সুলতান মাহমূদ গযনী বাহিনীকে দুভাগ করলেন। বলখ থেকে ডানে পাঁচ মাইল দূরে এক অংশকে রেখে অপর অংশটিকে বলখের পাঁচ মাইল বামে রেখে নদীর দিকে অগ্রসর হতে বললেন। হস্তি বাহিনীর সাথে তিনি একশ রথ ও একটি পদাতিক ইউনিটকেও পাঠালেন। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল; তারা সুলতানের নির্দেশের অপেক্ষা করবে এবং যে কোন মূল্যে শত্রু বাহিনীর দৃষ্টি থেকে নিজেদের আড়াল রাখবে।
এই সেনা বিন্যাসের চতুর্থ দিন শত্রু বাহিনীর অগ্রবর্তী দলের দেখা পাওয়া গেল। সুলতান মাহমুদকে যখন এই খবর দেয়া হলো, তিনি খবর শুনেই কিবলা মুখী হয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। দু’রাকাত নফল নামায আদায় করে প্রথমেই নির্দেশ দিলেন শত্রু বাহিনীর অগ্রবর্তী দলের উপর কেউ একটি তীরও চালাবে না। তিনি যখন এই নির্দেশ দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাকে জানানো হলো, শত্রু বাহিনীর এক গোয়েন্দাকে পাকড়াও করে আনা হয়েছে। সুলতানের নির্দেশে গোয়েন্দাকে তার সামনে হাজির করা হলো।
“হ্যাঁ সুলতান আমি বেলাসাগুনের গোয়েন্দা বটে; কিন্তু একটি সংবাদ আপনাদেরকে দিতে এসেছি, আপনাদের কোন তথ্য নিতে আসিনি।
“কি খবর নিয়ে এসেছো?”
“খবরটি আপনার ছেলে মাসউদের জন্য। আপনি জলদী তাকে এখানে ডেকে নিয়ে আসুন।
“মাসউদকে যখন ডেকে আনা হলো, তখন গোয়েন্দা সুলতানের উপস্থিতিতেই বললো, তাকে আবুল মনসুরের মেয়ে সিমনতাশ এই মৌখিক সংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছে যে,
আমি আপনাকে বলেছিলাম যুদ্ধক্ষেত্রেই হয়তো আমাদের সাক্ষাত হবে। আমার আব্বার সেনাকর্মকর্তাদের স্ত্রী এবং রক্ষিতাদের সাথে আমিও রণাঙ্গনে এসেছি। আমাদের অবস্থান হলো, আমার আব্বার সৈন্যরা ডান পাশে এবং বুখারার সৈন্যরা আছে বাম পাশে আর কাদের খানের সৈন্যরা মাঝে। আমাদের সৈন্যদের কমান্ড আমার পিতা নিজে দিচ্ছেন। উপজাতিদেরকে তিন বাহিনীর মধ্যে ভাগ করে নেয়া হয়েছে। আপনার আব্বা আমাদের সৈন্যদের অবস্থা জানার পর তিনি তার বাহিনীকে কিভাবে সাজাবেন তা ভালো বুঝবেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করবো; আমাদের বাহিনীর দিকে অগ্রসর হতে। আমি জীবিত আপনার কাছে পৌঁছার চেষ্টা করবো। আর যদি জীবিত না থাকি তবে দু’আ করবেন। আল্লাহ হাফেয!”
