এদিকে কাদেরখানের কাছে কোন তথ্য পৌঁছল না, তাদের দু’পাশে কি ঘটছে। দুই বাহু থেকে তার কাছে কোন বার্তা পৌঁছাচ্ছিল না। তাকে একথা বলার কোন ব্যবস্থা ছিল না যে, তার সহযোগী দুই প্রান্তের যোদ্ধারা ঘোড়ার গাড়ি ও হাতির পায়ে পিষ্ট হচ্ছে।
ডান পাশের আবুল মনসুরের অবস্থা ভালো ছিল না। তার সৈন্যদের উপর এক দিক থেকে মাসউদের নেতৃত্বে আক্রমণ হলো। আবুল মনসুরের সৈন্যরা যখন এ দিকে মনোযোগী হলো তখন তাদের পেছন দিক থেকে উন্মত্ত জঙ্গি হাতি আকাশ বাতাশ কাঁপিয়ে বিকট চিৎকার করে হামলে পড়ল। এক সাথে হস্তিবাহিনী ও রথ ইউনিট এবং পদাতিক সৈন্যরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করল। রথ ইউনিটের মনোযোগ ছিল উপজাতিদের উপর। যখনই কোন উপজাতি তাদের মতো করে মোকাবেলা করতে সারি থেকে বের হতো তখন তার দু’দিকে দুই রথ আরোহী সৈন্য দৌড়ে যেতো এবং রথগাড়ীর উপর থেকে বর্শা বা তীর চালিয়ে সেই উপজাতিকে ধরাশায়ী করে ফেলতো।
সন্ধ্যার আগে একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে মাসউদ রণাঙ্গনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল। তার পেছন দিক থেকে তিনটি ঘোড়া উধশ্বাসে ছুটে আসছিল। একজনের হাতে ছিল সাদা পতাকা। মাসঊদের নিরাপত্তা রক্ষীরা ওদের দিকে ঘোড়া হাঁকাল। কারণও এমন লড়াইয়ে সাদা পতাকাও প্রতারণা হতে পারে। মাসউদের নিরাপত্তারক্ষীরা তিন অশ্বারোহীকে ঘেরাও করে মাসউদের কাছে নিয়ে এলো। তিনজনের মধ্যে একজন ছিল সিমনতাশ। সে তার মাথা মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে ছিল। আর গায়ে পুরুষ সৈন্যের পোশাক পরে ছিল। মাসউদের কাছাকাছি এসেই এক লাফে সিমনতাশ ঘোড়া থেকে নেমে মাসউদের কাছে গিয়ে তাকে সালাম করল। তার অপর দুই সঙ্গী ছিল সেনাবাহিনীর লোক।
বহু কষ্টে আপনার অবস্থান জানতে হয়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো সিমনতাশ। আমার আব্বা পালানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু তার এক সেনাপতি তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে। আব্বা সৈন্যদের মধ্য ভাগ অনেক পেছনে নিয়ে গেছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেছে সে পরাজিত হয়েছে। কাদের খানের এক দুত তার কাছে সংবাদ নিয়ে এসেছে বলখের দিকে অগ্রাভিযান সে বন্ধ করে দিয়েছে এবং সহযোগিতার জন্যে সে তার সৈন্যদেরকে ডানে বামে ভাগ করে পাঠাচ্ছে। সে বলে পাঠিয়েছে, হতাশ হবেন না, মাহমূদের বাহিনীকে আমরা ঘেরাও এর মধ্যে ফেলে দিচ্ছি।….
