“তাদের অগ্রাভিযান প্রমাণ করে এই তিন বাহিনী বহু দিন আগে থেকেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।” সুলতান মাহমূদ তার একান্ত উপদেষ্টা ও সামরিক কমান্ডারদের বললেন। এমন দুর্গম অভিযান কঠিন প্রস্তুতি ছাড়া হতে পারে না।
সুলতান মাহমূদ মোটেও খেয়াল করেননি কাশগড় থেকে খোরাসানের পথের যতো উপজাতীয় জনগোষ্টী ছিল কাদের খান তাদেরকে সম্পদের লোভ ও ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে এসেছিল। এসব পাহাড়ী উপজাতীয় জনগোষ্টী ছিল খুবই হিংস্র লড়াকু ও যুদ্ধবাজ। এরা ইসলামের কিছুই জানতো না। নিজেদের মনগড়া ধর্মকর্ম পালন করতো; যা ছিল ইসলামের একত্ববাদের ধারণার পরিপন্থী পৌত্তলিকদের অনুরূপ।
“এদের সম্পর্কে আমার জানা আছে। আমি এদেরকে বলখ থেকে দূরের ময়দান এলাকায় লড়াইয়ে প্রবৃত্ত করবো। এদের সহযোগী উপজাতীদের ব্যাপারেও আমার জানা আছে। ওরা লড়াকু হওয়ার কারণ হলো, সবসময় পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত থাকে। তবে এদের দুর্বলতা হলো, পাহাড়ী এলাকা ছাড়া এরা লড়াইয়ে বেশী সুবিধা করতে পারে না। তাদের ঘোড়াগুলোও পাহাড়ী অঞ্চলেই দৌড়ঝাঁপ করতে অভ্যস্থ।
গয়নী থেকে বলখের দূরত্বও কম ছিল না। আবু জাফরের কাছে সংবাদ শুনেই সুলতান খোরসানের সৈন্যদেরকে বলখ থেকে কিছুটা দূরে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন! খোরাসানে বেশী হাতি ছিল না। সম্ভাব্য যুদ্ধের আশংকায় তিনি গযনী থেকে তিনশ জঙ্গীহাতি খুব দ্রুত খোরাসান নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
সুলতান মাহমূদের এসব প্রস্তুতির কথা মাত্র দু’জন ঐতিহাসিক লিখেছেন। একজন উলবী আর অপরজন ইবনুল আছীর। তারা লিখেছেন,এ যুদ্ধে সুলতান মাহমূদ তার সমর শক্তির প্রদর্শনের একটি পরিকল্পনা করেছিলেন। যাতে পাহাড়ী উপজাতিরা এবং স্বজাতির গাদ্দার শাসকেরা আর কোন দিন তার দিকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর দুঃসাহস না করে।
***
কাদের খান, তোগা খান ও আবুল মনসুরের সৈন্যরা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। তারা রসদ ও প্রচুর যুদ্ধসামগ্রী নিয়ে এসেছিল। পাহাড়ী উপজাতির লোকেরা তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছিল।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, পাহাড়ী উপজাতির লোকেরা ঘোড়ার পিঠে দাঁড়িয়ে ঘোড়া দৌড়াতে পারতো এবং দৌড়ঝাঁপ করে লড়াই করতে অভ্যস্থ ছিল। সুলতান মাহমূদের শত্রুরা উপজাতিদের এই বিশেষ বৈশিষ্টের জন্যে গর্ব করতো। তাছাড়া তিন বাহিনী মিলে তাদের সেনাশক্তিও ছিল প্রবল।