গোয়েন্দা আরো বললো, শাহজাদী আমাকে ফিরে না গিয়ে আপনাদের সাথে থাকতে বলেছেন।
“শোন মাসউদ! গোয়েন্দাকে কক্ষের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে মাসউদের উদ্দেশ্যে সুলতান বললেন, “এটা কি প্রেম ঘটিত ব্যাপার? যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমি তোমাকে ও দিকে পাঠাবো না।”
“ব্যাপারটা অনেকটাই আবেগাশ্রিত। কিন্তু এতে কোন ব্যক্তিগত আবেগ কিংবা ছেলেমানসিকতা নেই আব্বা হুজুর।” জবাব দিলেন মাসউদ। “আপনি আমাকে নিঃসংকোচে ওদিকে পাঠাতে পারেন। আমি সিমনতাশের পরিবর্তে তার বাবার সাথে সাক্ষাতেব চেষ্টা করবো। সিমনের এই পয়গাম প্রতারণা নয়। আবু জাফরের কাছে আপনি এই মেয়ে সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছেন। আমিওতো সিমনতাশের সম্পর্কে আপনাকে পরিষ্কার একটা ধারণা দিয়েছি।’
* * *
এই যুদ্ধ প্রস্তুতির পঞ্চম দিনে টকটকে লাল সূর্যটা পৃথিবীর বুকে আলো বিকিরণ করছিল মাত্র। ঠিক সেই সময় উভয় শিবিরের সৈন্যরা আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনী দিয়ে নিজেদেরকে তরতাজা করে তুলছিল। উভয় পক্ষ ছিল প্রতিপক্ষের রক্তপিপাসু।
সিমনতাশ শত্রুপক্ষের সেনা বিন্যাসের যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছিল শত্রু বাহিনী ঠিক সেভাবেই অগ্রসর হচ্ছিল। যুদ্ধের সূচনাস্বরূপ অশ্বারোহী সংবাদবাহী দূতেরা জরুরী খবর পৌঁছানোর জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড়া হাঁকাচ্ছিল। সুলতান মাহমূদ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এসব দূতের মাধ্যমে জরুরী পয়গাম পাঠিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতেন। দূতদের বহন করা সংবাদে শত্রু পক্ষের অবস্থানও তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা বুঝা যাচ্ছিল। কাদের খানের সৈন্যরা ছিল মাঝে এবং অনেকটা দূরে। দৃশ্যত শত্রুপক্ষের অগ্রাভিযানের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা সুলতান মাহমূদের সৈন্যদেরকে ঘেরাও করতে চায়।
আবুল মনসুরে সৈন্যরা যে দিকে ছিল সুলতান মাহমূদ তার ছেলে মাসউদকে ভ্রাম্যমান কমান্ডার হিসেবে সেদিকে পাঠিয়ে দিলেন। তোগাখানের সৈন্যদের দিকে আরেকজন তেজস্বী সেনাপতিকে কমান্ডারের দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন! শত্রু বাহিনীর একটি দলের সাথে অপর দলটির দূরত্ব ছিল প্রায় দেড় দুই মাইল। এই শূন্য জায়গা দিয়ে সুলতান মাহমূদের সৈন্যরা সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। সুলতান অশ্বরথ এবং হস্তি ইউনিটকে অনেক আগেই ডানে বামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে তোগাখান ও আবুল মনসুরের সৈন্যরা সুলতানের হস্তিবাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে ছিল।
সুলতান মাহমূদ শেষ নির্দেশ দিয়ে তার দূতদের পাঠিয়ে দিলেন। তততক্ষণে সূর্য অনেক উপরে উঠে গেছে; কিন্তু দুইপক্ষের সৈন্যদের দৌড় রণাঙ্গনে যে ধুলি উড়ালো তাতে সূর্যের আলো ধুলির আস্তরণের মধ্যে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ যেন আসমান যমীন কাঁপতে শুরু করল। সুলতান মাহমূদ ডানে বামে-আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে দিলেন। উভয় বাহুতে উভয় দিক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু হলো। সুলতানের আক্রমণকারীরা ছিল হাতি, রথ ও পদাতিক সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী। গযনী বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে উপজাতির দুর্ধর্ষ লড়াকুরা তাদের মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তুললো। তারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বল্লম ও তীরের সাহায্যে আক্রমণ প্রতিহত করতে চাইলো; কিন্তু এমন চতুর্মুখী আক্রমণে তারা তাদের প্রতিপক্ষ চিহ্নিত করতেই হিমশিম খাচ্ছিল।