জানেন মাসউদ? কিভাবে আমি তোমার অবস্থান জেনেছি এবং এখানে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি? সে কথা অন্য দিন বলা যাবে। এখন একথা বলতে চাই, একটু সাহস করলেই আমাদের মধ্যভাগের রিজার্ভ সৈন্যদের আপনারা পাকড়াও করতে পারেন। অপর পাশের সৈন্যদের অবস্থা কি আমি বলতে পারবো না। আমি শুধু আমাদের সৈন্যদের কথা বলছি।”
গভীর চিন্তার পড়ে গেলেন মাসউদ।
“কি চিন্তা করছেন? আমার ঘোড়া বহু লাশ মাড়িয়ে এসেছে। মৃতদের মধ্যে যেমন গযনীর সৈন্য আছে, বুখার, ও তুর্কিস্তানীও আছে। সবাইকে দেখলে তো মুসলমানই মনে হয়। ওরা সবাই মুসলমান।
স্বজাতির এই রক্তক্ষরণ এবং জীবনহানি বন্ধ করুন মাসঊদ! আমি যা বলছি তা করুন। কাদের খানের পাঠানো সৈন্যরা এসে পড়লে এই নির্মম হত্যা যজ্ঞ বন্ধ করা যাবে না। কাদের খানের সৈন্যরা আসার আগেই আমাদের রিজার্ভ বাহিনীকে আপনার মুঠোতে নিয়ে নিন।” উত্তেজিত ও উচ্চকণ্ঠে কথাগুলো বললো সিমনতাশ।
“তুমি কি আমার সাথেই থাকবে? জিজ্ঞেস করলেন মাসউদ। “না। আমি এখনই চলে যাচ্ছি। আপনি আসুন…….. বলে সিমনতাশ এক লাফে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে ধুলোবালির অন্ধকারে হারিয়ে গেল । সে মাসউদকে তার বাবার অবস্থানের কথা বলে গেল।
***
এদিকে কাদের খানের অগ্রাভিযান থেমে গেল। সে তার সৈন্যদেরকে দু’ভাগে ভাগ করে তোগাখান ও আবুল মনসুরের সহযোগিতার জন্যে পাঠাচ্ছিল। কাদের খান এ কাজ করছে বলে সুলতান মাহমুদের কাছে এ খবর যখন পৌঁছলো তখন রাত অন্ধকার হয়ে গেছে। তখন আর আক্রমণ করা সম্ভব ছিল না। সুলতান তার যুদ্ধ পরিকল্পনা পরিবর্তন করলেন। অন্ধকারের মধ্যেই মাসউদ ও অন্যান্য সেনাপতিদের কাছে পয়গাম পাঠালেন,
“যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা কি আমাকে দ্রুত জানাও।”
মাসউদ তার অবস্থানে ছিল না। মাসউদের পরিবর্তে তার একজন ডেপুটি পয়গাম গ্রহণ করল! মাসউদ একশ বাছাই করা, সৈনিক ও কিছু সংখ্যক কমান্ডারকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে আবুল মনসুরের হেডকোয়ার্টারে গেরিলা আক্রমণের জন্যে চলে গিয়েছিলেন। এটা ছিল মারাত্মক একটি গুপ্ত হামলার পরিকল্পনা। দিনের বেলার যুদ্ধেই আবুল মনসুর যুদ্ধ জেতার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কারণ, তার অধিকাংশ যোদ্ধাই নিহত নয়তো মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। সুলতান মাহমূদ এভাবেই তাদের উপর আক্রমণ করিয়ে ছিলেন যে, তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব ছিলো না। আবুল মনসুর তার কন্যার নিদের্শনা মতো নদীর তীরবর্তী এলাকায় চলে গিয়েছিল। আবুল মনসুরের সাথে তার একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি, কয়েকজন উপদেষ্টা তিন স্ত্রী এবং কিছু সংখ্যক নিরাপত্তা রক্ষী ছিল এবং কয়েকজন দূত ছিল। আবুল মনসুর যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে তার উপর আক্রমণের সুযোগ ছিল না।
মাসউদ অনেক দূরের ঘোর পথ অতিক্রম করে আবুল মনসুরের অবস্থানে পৌঁছলেন। কাছাকাছি গিয়ে তিনি দু’তিনটি মশাল জ্বলতে দেখলেন। তিনি তার সঙ্গীদের দিক নির্দেশনা দিয়ে তাদেরকে ছড়িয়ে দিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। আবুল মনসুরের দু’জন মাত্র নিরাপত্তা রক্ষী পাহারা দিচ্ছিল। তারা একে অন্যকে বললো উভয়েই ঘোড়া দৌড়ের আওয়াজ শুনেছে! অপরজন বললো, তুমি ঠিকই বলেছো, আমারও তো তাই মনে হলো। এদের একজন একটি মশাল উঁচু করে দুবার ডানে-বামে ঘুরিয়ে আবার দুইবার উপরে নীচে করে একটি তাঁবুর কাছে গিয়ে নীচু স্বরে কি যেন বললো, সেই তাঁবুতে সিমনতাশ শুয়েছিল। সিমনতাশ ডাক শুনেই বাইরে বেরিয়ে এলো এবং পাহারাদারকে বললো, “তুমি সামনে চলে যাও।”
