১০১৮ সালের শেষ দিকে কনৌজের মহারাজা রাজ্যপাল সুলতান মাহমূদের মোকাবেলার আগেই রাজধানী ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছিলেন। তিনি কনৌজ ত্যাগ করে কালাঞ্জর কনৌজ ও গোয়ালিয়রের সীমানা ছাড়িয়ে আরো নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিয়েছিলেন। রাজধানী ত্যাগ করার আগে রাজার সকল ধন-সম্পদ সোনাদানা এমন জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গম জায়গায় লুকিয়ে রেখে ছিলেন যেখানে সাধারণত লোকজনের আনাগোনা নেই। রাজার এই গুপ্ত ধনের খবর জানতো শুধু কনৌজের প্রধান পুরোহিত।
সুলতান মাহমূদের এক গোয়েন্দার প্রস্তাবে এই পুরোহিতকেই ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কনৌজ পৌঁছে রাজার ধন-সম্পদ সম্পর্কে আর কারো কাছে কোন তথ্য পাচ্ছিলেন না সুলতান মাহমূদ।
“আমরা জানতে পেরেছি তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে মহারাজার ধন-সম্পদ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলে। তাই যদি হবে তাহলে মহারাজা তোমাকে না জানিয়েই চলে গেছেন এটা কি করে সম্ভব?” পুরোহিতকে প্রশ্ন করলেন গযনী বাহিনীর এক সেনাপতি।
“ধন-সম্পদের প্রতি যাদের বেশী ভালোবাসা থাকে সে মানুষের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়। জবাব দিল পুরোহিত। যে রাজা নিজের দেবদেবী ও মন্দির অবমাননা, ধ্বংস ও অমর্যাদার জন্যে ফেলে রেখে নিজের প্রাণ ও ধন-সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে তার কাছে একজন পুরোহিত কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য রাখে না। তার ধন রত্বের প্রতি যদি আমার আগ্রহ থাকতো তাহলে তো সকল ধন সম্পদ আজ আমার কজায় থাকতে পারতো। কিন্তু আমি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করিনি আপনি ইচ্ছা করলে আমার সাথে যেতে পারেন। আমি আপনাকে সেই জায়গা দেখিয়ে দিতে পারবো। মন্দিরে অবশিষ্ট যা কিছু ছিল তা তো আপনার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।”
“তুমি কি এখন ইসলাম গ্রহণ করবে? জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।”
“না, যেভাবে আপনার লোকেরা পাথরের মূর্তি মনে করে আমাদের দেবদেবীদের ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে আমাকেও সেভাবে টুকুররা টুকরো করে ধুলার সাথে মিশিয়ে দিন। আমি কোন অবস্থাতেই আমার ধর্ম ত্যাগ করবো না। আপনি যদি আপনার ধর্মের প্রতি সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকেন তবে অপর ধর্মের পণ্ডিতদের সাথে নিশ্চয়ই ভালো আচরণ করবেন। আমার বিশ্বাস আপনার ধর্মের মর্মবাণীও তাই বলে।”
“আমি তোমাদের ধর্মের পুরোহিতদেরকে আমার পায়ে পড়ে মাথা ঠেকাতে দেখেছি। কিন্তু আমি তোমার সাহস ও ধর্ম নিষ্ঠাকে সম্মান করি। গাদ্দার যে ধর্ম বা জাতিরই হোকনা কেন সে নিন্দার পাত্র।…ঠিক আছে পণ্ডিত? বলো, তুমি আমার কাছে কি প্রত্যাশা করো।”
