“আবুল মনসুর আরসালান খান তার রাজ দরবারে উপবিষ্ট । মাসউদ বিন মাহমূদ কোন আগমন সংবাদ না দিয়েই আবুল মনসুরের রাজ দরবারে হাজির হলেন। তার পেছনে তার এক নিরাপত্তারক্ষী আহত লোকটিকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে এল এবং মাসউদের ইঙ্গিতে আহত লোকটিকে রাজ দরবারের মেঝেতে শুইয়ে দিলো। আহতের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরে রাজদরবার রঞ্জিত হয়ে উঠল।
“আরে! একি মাসউদ বিন মাহমূদ!
জিজ্ঞেস করলেন আবুল মনসুর।
“এটাই হলো আমার মৈত্রীর পয়গামে আপনার দেয়া জবাব? আমি আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি, আপনার জবাবের জন্য আমাকে বেশী দিন আপেক্ষা করতে হয়নি।
“আবুল মনসুর রাগে ক্ষোভে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, এ সবের রহস্য কি? সুলতান মাহমূদ কি তার ছেলেকে রাজ দরবারের আদব শেখায়নি?”
“না, আমার বাবা আমাকে রাজ দরবারের আদব শেখানোর অবকাশই পাননি।” মাসউদ তার পাশে দাঁড়ানো আবুল মনসুরের সেনাপতিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার মুনীবকে জানিয়ে দাও! আমার বাবাকে কাফের বেঈমান গাদ্দার ও স্বজাতির ঈমান বিক্রেতারা ছেলেকে আদব-কায়দা শেখানের সুযোগ দেয়নি। আমরাতো যুদ্ধে যুদ্ধে লড়াই করে করে তীর-তরবারীর সংঘাতের মধ্যেই বড় হয়েছি।”
আবুল মনসুর তার সেনাপতির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। সেনাপতি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে উচ্চ আওয়াজে মাসউদ এর কথাই পুনরাবৃত্তি করল। আবুল মনসুর ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে মাসউদের প্রতি তাকিয়ে বললেন; “হিন্দুস্তানের মণিমুক্তা আর সোনা-দানা এই যুবকের দেমাগ খারাপ। করে দিয়েছে। সে আমাদেরকে তার বাবার জঙ্গী হাতির ভয় দেখাতে এসেছে।
“মাসউদ আবুল মনসুরের সেনাপতির উদ্দেশ্যে বললেন, আপনার মুনীবকে বলুন, জঙ্গি হাতির কোনই শক্তি নেই। ঈমানের শক্তিই প্রধান শক্তি । আমরা যদি আমাদের সবগুলো জঙ্গি হাতি আপনাদেরকে দিয়েও দেই তবুও আমাদেরকে আপনারা পরাজিত করতে পারবেন না।
অতিথিকে যারা ধোকা দিয়ে হত্যা করতে চায়, তাদের সঙ্গে রণাঙ্গনেও মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
আবুল মনসুরের সেনাপতি যখন মাসঊদের একথা তার কানের কাছে উচ্চ আওয়াজে শোনল, তখন বিড়বিড় করতে করতে আবুল মনসুর তার আসনে বসে পড়লেন।
মাসউদ কাল বিলম্ব না করে আর কোন কথা না বলে আবুল মনসুরের দরবার থেকে বেরিয়ে গযনীর পথ ধরলেন।
* * *
সঙ্গীদের নিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত মাসউদ গযনী ফিরে এলেন। সফরের ইতিবৃত্ত এবং মাসউদকে আবুল মনসুরের চক্রান্তমূলক হত্যা চেষ্টার কথা শুনে সুলতান মাহমূদ মাসউদকে বললেন,
