যেহেতু গোটা ব্যাপারটিই ছিল পরিকল্পিত এবং সিমনতাশের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাই রাতের গুপ্ত হামলা মন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না। আবুল মনসুরের সেনাপতি এবং সৈন্যরা নিজ নিজ তাঁবুতে শুয়ে ছিল। দিনের বেলার যুদ্ধে আহতদের গগনবিদারী আর্তচিৎকার তাদের কানে পৌঁছাচ্ছিল না। রক্ত ও লাশের গন্ধ থেকেও তারা ছিল অনেকটা দূরে। তারা এই আত্মতৃপ্তিতে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল যে, তাদের সৈন্যদের মাড়িয়ে কেউ তাদের পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হবে না। কিন্তু ঈমান বিক্রেতা পিতার ঈমানদীপ্ত কন্যাই তার জন্যে মারাত্মক এক ঝুঁকি হিসেবে অবস্থান করছিল।
মাসউদ তাঁবুতে প্রবেশ করে একটি মশাল উঠিয়ে আবুল মনসুরের তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে ঘুম থেকে জাগালো। ঘুম থেকে জেগে মাসউদকে দেখে আবুল মনসুর হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। এদিকে মাসউদের নিরাপত্তা রক্ষীরা আবুল মনসুরের নিরাপত্তারক্ষীদের জাগিয়ে এক জায়গা জড়ো করলো এবং তার সেনাপতিকেও পাকড়াও করল। আবুল মনসুর মাসউদকে বললেন, আমি পরাজয় মেনে নিলাম; কিন্তু আমার মেয়েকে তোমরা বন্দী করো না। মাসউদ তার কথার কোন জবাব দিল না।
* * *
তখন রাত প্রায় অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। সুলতান মাহমূদ গোটা রণাঙ্গণ চক্কর দিয়ে মাত্রই তার তাঁবুতে ফিরেছেন। ঠিক সেই সময় তাকে জানানো হলো, মাসউদ আবুল মনসুরকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে।
একথা শুনে সুলতান দৌড়ে তাঁবুর বাইরে চলে এলেন। কারণ, তার জন্যে এ খবর কোন সাধারণ খবর ছিল না। আবুল মনসুরের সাথে তার কন্যা সিমনতাশও ছিল। তিনি তাদেরকে তার তাঁবুতে নিয়ে গেলেন।
“সুলতান কি আমার বন্ধুত্ব গ্রহণ করবেন?” মাথা নত করে আরয করলেন আবুল মনসুর।
“আমি তো তোমার কাছে বন্ধুত্বের পয়গামই পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি দোস্তী কবুল না করে বরং আমার ছেলেকে হত্যা করার অপচেষ্টা করেছিলে? এর পরও কি তোমার উপর আমার আস্থা রাখা সম্ভব? উল্টো প্রশ্ন করলেন সুলতান। তুমি যে আবারো ধোকা দিবে না, এটি আমি কিভাবে বিশ্বাস করবো? এখন আর তোমার বলার কিছু নেই, তুমি এখন আমার বন্দী।
“আপনি ঠিকই বলেছেন, এখন আর আমার কিছু বলার নেই। তবুও আমি আপনার বন্ধু হতে চাই; আপনার অনুগ্রহ প্রত্যাশা করি। আমি কখনো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইনি। কিন্তু…… আমি এক প্রকার বাধ্য ও অক্ষম হয়ে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছি সুলতান!
আল মনসুর অপরাধ স্বীকার করে নেয়ার ভঙ্গিতে বললেন, চতুর্মুখী চাপে পড়ে আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরীক হয়েছি।
সিমনতাশ পাশেই দাঁড়িয়ে সুলতান ও তার বাবার কথোপকথন শুনছিল। সে সামনে অগ্রসর হয়ে সুলতানের সামনে হাটু গেড়ে বসে সুলতানের হাতে চুমু খেয়ে বললো, “আপনার হৃদয়ে আমার জন্যে কি একটুও দয়ার জায়গা নেই সুলতান? সে একবার মাসউদের দিকে তাকিয়ে এবং আরেকবার সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললো,আমি আমার পিতার প্রতিশ্রুত মৈত্রী পাকাপাকি করতে পারি।”
“সুলতান মাহমূদ সিমনতাশের ইঙ্গিত বুঝে আর কোন কথা বললেন না।
সিমনতাশের কথা শুনে আবুল মনসুরও বললেন, হ্যাঁ, সুলতান! আমার কাছে এখন এই একমাত্র জামিন আছে। এই আমার একমাত্র সন্তান। সে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমাকে নিষেধ করেছিল। আপনি একে আপনার মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করুন।
কথা না বাড়িয়ে সুলতান মাহমূদ সেই সময়েই আবুল মনসুরের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং মাসউদের সম্মতিতে সিমনতাশকে তার সাথে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই সিমনও মাসউদের বিয়ে সম্পন্ন হলো! তখন ছিল ১০২০ সাল।
আবুল মনুসর রাতেই তার সৈন্যদেরকে লড়াই থেকে বিরত থাকার নির্দেশ পাঠিয়ে দিলেন। সুলতান মাহমূদ আবুল মনসুরকে বন্দীত্বের অবস্থান থেকে মেহমানের মর্যাদা দিয়ে দিলেন। আবুল মনসুরের বন্দীর খবর পেয়ে কাদের খান ও তোগা খান ময়দান থেকে পালিয়ে গেল।
দু’বছর পর এরা দু’জন এসে সুলতানের কাছে আত্মসমর্পন করে বশ্যতা স্বীকার করে নিল।
৪.৪ দেবতা পুরোহিতকে গিলে ফেললো
কালার, কনৌজ ও গোয়ালিয়র একই পরস্পরার তিনটি শহর। এই তিন শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল হিন্দুদের কাছে মহাপবিত্র গঙ্গা ও যমুনা নদী। গঙ্গা যমুনা ছাড়াও আরো ছোট ছোট কয়েকটি নদী এগুলোর বুক চিড়ে বিভিন্ন দিকে প্রবাহমান ছিল।
সুলতান মাহমূদের শাসনামলে এসব এলাকা ছিল ঘন বনজঙ্গলে আকীর্ণ। তাছাড়া পাহাড় টিলা ও গিরিখাদের অন্ত ছিল না। এই তিনটি শহর একই সারিতে প্রায় শ দেড়শ মাইল দূরে দূরে ছিল। সুলতান মাহমূদ যখন ভারতের অধিকাংশ এলাকায় জীবন্ত আতংক হয়ে ওঠেছিলেন তখন এই তিনটি শহর ছিল তিনটি বিশাল বিশাল রাজধানী।
কনৌজ সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে মথুরা, বুলন্দশহর মুনাজসহ ছোট বড় কয়েকটি রাজ্য দখল করে নেয়ার পর কনৌজকেও সুলতান মাহমূদ জয় করে নিয়েছিলেন। কনৌজের খ্যাতিমান প্রতাপশালী মহারাজা রাজ্যপাল পরাজয় ও ধরা পড়ার আশংকায় গযনী বাহিনী কনৌজ অবরোধ করার আগেই পালিয়ে গিয়েছিলেন।
কালাঞ্জর সম্পর্কে এতটুকু বলে নেয়া উচিত, কোটলী কাশ্মীরের আলোচন কালে কালাঞ্জরের নামও এসেছে। তখন জায়গাটির নাম ছিল কালাঞ্জার। বর্তমানে এটিকে কোশী বলেই ডাকা হয়। এখন আমরা যে জায়গাটির আলোচনা করবো তা আসলে কালাঞ্জর।