“আমার প্রতি যদি অনুগ্রহের ইচ্ছা হয় তাহলে আমাকে আমার অবস্থার উপরে ছেড়ে দিন। আমি নিজের চোখে নিজ ধর্মের অমর্যাদা দেখে সহ্য করতে পারবো না। হয় আমি নিজেকে গঙ্গা মায়ের হাতে সপে দেবো, নয়তো জঙ্গলে গিয়ে বাকীটা জীবন জঙ্গলেই কাটিয়ে দেবো।”
“ঠিক আছে, যাও পণ্ডিত! জ্বলন্ত ফটকের মাঝ দিয়ে তুমি চলে যেতে পারে। তবে কখনো যদি তোমার রাজার সাথে দেখা হয় বলবে, “লড়াকু কোন শাসক তার প্রজা ও জাতির সাথে কখনো বেঈমানী করে না।”
পুরোহিত মাথা নীচু করে সুলতানকে কুর্ণিশ করে আর কোন কথা না বলে চলে গেল।
১০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর সুলতান মাহমূদ কনৌজ অবরোধ করেন। কনৌজ রাজা রাজ্যপাল কখন রাজধানী ত্যাগ করে চলে গেলেন তা কেউই বলতে পারেনি। কনৌজ রাজার পিছু ধাওয়া করার কোন প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। কনৌজ জয় করার কয়েক দিন পরই সেনাপতি আবুল কাদের সালজুকীকে কনৌজের শাসক নিযুক্ত করে সুলতান মাহমূদ গযনী ফিরে গেলেন।
যে পুরোহিত গঙ্গাজলে আত্মবিসর্জন দেবে নয় তো জঙ্গলবাসী হয়ে দিন কাটাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে শহর থেকে বের হয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে বহু দূরে চলে গেল। সে অনেক দূরে এসে ঘোড়াকে নদীর মধ্যে নামিয়ে দিল। নদী গভীর ছিল বটে কিন্তু কোন স্রোত বা তরঙ্গ ছিল না। ঘোড়া তাকে সামনে থেকে সামনেই এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল কিন্তু পুরোহিত গঙ্গা জলে আত্মবিসর্জন করলো না। এক সময় ঘোড়া নদী সঁতরে তাকে গঙ্গার অপর তীরে নিয়ে গেল। এপাড়টি ছিল ঘন জঙ্গল। পুরোহিত ঘোড়াকে বিশ্রাম এবং ঘাস খাওয়ার জন্যে ছেড়ে দিল। অনেকক্ষণ পর সে আবারো ঘোড়ার উপর আরোহণ করে গভীর জঙ্গলের দিকে অগ্রসর হলো। জঙ্গলের ভেতরে কোথাও ছিল ঘন ঝোঁপ-ঝাড় আর কোন জায়গা খালি ময়দান। পথিমধ্যে পুরোহিত আরো দু’তিনটি ছোট নদীও পাড় হয়ে এলো। কয়েকটি পাহাড়ী ঢালও সে অতিক্রম করল।
এক সময় সূর্য ডবে গেল। নেমে এলো রাতের অন্ধকার। কিন্তু পুরোহিতের ঘোড়া তখনও চলতেই থাকল। এক পর্যায়ে পুরোহিত আর এগুতে পারল না। বনছিল ঘন। সে ঘোড়া থেকে নেমে শুকনো গাছের লতাপাতা, মরা ডাল মরা গাছ টেনে-হেচড়ে জমা করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। সময়টা ছিল প্রচণ্ড শীতের। শীতের প্রকোপ এবং রাতের বেলায় হিংস্র জীব-জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে চতুর্দিকে ডালাপালা জমা করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে এর মাঝে পুরোহি বসে থাকল। তাতে সে শীত থেকেও বাঁচলো এবং আগুনের ভয়ে হিংস্র জীব-জন্তুও তার ধারে কাছে আসার সাহস করলো না।
সকাল বেলায় আবার সে ঘোড়য় সওয়ার হয়ে রওয়ানা হলো। এক পর্যায়ে পুরোহিত এমন এক জায়গায় পৌঁছাল যেখানে লতাগুল্ম সকল গাছ গাছালীকে পেচিয়ে দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরী করেছে। তাছাড়া এই লতাগুল্মের নীচেই গভীর খাদ। আর উঁচু গাছগুলোর ডালপালা এভাবে নীচে ঝুঁকে রয়েছে যে এগুলোর ভেতর দিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব।