ঐতিহাসিকদের মতে সুলতান মাহমূদের সৈন্য সংখ্যা তিন বাহিনীর সমানই ছিল। অবশ্য সুলতান মাহমুদের প্রতিপক্ষের কাছে কোন হাতি ছিল না। তাছাড়া সুলতান মাহমূদের কাছে অন্তত চারশ রথ ছিল, এই রথগুলো তিনি হিন্দুস্তানের পরাজিত সৈন্যদের কাছ থেকে কজা করে ছিলেন। সুলতান মাহমূদ এগুলো ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন না, কিন্তু পাহাড়ী উপজাতিদের কথা চিন্তা করে রথগুলো সাথে নিয়েছিলেন। যাতে পাহাড়ী লড়াকুদের বিরুদ্ধে এগুলো ব্যবহার করে ফায়দা উঠানো যায়।
এগুলো ছিল খুবই হালকা ধরনের এক প্রকার বাহন। সামনে একটি ঘোড়র কাঁধে রথ জুড়ে দেয়া হতো। রথের মধ্যে দু’জন সৈন্য থাকতো, একজন ঘোড়া হাঁকাতো আর অপরজনের হাতে থাকতো বর্শা-তরবারী তীর ধনুক। সুলতান মাহমূদ ছোট দুটি রথ ইউনিট তৈরী করেছিলেন। এবার উভয় রথ ইউনিটকে খোরাসানের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন সুলতান মাহমূদের সৈন্যরা ছিল উচ্চমানের সামরিক প্রশিক্ষণে শিক্ষিত। তাদের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিকতা এবং রণাঙ্গনের কঠিন সময়েও এক দল অপর দলের সাথে সম্পর্ক রেখে চলতো। যুদ্ধের কঠিন অবস্থাতেও সুলতান মাহমুদের কোন সামরিক ইউনিট অপর ইউনিট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না। ফলে সুলতান মাহমূদের সৈন্যদেরকে কখনো বিশৃঙ্খল হতে দেখা যেতো না।
এসব রণাঙ্গনীয় বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ হওয়ার পরও এই যুদ্ধ প্রস্তুতি সুলতান মাহমূদকে পেরেশান করছিল। কারণ, হিন্দুস্তানে তার প্রচুর সংখ্যক অভিজ্ঞ সৈন্য শাহাদাত বরণ করে। ধরে আনা হিন্দুদেরকে সামরিক বাহিনীতে সুযোগ দিয়ে তিনি জনবলের ঘাটতি অনেকটা পূর্ণ করেছিলেন। হিন্দু ইউনিটের সৈন্যদেরকে প্রচুর সুযোগ সুবিধা দিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এরা ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে ঈমানের দীক্ষা নিচ্ছিল। কিন্তু এরপরও এদেরকে কখনো তিনি হিন্দুস্তানের কোন অভিযানে নিয়ে যেতেন না।
সুলতান মাহমুদ বলখ পৌঁছে বিশ্রাম পরিহার করে সৈন্যদেরকে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। কোন ইউনিট কোন দায়িত্বে কি কাজ করবে তিনি তা বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু বেশী সময় নিয়ে খুব মনোযোগ ও চিন্তা-ভাবনা করে সৈন্যদের দায়িত্ব বন্টনের সময় তিনি পেলেন
। তার কাছে খবর পৌঁছে গেল, শত্রু বাহিনী ককেসাস নদী পেরিয়ে আসছে। ককেসাস নদীর অবস্থান ছিল বলখ থেকে মাইল পঞ্চাশেক দূরে। সুলতান মাহমূদকে তার সেনা কর্মকর্তারা পরামর্শ দিলেন, শত্রুরা নদী পাড় হওয়া অবস্থাতেই ওদের উপর হামলে পড়া উচিত। কিন্তু সুলতান মাহমূদ বললেন, ওদেরকে নিরাপদে নদী পেরিয়ে আসতে দাও। এরপর নদী আমাদের সহযোগী বিবেচিত হবে। নদী থেকে আমরা সুবিধা নিতে পারব। নদী পাড় হওয়ার খবরে সুলতান মাহমূদের নিশ্চিত ধারনা হলো, শত্রুবাহিনী বলখেই আসবে।