“ক্ষমতার নেশা মানুষের মস্তিষ্ক ও বিবেকের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছে। আমি মৈত্রীর পয়গাম পাঠিয়ে আমার নৈতিক কর্তব্য পালন করেছি, এখন আর আমার মনের মধ্যে কোন নৈতিক চাপ থাকবে না।
অবশ্য একটা মানসিক উদ্বেগ আমাকে পেয়েই বসছে, সেটা রীতিমতো আমাকে বিচলিত করছে। আমাদের আক্রমণের ভয়ে কনৌজ রাজা পালিয়ে গিয়েছিল। সে তার সহায় সম্পদ আগেই লুকিয়ে ফেলেছিল। তখন আমার সম্পদের প্রয়োজন ছিল না। কনৌজের নিয়ন্ত্রণ কজা করাই ছিল আমার কাছে মুখ্য। সেটি আমি সহজেই করতে পেয়েছিলাম। কিন্তু হিন্দুস্তান থেকে খবর আসছে রাজ্যপাল কনৌজে কর্মরত আমাদের কর্মকর্তাদের কাছে তার জীবন ভিক্ষা দেয়ার আবেদন জানিয়েছে এবং আজীবন গযনীর বশ্যতা স্বীকার করে অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু লাহোরের মহারাজা ভীমপাল অন্যান্য রাজা মহারাজাদের নিয়ে রাজপালকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং আমাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত মোকাবেলার আয়োজন করছে। এ অবস্থায় আমার উচিত দ্রুত সেখানে যাওয়া; কিন্তু কাশগড়ও বুখারার কেউটে সাপগুলোর মাথা থেতলে দেয়াটাও জরুরী হয়ে পড়েছে।
তুমি বলছো আবুল মনসুরের কন্যা তোমাকে অনুরোধ করেছে আমরা যাতে দ্রুত তার বাবার রাজ্য দখল করে নেই। আমার স্বজাতির এই পুণ্যবতী কন্যার আকাক্ষা ইনশাআল্লাহ আমি পূরণ করবো। দুই কারণে আমাদেরকে এখন বুখারা ও কাশগড়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হচ্ছে। প্রথমত এরা যৌথভাবে আমাদের ক্ষতি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এদের আড়ালে খ্রিস্টশক্তি এখানে শক্তি সঞ্চয় করছে। কাশগড় ও বুখারার শাসকরা এখন খ্রিস্টান কুচক্রীদের পুতুলে পরিণত হয়েছে। মূলতঃ আমার আশংকা সেটাই। কাশগড় ও বুখারার শাসকদের আমি চিনি, এরা আমাদের জন্য কোন আতংকের বিষয় ছিল না। কিন্তু আমরা এখন এদের দমন না করলে এদের কাঁধে সওয়ার হয়ে খ্রিস্টশক্তি এই অঞ্চলকে তাদের কলোনীতে পরিণত করবে। তারা এখানে সামরিক আখড়া গড়ে তুলবে। আমাদের মূল যুদ্ধ তো ইসলামের বৈরী শক্তির সাথে। আমার ধারনা আবুল মনসুর ও কাদের খান খোরাসানের উপর আক্রমণের পরিকল্পনা করতে পারে বটে; কিন্তু আক্রমণের দুঃসাহস করবে না। তবে ওরা হামলা করুক আর নাই করুক আমাদের প্রস্তুত থাকা দরকার।
সুলতান মাহমূদের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। দুই মাস পর তার কাছে। খবর এলো, কাশগড় বুখারা ও বেলাসাগুণের সৈন্যরা একত্রিত হয়ে বলখের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বেলাসাগুন ছিল আবুল মনসুরের রাজধানী। সুলতান মাহমূদ আগে এই তিন রাজশক্তির মৈত্রীকে বেশী গুরুত্ব দেননি। কিন্তু যখন এদের অগ্রাভিযানের খবর এলো তখন তার মধ্যে পেরেশানী দেখা দিল। কাশগড়, বুখারা ও বেলাসাগুন ছিল খোরাসান থেকে অনেক দূরে। বুখারা থেকে খোরাসানের পথ খুলল ভালো ছিল না। তাছাড়া পথিমধ্যে একটি বড় নদী ছিল।
