুরোহিত একটি পথের সন্ধান পেল। এই পথটি দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে পাহাড় দুটিকে পৃথক করেছে। এই জায়গাটি অতিক্রম করার পর আরো একটি পাহাড়ী পথ এলো। যেটি কখনো খাড়া দেয়ালের মতো উপরে চলে গেছে আবার কোথাও খাড়া পাহাড়ের ঢালের মতো নীচে নেমে এসেছে। পাহাড়ী এলাকাটি পাড় হওয়ার পর বহু দূরে তার চোখে পড়ল কিছু তাঁবুর উপর। অনেকগুলো তাঁবু থেকে একটু দূরে দুটি বাহারী সুন্দর তাঁবু তার নজরে পড়ল। তাঁবুর অদূরে কিছু সংখ্যক ঘোড়াও খচ্ছর বাধা। পুরোহিত ঘোড়ার বাগ টেনে ঘোড়াকে চাবুক মারল, ঘোড়া উধশ্বাসে ছুটে চললো, কিন্তু ততক্ষণে কয়েকজন লোক তীর ধনুক নিয়ে তার পথ আগলে দাঁড়াল।
“আরে এতো দেখছি পণ্ডিতজী মহারাজ! পিছন থেকে একজন চিৎকার দিয়ে বলল । আসুন! আসুন! আপনি কিভাবে এলেন? বাইরে কিছুটা শোরগোল কথাবার্তা শুনে রাজ্যপাল তার তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন। তার সাথে তার রানী ও ছেলে লক্ষণপালও বেরিয়ে এলো। এই জায়গাতেই মহারাজা রাজ্যপাল কনৌজ ত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রানী ও লক্ষণপাল ছাড়া রাজা তিনজন নর্তকীকেও সাথে নিয়ে এসেছিলেন। প্রায় পঞ্চাশজন একান্ত বিশ্বস্ত সৈন্য তিনি সাথে নিয়েছিলেন তার নিরাপত্তার প্রয়োজনে। এ ছাড়াও ছিল কয়েকজন কাজের লোক।
মহারাজা যে এ জায়গায় এসেছেন সে খবর পুরোহিতের জানা ছিল। জানা থাকলে এখানে কারো পক্ষেই পৌঁছা সম্ভব ছিল না ।
পুরোহিত ঘোড়া থেকে নামলে রাজ্যপাল তাকে হাত ধরে তার তাঁবুতে নিয়ে গেলেন। রানী ও লক্ষণপাল অবস্থা দৃষ্টে একজন অপরজনের চোখের দিকে তাকাল। তাদের চেহারায় উদ্বেগ আর হতাশা। হতাশ মনেই তারা নিজ নিজ তাঁবুতে চলে গেল।
“আপনি কি আমাকে জিজ্ঞেস করার সাহস রাখেন, আপনার রাজধানী এখন কোন অবস্থায় আছে? রাজাকে প্রশ্ন করলো পুরোহিত। আপনি কি একথা শোনার শক্তি রাখেন, মুসলমানরা কনৌজের মন্দিরগুলোকে কিভাবে ধ্বংস করেছে?
পুরোহিতের এসব কথা শুনে মহারাজা কনৌজ তার প্রতি ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন। রাজার মধ্যে কোন ধরনের পরাজয়ের গ্লানি কিংবা অসহায়ত্বের চিহ্ন ছিল না।
“আমি যখন কনৌজ ছেড়েছি তখন গোটা কন্নৌজই জ্বলছিল’ বললো পুরোহিত। মন্দিরগুলো থেকে মুসলিম সৈন্যরা হরিকৃষ্ণের মূর্তি টেনে হেচড়ে বাইরে নিক্ষেপ করছিল এবং অন্য সৈন্যরা উল্লা গুলোকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। আর আপনার রাজমহলে………।
“থাক থাক, আপনি আমার জন্যে নতুন কোন খবর নিয়ে আসেননি পণ্ডিত মহাশয়! পুরোহিতকে থামিয়ে দিয়ে বললেন রাজা রাজ্যপাল। এ ব্যাপারে আমি আপনার সাথে অনেক কথা বলেছি। আমি আগেই জানতাম গযনীর সুলতান মাহমূদ লড়াইয়ে একজন পাকা লোক। আমি ও জানতাম কনৌজে যখন তার সাথে লড়াই করার মতো কেউ থাকবে না, এবং আমাকেও সে তল্লাসী করে কোথাও পাবে না, তখন তার ক্ষোভ আরো বেড়ে যাবে; আর এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে সে কনৌজে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। সহজ জয়ে খুশী হওয়ার মতো ব্যক্তি সে নয়। আমি সুদূর প্রসারী চিন্তায় আমার শাহী মান-মর্যাদা আর কনৌজ শহরকে ধ্বংস হতে দিয়েছি। দ্রুপ মন্দিরগুলোর ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও আমার বিশেষ পরিকল্পনা আছে।”
“তা হয়তো ঠিক, কিন্তু আপনি আপনার ধনরাজি ধ্বংস হতে দেননি।” শ্লেষমাখা কণ্ঠে বললো পুরোহিত।
“পণ্ডিতজী! আপনার বিগড়ে যাওয়া দেমাগ ঠিক করার কোন চিকিত্সা আমার কাছে নেই। প্রত্যেক ব্যাপারে আপনি ধর্মকে টেনে আনেন। আমি জানি আপনি বলবেন, প্রজা সাধারণও রাজধানীর চেয়েও ধনসম্পদ আমার কাছে বেশী প্রিয়। কিছুক্ষণের জন্যে দেমাগ থেকে ধর্মের ভূত নামিয়ে ফেলুন। আমার সেই প্রশ্নের জবাব দিন; যে জন্যে আমি আপনাকে কন্নৌজ রেখে এসেছিলাম। আপনি সেই কাজ কতটুকু করতে পেরেছেন? আমার উদ্দেশ্য কি সফল হয়েছে।
“না, যে জন্যে আপনি বারোজন বিশেষ লোককে আমার কাছে রেখে এসেছিলেন সে কাজের কিছুই আমি করতে পারিনি। আপনি যে বারোজন লোক আমাকে দিয়ে এসেছিলেন; আপনি বলেছিলেন এরা সিংহের চেয়েও হিংস্র, এরা কোন মানুষকে ভয় করে না। ভগবান এদেরকে তৈরীই করেছে মানুষ হত্যার জন্যে। আপনি বলেছিলেন, এরা খুবই দূরদর্শী, যে কাউকে ধোকায় ফেলার জন্যে এদের জুড়ি নেই। এরা অনায়াসে মানুষ হত্যা করে গায়েব করে ফেলতে পারে, কেউ কোন নাম চিহ্নও খুঁজে পায় না। আপনি বলেছিলেন, এদেরকে দিয়ে আমি যেনো সুলতান মাহমূদকে হত্যা করাতে চেষ্টা করি। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে তার বড় বড় সেনা কর্মকর্তাদেরকে খুন করাতে বলেছিলেন, এও বলেছিলেন এদের দ্বারা কোন কোন ব্যক্তিকে খুন করতে হবে।”
“হ্যাঁ বলেছিলাম। আমি অধীর আগ্রহে শোনার জন্যে অপেক্ষা করছি, আপনি কোন কোন ব্যক্তিকে হত্যা করিয়েছেন?
“একজনকেও খুন করাতে পারিনি।’ জবাব দিলো পুরোহিত। আমি আপনার দেয়া বারোজন দুঃসাহসী লড়াকুকে গরীব শ্রমজীবীর বেশে আমার কাছেই রেখেছিলাম। মুসলমান সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই লুটতরাজ শুরু হয়ে গেল। চারদিকে শুরু হলো খুনোখুনি আর অগ্নি সংযোগ। আমি দেখলাম, সেই বারো জনের মধ্যে দশজনই হাওয়া হয়ে গেছে। আমি মনে করেছিলাম এরা হয়তো তাদের কর্তব্য পালনে বেরিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর আমি অবশিষ্ট দু’জনকে চলে যাওয়া দশজনের খোঁজ খবর নেয়ার জন্যে পাঠালাম। এরা এসে খবর দিলো, কর্তব্য পালনতো দূরের কথা ওরা অন্যান্যদের সাথে লুটতরাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এবং তাদের কয়েক জন শহর থেকেই চলে গেছে। আমি থেকে যাওয়া দু’জনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি কাউকে হত্যা করতে পারবে?”
